চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্রসৈকত, দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র, বিলীনের হুমকিতে পড়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাগরের ঢেউ, বালিয়াড়ি থেকে বালু উত্তোলন এবং মৎস্যঘেরের পানি নিষ্কাশনের জন্য খননকৃত খাল এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকাকে বিপন্ন করছে। নিয়মিত বালু অপসারণ ও খালের পানির স্রোতের কারণে সৈকতে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সৈকত প্রায় সাগরে বিলীন হওয়ার পথে এবং জোয়ারের পানি এখন ঝাউবনে প্রবেশ করছে। ইতিমধ্যে অসংখ্য গাছ উপড়ে গেছে এবং সবুজ ঝাউবন এখন মৃত গাছের বিবর্ণ প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। দুধকুমড়া এলাকার প্রবীণ বাসিন্দাদের মতে, গত ১০০ বছরে এমন ভাঙন এ সৈকতে হয়নি।
আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে চট্টগ্রামে জোয়ারের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় ৫-৬ ফুট বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলে আঘাত হানছে। সম্প্রতি নিম্নচাপের প্রভাবে উচ্চ জোয়ারে ঝাউবনের শতাধিক গাছ উপড়ে পড়েছে। পারকি সৈকতের ভাঙন রোধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় বন বিভাগ নতুন বাগান সৃষ্টি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
স্থানীয়রা জানায়, ২০২০ সালে পারকি সৈকতের সংলগ্ন এলাকায় আধুনিক পর্যটন কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এর জন্য ১৩ দশমিক ৩৩ একর জমি বালু দিয়ে ভরাট করা হয়। তখন স্থানীয় আওয়ামী সিন্ডিকেট ড্রেজার ব্যবহার করে সৈকত থেকে বালু তুলেছিল। স্থানীয়দের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন একাধিক অভিযান চালালেও অজ্ঞাত কারণে তা বন্ধ হয়নি। সম্প্রতি জোয়ারের তোড়ে লুসাই পার্কের সীমানা বাঁধ ভেঙে গেছে। বাঁধ মেরামতের জন্য তারা এক্সকাভেটর দিয়ে সৈকত থেকে বালু তুলেছে। যদিও স্থানীয়দের ও প্রশাসনের বাধার মুখে বালু উত্তোলন বন্ধ হয়। এ ছাড়া সৈকতের পাশের মৎস্যঘের থেকে পানি নিষ্কাশনের ফলে কৃত্রিম খাল সৃষ্টি হচ্ছে। স্থানীয়রা রাতের আঁধারে বালিয়াড়ি থেকে বালু তুলে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে, যা ভাঙনকে ত্বরান্বিত করছে।
অবশ্য লুসাই পার্কের উদ্যোক্তাদের একজন মো. আকবর খান বলেন, ‘বালু নয়, এক্সকাভেটর দিয়ে কিছু মাটি কেটে পুকুরপাড় ভরাট করা হচ্ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নিম্নচাপের প্রভাবে তা ভেঙে গেছে।’
তবে স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আনোয়ারের মতে, কর্ণফুলী নদীর মোহনায় পাকিস্তান আমলে নির্মিত দুটি পাথরের বাঁধ ছিল। সম্প্রতি বন্দরের নাব্য বাড়াতে ড্রেজিংয়ের ফলে আনোয়ারা প্রান্তের বাঁধটি নদীর গভীরে তলিয়ে গেছে। ফলে সাগরের ঢেউ সরাসরি সৈকতে আঘাত হানছে।
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগ জানায়, ১৯৯২-৯৩ অর্থবছরে পারকি সৈকতের বালিয়াড়িতে ১২ হেক্টর জমিতে ঝাউবন গড়ে তোলা হয়। এরপর ১৯৯৩-৯৪ অর্থবছরে ১৭.২ হেক্টর, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ৫ হেক্টর এবং ২০০৪-০৫ অর্থবছরে আরও ৫ হেক্টর জমিতে ঝাউবাগান করা হয়। মোট ৩৯.২ হেক্টর বা ৯৭ একর জমিতে ঝাউগাছ লাগানো হয়, যা সৈকতের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করত।
বন্দর বিট কর্মকর্তা মো. আলমগীর কবীর বলেন, অবিরাম ভাঙনের কারণে সৈকত এখন বিবর্ণ। ভাঙনের ফলে অনুকূল পরিবেশ না থাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন ও গাছ লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি উপড়ে পড়া গাছগুলো চিহ্নিত করে বিভাগীয় কার্যালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে, যেগুলো নিলামে বিক্রি করা হবে।
পারকি সৈকত পরিদর্শনে দেখা যায়, সাগরের ঢেউয়ের তোড়ে গাছের শিকড় থেকে বালু সরে গিয়ে শিকড় উন্মুক্ত হচ্ছে। সৈকতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য গাছের শিকড়। উপড়ে পড়া গাছগুলো স্থানীয়রা কেটে নিয়ে যাচ্ছে আর বাকি অংশ সৈকতে পড়ে রয়েছে। বাঁধ ভেঙে জোয়ারের পানির ওঠানামায় সৈকতে কয়েকটি খাল সৃষ্টি হয়েছে। বিশাল এলাকা জুড়ে পলির আস্তরণ জমেছে। আগে পূর্ণ জোয়ারেও সৈকতের ২০০-৩০০ ফুট বালিয়াড়িতে পর্যটকরা বিচরণ করতেন। কিন্তু এখন পূর্ণিমার জোয়ারে সৈকত পুরোপুরি পানিতে ডুবে যায়, পর্যটকদের দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। ভাটায় পানি নামলে ভাঙাচোরা বিবর্ণ সৈকত প্রকাশ পায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কর্ণফুলী টানেল চালুর পর পারকি সৈকতের পর্যটন সম্ভাবনা বেড়েছে, কিন্তু এদিকে পর্যাপ্ত নজর দেওয়া হচ্ছে না। অথচ টানেলের টোল বাড়াতে এ সৈকত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পারকি সৈকত ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাশেম বলেন, ‘জোয়ারের ভাঙন ছাড়াও রাতে সৈকত থেকে বালু পাচার করছে একটি চক্র। এর ফলে গাছের গোড়া থেকে বালু সরে উপড়ে পড়ছে ঝাউগাছ। এভাবে চললে সৈকত ধ্বংস হতে বেশি সময় লাগবে না।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক আবহাওয়ার প্রভাবে সমুদ্রের পানির স্তর বৃদ্ধি এবং ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ঢেউয়ের তীব্রতা বাড়ছে। ঢেউয়ের আঘাতে বালু সরে গাছের শিকড় উন্মুক্ত হচ্ছে, ফলে গাছ মরে যাচ্ছে। সৈকতের ভাঙন রোধে উদ্যোগ নিতে হবে। উপকূলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ও আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘সৈকত ভাঙনের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। তারা সৈকত সুরক্ষায় একটি প্রস্তাবনা পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রাম পওর-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শাহীদ বলেন, ‘পারকি সৈকতের স্থায়ী সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হচ্ছে। এটি সম্পন্ন হলেই মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এটি সৈকত রক্ষা ও উন্নয়নের একটি কার্যকর প্রকল্প হবে।’
