আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। দিয়েছেন অফুরন্ত নেয়ামত। মাঝেমধ্যে তিনি এসব নেয়ামতের পরীক্ষা নেন। পরীক্ষার ধরন বিভিন্ন রকম। যারা ধৈর্যধারণ করে উত্তীর্ণ হন তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কারের সুসংবাদ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব (কখনো) কিছুটা ভয়ভীতি দ্বারা, (কখনো) ক্ষুধা দ্বারা এবং (কখনো) জান-মাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। সুসংবাদ শোনাও তাদের, যারা (এরূপ অবস্থায়) ধৈর্যধারণ করে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত ১৫৫) উল্লিখিত আয়াতে পাঁচটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণী তুলে ধরা হলো।
ভয়ভীতি : মহান আল্লাহ মুমিন বান্দাকে কিছুটা ভয়ভীতির দ্বারা পরীক্ষা নেন। ভয় বলতে শত্রুর ভয় বোঝানো হয়েছে, যাতে প্রাণে মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। পূর্ণাঙ্গ ভয়ের কথা বলা হয়নি, যাতে ধ্বংস অনিবার্য হয়ে যায়। এটা বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর নিতান্তই দয়া ও অনুগ্রহ যে, তিনি পরিপূর্ণ ভয় নয়, বরং সামান্য ভয়ের দ্বারা পরীক্ষা করেন। অবশ্য বান্দা যেহেতু দুর্বল, তাই সামান্য ভয়ও অনেক সময় তার পক্ষে অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মহান আল্লাহর প্রতি যার পূর্ণ আস্থা এবং অন্তরে আল্লাহভীতি থাকে, আল্লাহ তাকে সেই অগ্নিপরীক্ষায়ও পাস করিয়ে দেন।
ক্ষুধা : কিছুটা ক্ষুধার দ্বারা মহান আল্লাহ মুমিন বান্দার পরীক্ষা নেন। এমন ক্ষুধা নয়, যাতে একেবারে খাদ্য জোটে না। ফলে অনাহারে মৃত্যু ঘটে। আর চূড়ান্ত পর্যায়ের খাদ্যাভাব দ্বারা পরীক্ষা না করা বান্দার প্রতি মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। এই পরীক্ষা ব্যক্তিভেদে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। ব্যক্তি উচ্চপর্যায়ের হলে পরীক্ষাও একটু বেশি কঠিন হয়। তাই সাহাবায়ে কেরামকে ক্ষুধার কঠিন পরীক্ষাই দিতে হয়েছিল। খন্দকের যুদ্ধে তারা এমন তীব্র ক্ষুধার সম্মুখীন হয়েছিলেন যে, খাদ্যাভাবে তাদের পেটে পাথর পর্যন্ত বাঁধতে হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা এ সম্পর্কে কোনো অভিযোগ করেননি। সেই অবর্ণনীয় ক্ষুধার কষ্ট নিয়েই তারা কর্তব্যকর্মে অবিচল থেকেছিলেন। তারা আমাদের আদর্শ। সুতরাং ভয়ভীতি বা ক্ষুধাকষ্ট দেখা দিলে আমাদেরও কর্তব্য তাদের মতো ধৈর্যধারণ করা।
সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি : মুমিন বান্দার পরীক্ষা নেওয়া হয় অর্থ-সম্পদের ক্ষতি দ্বারা। অর্থাৎ বান্দাকে অভাব-অনটনে ফেলে পরীক্ষা করা হয় সে তাতে ধৈর্যধারণ করে, নাকি ধৈর্যহারা হয়ে অন্যের প্রতি ঈর্ষাকাতর হয় এবং অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে। মহান আল্লাহ এ পরীক্ষাও সহনীয় পর্যায়েই নিয়ে থাকেন। এমন কঠিন অভাবে বান্দাকে ফেলেন না, যার দ্বারা সে সম্পূর্ণরূপে নিরুপায় হয়ে যায় এবং সব রকম প্রয়োজন পূরণে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। হ্যাঁ, বিষয়টা যেহেতু পরীক্ষা, তাই অভাব-অনটনের একটা পর্যায়ের কষ্ট তো হবেই। কিন্তু সেই কষ্টে ধৈর্যধারণ করতে পারলে মহান আল্লাহ খুশি হন এবং অভাবের স্থলে স্বাচ্ছন্দ্য দান করেন।
প্রাণহানি : মুমিন বান্দার পরীক্ষা নেওয়া হয় জানের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। হয়তো চোখের সামনে প্রাণপ্রিয় সন্তানের মৃত্যু ঘটল কিংবা স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যু হয়ে গেল। এ রকম পরীক্ষা দ্বারাও মহান আল্লাহ বান্দার সবরের পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। সবার জানের মালিক আল্লাহ। তিনি তার মালিকানাধীন যেকোনো বস্তু যখন ইচ্ছা নিয়ে যেতে পারেন। সেই নিয়ে যাওয়াকে মেনে নেওয়াই বান্দা হিসেবে প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য।
ফসলহানি : মুমিন বান্দার পরীক্ষা নেওয়া হয় ফল ও ফসলহানির দ্বারা। হয়তো ঘূর্ণিঝড়ে ফসলের মাঠ তছনছ হয়ে যায় বা বানের পানিতে ক্ষেত-খামার ডুবে যায় কিংবা খরার উত্তাপে ফলের বাগান পুড়ে যায় ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে আমাদের কর্তব্য হলো ধৈর্যধারণ করা। যারা এসব পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করবে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ পুরস্কারের সুসংবাদ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে এসব পরীক্ষায় উত্তম ধৈর্যধারণের তওফিক দান করুন। আমিন।
