নির্বাচনে নতুন ভয় এআই

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৫, ০২:২৬ পিএম

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে আপত্তিকর ছবি, ভিডিও বা অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে বিশ^ব্যাপী। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্র করে মিথ্যা তথ্য প্রচার, ডিপফেক ভিডিও, অ্যালগরিদমে ভর জনমত প্রভাবিতকরণে এআইর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আগামী নির্বাচনে এআইকে হাতিয়ার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’-এর যে খসড়া প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এআই ব্যবহারের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ রোধ করতে প্রয়োজন গাইডলাইন বা সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো। বাংলাদেশে ডিজিটাল মিডিয়া শিক্ষার অভাব, গুজব যাচাইয়ের অভ্যাস না থাকা ও আইনি দুর্বলতার কারণে এআইয়ের মাধ্যমে গুজব ছড়ানো খুবই সহজ। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে।

আগামী নির্বাচনে এআইয়ের অপব্যবহারকে নির্বাচন কমিশন বড় হুমকি হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন।

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে কানাডার হাইকমিশনার অজিত সিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতে সিইসি এমন উদ্বেগের কথা জানিয়ে কানাডার সহায়তা চেয়েছেন। কারণ, সম্প্রতি কানাডার নির্বাচনে এ বিষয়টির মোকাবিলা করতে হয়েছে তাদের।

এআই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ও বৈচিত্র্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন দেশ আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার রোধে এখনো আইনি কাঠামো নেই।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানিয়েছেন, পলিসি তৈরিতে কাজ করছে সরকার।

২০২০ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল’ প্রণয়ন করে। তাতে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে এআই ব্যবহারের রূপরেখা তৈরি করা হয়। কিন্তু তার বাস্তবায়ন

হয়নি। গত বছর ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকার এআই বিষয়ে খসড়া নীতিমালা তৈরি করেছিল। যদিও খসড়াটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

নির্বাচনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের প্রভাব : আগামী নির্বাচনে এআইয়ের মাধ্যমে ডিপফেক ভিডিও তৈরি করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বট অ্যাকাউন্ট দিয়ে গুজব ছড়ানো, সংবাদের ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে বিভ্রান্তি তৈরি, এআই দিয়ে তৈরি কণ্ঠ বা চেহারা ব্যবহার করে প্রচারণা চালানো, নির্দিষ্ট শ্রোতাদের টার্গেট করে বিভ্রান্তিকর তথ্য পৌঁছে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে এআই জেনারেটেড অডিও ছড়ানো, টিকটকে বট অ্যাকাউন্ট দিয়ে ট্রেন্ড তৈরি, ফেসবুকে নির্দিষ্ট দলের পক্ষে এআই বটের মাধ্যমে কমেন্ট করাসহ নির্বাচন কমিশন সম্পর্কিত বিভ্রান্তিকর তথ্য তৈরি ও ছড়ানো হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেতাদের বক্তব্য বিকৃত করে তৈরি ডিপফেক ভিডিও মুহূর্তে ভাইরাল হতে পারে, যা জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে। এ ধরনের কনটেন্ট ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সহিংসতাও উসকে দিতে পারে। এ ধরনের প্রচারণায় নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হতে পারে। এআই ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপের নির্বাচনী আচরণ প্রভাবিত করতে পারে।

ফ্রান্সভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপির বাংলাদেশবিষয়ক ফ্যাক্ট চেক সম্পাদক ইয়ামিন সাজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার-অপপ্রচারের প্রধান হাতিয়ার হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআই দিয়ে তৈরি অডিও, ভিডিও এবং স্থির চিত্র সাধারণ জনগণের পক্ষে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।’

দেশে এআইয়ের অপব্যবহার : সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্টজনের ভুয়া ছবি, ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। দেশের প্রথম সারির একটি পত্রিকা ওই ভুয়া ছবি প্রচার করে পরে তা প্রত্যাহারও করেছে। এগুলো ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে যাদের সামাজিক মর্যাদার হানি হওয়ার কথা দেশ-বিদেশে, তা হয়ে গেছে। ভুক্তভোগীদের ক্ষতি কখনই পূরণ হয় না।

ভুয়া খবর শনাক্তকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব গত ৩০ জুন একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। মাত্র ১০ দিনে (১৮ থেকে ২৮ জুন) ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপ থেকে ৭০টি ভিডিও সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে তারা নিশ্চিত হয়েছে, এগুলো এআই দিয়ে তৈরি।

ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলোর সবারই অপতথ্য, ভুয়া তথ্য ঠেকানো বা অপসারণের অঙ্গীকার রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় এ অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন খুব কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত ও ধনী দেশগুলোর মতো তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি মূলত নিজেদের দুর্বলতার কারণে। এখন তা কাটিয়ে উঠতে হবে।

সমাধান ও করণীয় : নির্বাচনে এআইয়ের অপব্যবহার রোধে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের অধীনে এআই মনিটরিং সেল গঠন, ভুয়া তথ্য শনাক্তে ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করা, এআই ব্যবহারসংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়ন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানো। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ ও ডিপফেক শনাক্তে এআই টুল ব্যবহারেরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেডের চিফ ইনফরমেশন অফিসার সুমন আহমেদ সাবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এআইয়ের অপব্যবহার রোধে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানো দরকার। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্টদেরও এ বিষয়ে যথাযথ মনিটরিং থাকা দরকার। ভুক্তভোগীরা চাইলে আইনি ব্যবস্থাও নিতে পারেন।’

ইউনেসকোর এআই প্রস্তুতি কমিটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে নির্বাচন ঘিরে শুরু হয়েছে এআইয়ের অপব্যবহার। রোমানিয়ায় নির্বাচনের তারিখ পর্যন্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে। বাংলাদেশেও বেশ কিছু ফেক (ভুয়া) ভিডিও, ছবি দিয়ে বিভিন্নজনের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচনের আগমুহূর্তে সেটা যে বড় ঝুঁকি তৈরি করবে, তা বলাই যায়। এর মোকাবিলায় নির্বাচনী আচরণ বিধিমালায় এআই-বিষয়ক নির্দেশনা থাকার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের এ-সংক্রান্ত মনিটরিং সেল থাকা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘এআই-সংক্রান্ত পলিসি বা গাইডলাইন না থাকায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। সম্প্রতি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করা হলেও সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই।’

এএফপির বাংলাদেশ-বিষয়ক ফ্যাক্ট চেক সম্পাদক ইয়ামিন সাজিদ মনে করেন, এআইয়ের অপব্যবহার রোধে সরকারকে নির্বাচনী প্রচারণায় এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে বিশেষ দিকনির্দেশনা জারি করতে হবে। সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ‘ডিজিটাল লিটারেসি’ বাড়াতে হবে। বেসরকারি এবং গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার নিশ্চিতে কাজ করে এমন সংস্থাগুলোকে সাধারণ জনগণের মধ্যে এআই-সচেতনতা বাড়াতে কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

আন্তর্জাতিক নজির : বিশ্বের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে এআইয়ের অপব্যবহার বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে বাইডেন ও ট্রাম্পের ডিপফেক ভিডিও ভাইরাল হয়। ভারতের লোকসভা নির্বাচনে এআই কণ্ঠে প্রচারণা চালানো হয়। নাইজেরিয়া, আর্জেন্টিনা, মেক্সিকোতেও নির্বাচনে এআইচালিত গুজব ছড়ানোর নজির রয়েছে।

গত ২ জুন নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় এ-বিষয়ক বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে সর্বসাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত হিসেবে কানাডার নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে শিশু যৌননিপীড়ক জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে সুইমিংপুলে একসঙ্গে সাঁতার কাটার বানোয়াট ছবি এক্স (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে। যদিও এ প্রচারণা কাজে আসেনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত