যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত বাড়তি শুল্কহার কমাতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ঢাকা। চলতি সপ্তাহেই মার্কিন বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যাপক দেনদরবারের প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রেসার গ্রুপ, আমদানিকারক ও পণর রপ্তানিকারকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে বিষয়টি মার্কিন প্রশাসনের নজরে আনতে কাজ করছে সরকার।
বাংলাদেশ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক দপ্তর এই সংকট মোকাবিলায় ওয়াশিংটনে নিরবচ্ছিন্ন আলোচনায় ব্যস্ত। এখন পর্যন্ত চারটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে, তিনটি চুক্তির খসড়া বিনিময় হয়েছে এবং প্রায় ৩০ বার বিভিন্ন পর্যায়ে সংলাপ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র চায়, বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যে আঞ্চলিক মূল্য সংযোজন নিশ্চিত হোক। কিন্তু বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা পরিবর্তন করতে গেলে স্থানীয় ছোট উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত, নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশগুলোর (যেমন চীন, রাশিয়া) সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসা সীমিত করতে হবে। এই শর্ত পালন বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিকভাবে কঠিন। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, যেসব পণ্যে তারা বাংলাদেশকে শুল্কছাড় দেবে, বাংলাদেশ যেন সেই পণ্যে অন্য কোনো দেশকে ছাড় না দেয়। কিন্তু এটি ডব্লিটিও নীতিমালার পরিপন্থী।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি শুধু একটি বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নয়এটি এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার সংকেত। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো, আলোচনায় কূটনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরা এবং একই সঙ্গে বিকল্প প্রস্তুতি গ্রহণ করা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ আমেরিকা ফার্স্ট’ দর্শনের অংশ হিসেবে নেওয়া নতুন পাল্টা শুল্কনীতির প্রভাব শুধু ব্যবসায়িক নয়, বরং এটি একটি বৃহৎ ভূরাজনৈতিক পুনর্গঠনের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই শুল্কনীতি ঘোষণার পর থেকেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করা হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ওয়াশিংটনকে একটি কূটনৈতিক পত্রও লিখেছেন।
বাংলাদেশ সরকার একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসার গ্রুপ ও বাণিজ্য লবির সঙ্গে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প বাজার খুঁজে ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্য বিস্তারে কাজ করছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ২৭ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করছে যুক্তরাষ্ট্র, যা পোশাক খাতসহ বেশ কয়েকটি রপ্তানি খাতে মারাত্মক চাপ তৈরি করছে। ঢাকার পক্ষ থেকে মার্কিন প্রশাসনকে যুক্তি দিয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি মাত্র ৬ বিলিয়ন ডলার, অথচ ভিয়েতনামের সঙ্গে ৫০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি থাকলেও তাদের ক্ষেত্রে শুল্ক নির্ধারণ হয়েছে ২০ শতাংশে।
গত ৩ জুলাই ওয়াশিংটনে ইউএসটিআর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গে আলোচনায় বসে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল। এতে ছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। বৈঠকে শুল্কহার কমানোর বিষয়ে প্রস্তাব ও যুক্তিগুলো তুলে ধরা হয়। এই সপ্তাহেও বৈঠক হবে।
বাংলাদেশের যুক্তি, শুল্ক নির্ধারণে ঘাটতির অনুপাতের মতো অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। একইসঙ্গে, মার্কিন ব্যবসায়ীরা যাতে বাংলাদেশপন্থি অবস্থান নেয়, সেই লক্ষ্যে তাদের বোঝানোর কাজও চলছে।
বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম, তুলা ও সয়াবিন সুলভে আমদানির জন্য সেখানকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছে। কারণ বরাবরই এই সব পণ্য বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়। তাই ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এসব পণ্য আমদানির সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টিতে ঢাকা সচেষ্ট রয়েছে। আবার এসব পণ্যে সেখানকার রপ্তানি লবির মাধ্যমে মার্কিন সরকারের ওপর চাপও সৃষ্টি করতে চাইছে বাংলাদেশ।
জানা গেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৯ জুলাই পর্যন্ত বাড়তি শুল্কহার স্থগিত রেখেছিলন। কিন্তু গতকাল ঘোষণা আসে এটি ১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবসের ছুটি এবং তার পরের দুদিন সাপ্তাহিক ছুটির পর, ৮ জুলাই মঙ্গলবারের মধ্যে প্রস্তাব যাচাই করলে ৯ জুলাই (বুধবার) ফের আলোচনা হতে পারে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা আশা করছি, ৯ জুলাইয়ের বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে। না হলে আমরা শুল্কহার স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ করব।’ বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও বাজার প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে এই আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্বব্যবস্থার পালাবদল ও শুল্ক-ধারাবাহিকতা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় ফেরার পর বাণিজ্যঘাটতি কমানোর অজুহাতে এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর ধারাবাহিকভাবে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে চলেছেন। এর ফলে শুধু চীন নয়, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি বাংলাদেশকেও মুখোমুখি হতে হচ্ছে কঠিন সিদ্ধান্তের।
ব্লুমবার্গের তথ্যমতে, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে এআই চিপ রপ্তানির ওপরও কড়াকড়ি আরোপ করতে যাচ্ছে হোয়াইট হাউজ। যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহ এই প্রযুক্তি চীনে পাচার হচ্ছে। তাই সরবরাহ চেইনের গঠন নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, যা বহু কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জ এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি একটি কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার পরীক্ষাও। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে চীনউভয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রসঙ্গত, যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কারণ আলোচনা সফল না হলে ৫৩ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। এর চাপে গার্মেন্টস রপ্তানিতে বড় পতন হবে, মার্কিন আমদানিকারকদের আগ্রহ হ্রাস পাবে, হাজার হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে, প্রতিযোগিতামূলক বিশ^বাজারে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে।
