শ্রীবরদীর ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোয় দালালদের দৌরাত্ম্য

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৫, ০৫:১০ পিএম

ঘুষ ছাড়া কোন কাজই হয় না শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার বেশীরভাগ ইউনিয়ন ভূমি অফিসগুলোয়। প্রতিটি ভূমি অফিসে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চলে এই লেনদেন। কিছু দলিল লেখক ও স্থানীয়রাই এই সিন্ডিকেটের সদস্য। সম্প্রতি শ্রীবরদীর খড়িয়াকাজিরচর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তার অফিসে ঘুষ লেনদেনের একাধিক ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, নামজারি, ভূমি বিষয়ক বিভিন্ন প্রকারের সার্টিফিকেট প্রদান, ভূমি বিষয়ক অভিযোগ নিষ্পত্তি, অর্পিত সম্পত্তির লিজ নবায়নের কাজে টাকা দিতে হয় মাঠ পর্যায়ের এসব ভূমি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।

দোকান থেকে আবেদন করে অফিসে গিয়ে আবেদনের বিষয়টি জানানোর প্রথম ধাপেই সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে নেয়া হয় ৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। এছাড়াও কাজের গুরুত্ব বিবেচনায় হাজার হাজার টাকা গুনতে হয় সেবাগ্রহীতাদের। আবার টাকা দেয়ার পর কাগজ দেওয়া নিয়ে ঘুরতে হয় মাসের পর মাস।

সাংবাদিকদের হাতে আসা ভিডিওতে দেখা যায়, খড়িয়াকাজিরচর ইউনিয়নের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা স্থানীয় দালাল ও সেবাগ্রহণকারীর কাছ থেকে ঘুষের টাকা নিচ্ছেন। টাকা গণনা শেষে নিজের ব্যক্তিগত পার্সে ঢুকিয়ে রাখছেন। সেই ভিডিওতে সার্টিফিকেট প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক বৃদ্ধ টাকা গুনে সেই কর্মকর্তাকে টাকা দিচ্ছেন এবং দুইদিন পর তাকে এসে কাগজ বুঝে নিতে বলা হচ্ছে। এসব ভিডিওর বিষয়ে বক্তব্য চাইলে স্থানীয় দালাল ও এক যুবদল নেতা সাংবাদিকদের সংবাদ না করতে চাপ দেয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাড়ে ৭ মাস আগে যোগদান করা এই কর্মকর্তা ঘুষ ছাড়া কোন কাজ করেন না। নামজারি কিংবা খারিজ নিতে তাকে দিতে হয় মোটা অংকের টাকা। শুধু তাই নয়, জমির বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলেও তাকে দিতে হয় ঘুষ। মূলত জমি সংক্রান্ত যেকোন কাজে ঘুষ নেয়া যেনো তার নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু তিনি নয়, উপজেলার প্রতিটা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের চিত্র প্রায় একই। প্রতিটা অফিসে রয়েছে দালাল সিন্ডিকেট। ভূমি অফিসে সেবা নিতে গেলে প্রতি পদে পদে দিতে হয় ঘুষ, না দিলে নানান ঝামেলায় পড়তে হয় সেবাপ্রার্থীদের।

স্থানীয় বাসিন্দা এডভোকেট মো. শাহজাহান বলেন, ৫ তারিখকে ঘিরে ছাত্রজনতার যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, সরকারি সেবায় কোন বৈষম্য হবে না, কোন দপ্তরে ঘুষ দুর্নীতি চলবে না,কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আমি যেহেতু এই অফিসের সাথেই থাকি, এই অফিসে বিন্দু পরিমাণ দুর্নীতি বন্ধ হয় নাই। বরং সেবাপ্রার্থীরা বাড়তি টাকা দিয়েও সেবা পাচ্ছে না। আমি সরকারের কাছে আহ্বান জানাবো যেন ভূমি অফিসগুলোর দিকে নজরদারি রাখা হয়।

ছবি: প্রতিনিধি

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক নিজাম উদ্দিন বলেন, আমি বাড়তি টাকা দিয়েও একটি কাজের জন্য দুই বছর যাবৎ ঘুরছি কিন্তু কাজ হয়নি। আগের কর্মকর্তা চলে গেছে। এখন নতুন কর্মকর্তার কাছেও পাত্তা পাচ্ছি না। এই অফিসে একটা কাজ টাকা ছাড়া হয় না। আগে যেভাবে অফিস চলছে এখনও তেমনই আছে।

লঙ্গরপাড়ার কৃষক আব্দুল হামিদ বলেন, আমি জমির খারিজ করার জন্য গিয়েছিলাম। আমার কাছে নায়েব ১০ হাজার টাকা চাইছে। আমি টাকাও দিবার পারি নাই। খারিজও করবার পারি নাই।

এ বিষয়ে শেরপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তপন সারোয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দুর্নীতি মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে। এভাবে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন সমাজে বাজে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। সরকারি ফি’র বিপরীতে বাড়তি টাকা নেয়া আইনবিরোধী কাজ এবং মানুষের উপর জুলুম। গরিব মানুষের এতে কষ্ট হয়, হয়রানি বাড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই বিষয়টি কঠিন হাতে দমন করতে হবে।

বিশিষ্ট সমাজসেবক ও মানবাধিকার কর্মী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া বলেন, এত সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করার পরেও দুর্নীতি বন্ধ করা যাচ্ছে না। এ সমস্ত নৈতিক অবক্ষয়প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বের করে দেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এ ব্যাপারে কঠোর হতে হবে। 

তবে অভিযোগের বিষয়ে খড়িয়াকাজিরচর ইউনিয়নের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানার কার্যালয়ে গেলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অজুহাত দেখিয়ে তিনি ১৫ মিনিট বসিয়ে রাখেন। পরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তাকে হয়রানির অভিযোগ তোলেন এবং তিনি কোন ঘুষ নেননি বলে জানান।

শ্রীবরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) শেখ জাবের আহমেদ বলেন, সরকার ভূমি সেবাকে জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দেয়ার জন্য ডিজিটাল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এখানে জনগণের কাছে সরাসরি টাকা নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। সব অনলাইনের মাধ্যমে বাইরে থেকেই করে অফিসে যেতে হয়। এছাড়াও সকল প্রকার সেবার বিনিময়ে সরকার ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং সেই তালিকা জনসম্মুখে টানিয়ে রাখার নির্দেশও দেয়া আছে। এর বাইরে যদি টাকা নেওয়ার কোন ঘটনা ঘটে, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত