আরেকটু সময় পেলে... আফসোসে ড্র মেনে নিল বাংলাদেশ

আপডেট : ২১ জুন ২০২৫, ০৬:৪৭ পিএম

টেস্ট ক্রিকেটে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান অনেক সময়ই তৈরি হয় মানসিকতায়। গল টেস্টের পঞ্চম দিন বাংলাদেশ যেন তার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠেছিল নিজেই। অনুকূল পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা, পিচের সহায়তা—সব কিছুই যেখানে ছিল বাংলাদেশের পক্ষে, সেখানে শেষ বিকেলে শুধু সময় আর সঠিক সিদ্ধান্তের অভাবে জয় ফসকে গেল। এই আফসোসই যেন সবচেয়ে বড় হয়ে থাকল।

২০১৩ সালের পর এই প্রথম গলে কোনো টেস্ট ড্র হলো। আগের ঘটনাটিও ছিল বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যেই। এই ১২ বছরে গলে খেলা হয়েছে ২৬টি টেস্ট, যার প্রতিটিতেই হয়েছিল ফলাফল। এবার সেটি হলো না। গলে এখন পর্যন্ত খেলা ৪৫ ম্যাচের মধ্যে এটি মাত্র সপ্তম ড্র।

শেষ দিনের সকালে ৩ উইকেটে ১৭৭ রান নিয়ে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ। লক্ষ্য তখন পরিষ্কার হওয়া উচিত ছিল—জয়! কিন্তু শান্ত-মুশফিক ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত ছন্দে। প্রথম সেশনে ১৯ ওভার ব্যাট করেও তুললেন মাত্র ৬০ রান। মুশফিক ফিরলেন ১০২ বলে ৪৯ করে। সেই সময় বৃষ্টির হানা ম্যাচে নতুন মোড় আনে। প্রায় তিন ঘণ্টা খেলা বন্ধ থাকে।

বৃষ্টির পর যখন অনেকেই ধরেই নিয়েছেন যে বাংলাদেশ ইনিংস ঘোষণা করবে, তখন দেখা গেল আবার ব্যাট করতে নামছে শান্ত-নাঈম। কারণ হয়তো একটাই—শান্তের সেঞ্চুরি বাকি। একসময় সেই সেঞ্চুরিও আসে, তাও আবার ১৯০ বলে। টেস্ট ক্যারিয়ারে শান্তর দ্বিতীয় ‘জোড়া সেঞ্চুরি’। নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন, তবে দলের স্বার্থ উপেক্ষা করে অর্জিত সাফল্যের মূল্য কতটা? প্রশ্নটা থেকেই যায়।

সেঞ্চুরি নিশ্চিত হওয়ার পরই ইনিংস ঘোষণা। ততক্ষণে ব্যাটিংয়ে কেটেছে ১১ ওভার। এই সময়েই হয়তো তাইজুলরা আরও ২-৩টি ওভার বেশি পেতেন, তাহলে জয়টা ধরা দিয়েও দিতে পারত।

অথচ গল টেস্টের পঞ্চম দিনে পিচে ফাটল স্পষ্ট হচ্ছিল। বল নিচু হয়ে আসছিল, কভারে লাফিয়ে উঠছিল। তাতে তাইজুল ইসলাম একাই এলোমেলো করে দেন লঙ্কানদের ব্যাটিং লাইনআপ।

টার্গেট ২৯৬। ব্যাট করতে নেমে ১৫ ওভারের মধ্যে শ্রীলঙ্কা হারায় দুই ওপেনার। তাইজুল শুরুতেই ফিরিয়ে দেন লাহিরু উদারাকে। পরের ওভারে আগের ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান পাথুম নিশাঙ্কা ধরা পড়েন শর্ট মিড উইকেটে। পরে তিনি ফেরান চান্ডিমাল ও অভিজ্ঞ ম্যাথিউসকে। এই ম্যাচই ছিল ম্যাথিউসের ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট। বিদায়ী ইনিংসে ৪৫ বলে করেন মাত্র ৮ রান।

শেষ সেশনে খেলা চলছিল স্নায়ুর দোলাচলে। একদিকে বাংলাদেশের আগ্রাসী ফিল্ডিং, অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার ব্যাটারদের অদম্য রক্ষণ। শেষ ৮ ওভারে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৬ উইকেট। বাকি ৫ ওভারে যখন তাইজুলের বল ধনঞ্জয়ার ব্যাটে ছুঁয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিল, তখনই দেখা গেল শেষ কফিনে শেষ পেরেক। রিভিউও বাঁচাল না। বল ব্যাটে লাগেনি। তাইজুল হতাশ, নাজমুল শান্ত পিছু হটলেন। করমর্দন সেরে দুই দল ফিরল ড্রেসিংরুমে। ড্র মেনে নিল বাংলাদেশ।

এখানেই প্রশ্ন—এই ড্র কি খুশির? দলের জেতার সম্ভাবনাকে পেছনে রেখে একজন ব্যাটারের সেঞ্চুরি নিশ্চিত করার মানসিকতা কতটা যৌক্তিক? ১৮৭ রানের লিডে ৩ ঘণ্টা ব্যাটিং করে ২৯৫-এ পৌঁছানোর মানেই কি উইনিং মাইন্ডসেট?

আর এসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে আঙুল তোলে আমাদের মানসিকতার দিকে। শ্রীলঙ্কা এখন বিশ্ব ক্রিকেটের শীর্ষ দল নয়। তাদের বোলিং আক্রমণ মাঝারি মানের। এই দলের বিপক্ষে টেস্ট ড্র করে সান্ত্বনা খোঁজার মানে হলো, নিজেকে পরাজয়েই অভ্যস্ত করে তোলা। জয় মানে কেবল রেকর্ডে নাম লেখানো নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। জয় মানে আত্মবিশ্বাসের জয়, মানসিকতার জয়। আর সেটিই যে বারবার অধরা থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশের কাছে।

এমন এক দিনে যেখানে দল প্রথম ইনিংসে ৪৯৫ রান করেছে, শান্তের জোড়া সেঞ্চুরি, তাইজুলের ৪ উইকেট, প্রতিপক্ষের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলার মতো চাপ—সব কিছু ছিল জয়ের অনুকূলে। অথচ জয় এল না, কেবল আফসোস। আর সেই আফসোসটাই হয়তো বলছে—আরেকটু সময় পেলে… হয়তো জয়টা ধরা যেত!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত