এইচএসসি পরীক্ষা

অটোপাশ, সাবজেক্ট ম্যাপিং, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস যুগের শেষ হচ্ছে

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৫, ০৫:৫৬ পিএম

পাবলিক পরীক্ষায় অটোপাশ, সাবজেক্ট ম্যাপিং ও সংক্ষিপ্ত সিলেবাস যুগের শেষ হতে যাচ্ছে। আজ থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে ২০২০ সালে কভিডকালীন শুরু হওয়ার পর আর পূর্নাঙ্গ সিলেবাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি।  আলোচিত সেই বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা অটোপাশের (পরীক্ষা না দিয়েই পাশ) সাথে পরিচিত হয়েছিল। ২০২১ সালের এইচএসসি পরীক্ষা থেকে পাঠ্যক্রমকে সহজতর করতে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস যুগের শুরু হওয়ার পর সেই সিলেবাসের শেষ পরীক্ষা শুরু হয়েছে  বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) থেকে। এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় সারাদেশের ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। 

কোভিডকালে শুরু হওয়া এইচএসসিতে সেই সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের পাশাপাশি ২০২১ সালে বিভাগওয়ারী (বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ) নৈর্বাচনিক তিনটি বিষয়ের প্রতিটিতে ৫০ নম্বরের, ২০২২ সালে ৮ বিষয়ের (আইসিটি ও চতুর্থ বিষয় ছাড়া) প্রতিটিতে ৫০ নম্বরের, ২০২৩ সালে সব বিষয়ে ১০০ নম্বরের এবং ২০২৪ সালেও সেই সংক্ষিপ্ত সিলেবাসেই ৫ বিষয়ের (বাংলা, ইংরেজি, আইসিটি ও দুটি নৈর্বাচনিক বিষয়) পরীক্ষা হয়েছিল। ২০২৪ সালে অবশিষ্ট পরীক্ষাগুলো না হওয়ার প্রধান কারণ ছিল পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে (জুলাই-আগস্ট) ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। এবারের পরীক্ষায়ও সেই সংক্ষিপ্ত সিলেবাসেই পরীক্ষা হচ্ছে। এবিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন,‘ আজ বৃহম্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের যুগ শেষ হতে যাচ্ছে। আগামী বছর ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পূর্ণ সিলেবাসেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘২০২০ সালের পর থেকে এইচএসসি পরীক্ষাগুলোতে আমরা যেসব বিষয়ে পরীক্ষা নিতে পারেনি সেসব বিষয়ে সাবজেক্ট ম্যাপিং (এসএসসি বা জেএসসিতে প্রাপ্ত নম্বরকে বিবেচনায় এনে ফলাফল তৈরি) করা হয়েছে। এছাড়া সব বিষয়ে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস চালু ছিল।’

এদিকে  বুধবার (২৫ জুন) জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)  এনসিটিবি চেয়ারম্যান রবিউল কবির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০২৬ সালের এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষা পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যসূচি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা ২০২৬ সালের মে-জুনে অনুষ্ঠেয় এইচএসসি, আলিম ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিবে। এই পরীক্ষাগুলো পূর্ণ সময় ও পূর্ণ নম্বরভিত্তিক এবং এনসিটিবির প্রণীত সম্পূর্ণ সিলেবাসে নেওয়া হবে।
আর এই আদেশের মাধ্যমে দেশে করোনা মহামারির কারণে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। তবে এখন থেকে পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যক্রমে মূল্যায়নের ধারায় ফিরছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে ক্ষতি হয়েছে উচ্চ শিক্ষায়

২০২০ সালে অটো পাশের পর থেকে এইচএসসিতে চালু হওয়া সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের কারণে উচ্চ শিক্ষায় হোঁচট খেয়েছে শিক্ষার্থীরা। আর এতে সবার আগে ধাক্কা খেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি পরীক্ষায়। অনেকে জিপিএ-৫ পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় পাশ নম্বরও পায়নি। এটা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ই বিব্রত অবস্থায় পড়েছে। এবিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার এন্ড সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিগত সময়ে ভর্তি কমিটির দায়িত্বে থাকা প্রফেসর ড. সানাউল্লাহ চৌধুরীর সাথে।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ন না হওয়ায় কয়েক দফা অপেক্ষমান তালিকা দিয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করাতে হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এসব শিক্ষার্থী ব্যবহারিক ক্লাসে এসে দেখা যায় অনেক কিছুই পারে না। সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে এইচএসসি পর্যায় পার হয়ে আসার কারণে এদের জানার জগত ছোটো হয়ে গেছে।’

একই মন্তব্য করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড.  রাশিদুল হাসান। তিনি বলেন,‘ আমরা যখন এসব শিক্ষার্থীদের ক্লাস নিতে যাই তখন দেখি তারা অনেক পিছিয়ে আছে। সম্পুর্ন সিলেবাস শেষ না করে আসার কারণে তাদের পড়া বুঝতে প্রথম বছরটাই শেষ হয়ে যায়।’

দেশের শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিয়ে গবেষণা করেন ড. শামসুদ্দিন শিশির। চট্টগ্রাম সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের এই শিক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন,‘ সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে কখনো পূর্নাঙ্গ জ্ঞান আহরণ করা সম্ভব নয়। এতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েরই সমস্যা হয়। করোনাকালে শুরু হওয়া সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের কারণে আমাদের সন্তানরা উচ্চ শিক্ষায় অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে গেছে আবার কেউবা হোঁচট খেয়েছে। আমরা আশা করবো আগামীতে পূর্ণ সিলেবাসে আবারো শিক্ষা সঠিক কক্ষপথে পরিচালিত হবে।’

আজ থেকে শুরু হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা

এদিকে সারা দেশে আজ থেকে শুরু হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। এবারের পরীক্ষায় মোট ১২ লাখ ৫১ হাজার ১১১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে সাধারণ নয়টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ১০ লাখ ৫৫ হাজার, মাদরাসা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষার্থী ৮৬ হাজারের বেশি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী সংখ্যা এক লাখ নয় হাজারের বেশি। ২০২৪ সালের তুলনায় এ বছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৮১ হাজার ৮৮২ জন। গত বছর পরীক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৯৩ জন। এদিকে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে এবার ১ লাখ ২ হাজার ৯৭৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। গতবছর ছিল ১ লাখ ৬ হাজার ৩৪ জন। 

এবারের পরীক্ষায় নতুন নির্দেশনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, ‘সকল শিক্ষার্থীকে মাস্ক নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতে হবে। এছাড়া কেন্দ্র সচিব হ্যান্ড স্যনিটাইজারের ব্যবস্থা করবেন এবং পরীক্ষার হলে যাতে মশা না থাকে সেই ব্যবস্থা নিবেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত