লোহার খাঁচায় বন্দি দুধের তিন সন্তান। তাদের নিয়ে পিচঢালা পথে বেরিয়েছেন জান্নাত। মায়ের পিছে নিছে ছুটছে চার বছর বয়সের বড় সন্তান মরিয়ম। কয়েক দিন আগে সহায়তার ৭ হাজার টাকা দিয়ে একটি লোহার খাঁচা বানিয়েছে দিশেহারা এই মা।
তার জীবনের গল্প যেন কল্পনাকেও হার মানায়, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে মানুষকে। যে সময় স্বামী সন্তান নিয়ে সুখের সংসার করার স্বপ্ন দেখেন নারীরা ঠিক সেই সময় এসে জীবিকার তাগিদে বাস্তবতার কাছে মুখ থুবড়ে দাঁড়ায় তার সব অনুভুতি।
খাঁচাবন্দি ৪ সন্তানদের বয়ে নিয়ে বেড়ানো ঠাকুরগাঁওয়ের জান্নাত বেগমের কথকতাও ঠিক তেমনি। সন্তানদের আগলে রাখতে পথে পথে দৌড়াচ্ছেন একাই।
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার পরিষদপাড়ায় দুই হাজার টাকা ভাড়া করা বাসায় চার সন্তান নিয়ে জান্নাতের বসবাস। সন্তানদের মুখে খাবার জোটাতে সকাল হলেই খাঁচা বন্দি দুধের বাচ্চা নিয়ে বেড়িয়ে যান মানুষের দ্বারে। ৪-৫’শ টাকা যোগাড় হলেই সন্তুষ্ট হন সংগ্রামী এই নারী।
স্থানীয়রা জানায়, ১৩ মাস বয়সী তিন জমজ শিশু আব্দুল্লাহ, আমেনা ও আয়শা। সেইসাথে সাড়ে ৩ বছর বয়সি মরিয়মসহ ৪ শিশু সন্তানের জননী জান্নাত বেগম। বছর পাঁচেক আগে ঢাকার একটি গার্মেন্টেসে কাজ করার সুবাদে ঠাকুরগাঁওয়ের হাবিলের সঙ্গে বিয়ে হয় ময়মনসিংহের মেয়ে জান্নাতের।
তবে প্রথমে এক কন্যা সন্তান ও পরে একই সঙ্গে দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তানকে জন্মদানের কিছুদিন পরেই জান্নাতকে ছেড়ে চলে যায় হাবিল। এর পর থেকেই ৪ শিশু সন্তানকে নিয়ে বিপাকে জান্নাত। চার শিশুকে রেখে কোথাও কাজ করে উপার্জনের উপায়ও নেই তার।
তবে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে অভিনব উপায় খুজে বের করেন জান্নাত। ৭ হাজার টাকা খরচ করে কামারের দোকানে চাকা লাগানো একটি লোহার খাচা তৈরী করান। সেই খাচার ভেতরে ১৩ মাসের তিন শিশুকে নিয়ে এবং সাথে সাড়ে ৩ বছরে আরেক শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে যান সাহায্যের আশায়। বিভিন্ন সময় অনেকেই তার সন্তানদের কিনে নিতে লাখ লাখ টাকার প্রস্তব দিয়েছে। তবে সন্তানের প্রতি মায়ার কাছে হার মেনেছে টাকার সেই প্রলোভন।
জান্নাত বেগম জানান, আমি সাহায্য তুলে দিনযাপন করছি। যা আমার জন্যে অবশ্যই লজ্জার। তবে এ ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই। বিভিন্ন সময় বাসাবাড়িতে কাজের প্রস্তাব পেয়েছি, কিন্তু ছোটো ৪ শিশু বাচ্চাদের কার কাছে রেখে কাজে যাবো? তাই আমার পক্ষে কোথাও কাজ করার সুযোগ নেই। উপায় না পেয়ে ৭ হাজার খরচ করে এই চাকাসহ খাঁচার গাড়িটি বানিয়েছি। সন্তানদের এই খাঁচায় করে নিয়েই এখন আমি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে সাহায্য তুলি। তবে এভাবে ঘুরে খুব বেশি পরিমাণে অর্থ উপার্জন করতে পারিনা। তাই আমার সন্তানদের যথাযোগ্য পুষ্টিকর খাবার কখনো দিতে পারিনা। অনেক সময় তারা পেট ভরে খাবারও পায়না।
জান্নাতের প্রতিবেশীরা প্রায়শই তার এই কষ্টের জীবন দেখে আফসোস করে। অনেক সময় তারা জান্নাতের সন্তানদের ক্ষুধার জ্বালায় কান্নাকাটি করতেও দেখে। সেসময় কিছু প্রতিবেশী সাহায্যে এগিয়ে যায়।
প্রতিবেশীরা জানান, যে কোনো নারীর পক্ষে এত ছোটো ৪টি বাচ্চা লালন পালন করা বেশ কষ্টকর। কিন্তু সেখানে এই নারী বাচ্চাদের লালন পালনের পাশাপাশি উপার্জনের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। এই নারীকে দেখলেই বোঝা যায় একটা মানুষ কতটা অসহায় হতে পারে। অনেক সময় তার বাচ্চাদের কান্নার শব্দ শুনলে খুবই খারাপ লাগে। অনেক সময় পেট ভরে খাবারও পায়না তারা। বিত্তশালীরা কত কত জায়গায় সাহায্য সহযোগিতা করে থাকে। কিন্তু এই নারীকে সেভাবে কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।
এই বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম বলেন, বিষয়টা জানা ছিলোনা। আমি দ্রুতই এর খোঁজখবর নিবো। পরিস্থিতি বিবেচনায় ঠাকুরগাঁও প্রশাসন যতটা সম্ভব তার পাশে দাড়ানোর চেষ্টা করবে।
