বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘সরকারের নির্লিপ্ততা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতায় সারা দেশে মবক্রেসির রাজত্ব হচ্ছে। আমরা জুলাই ছাত্র গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত করেছিলাম ডেমোক্রেসির জন্য। আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, চেয়েছিলাম ডেমোক্রোসি, হয়ে যাচ্ছে মবক্রেসি।’
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে যুবদলের উদ্যোগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও অন্তর্র্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততার প্রতিবাদে আয়োজিত মিছিল ও সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশ শেষে নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে বিজয়নগর, পুরানা পল্টন, প্রেস ক্লাব, মৎস্য ভবন হয়ে শাহবাগ গিয়ে শেষ হয় মিছিলটি।
‘বিএনপিকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে’ এমন অভিযোগ করে মিছিলপূর্ব সংক্ষিপ্ত সমাবেশে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘৫ আগস্টের পর অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে আমরা এই সরকারের সফলতা কামনা করেছি। আমরা সরকারকে সব সময় সব ধরনের সহযোগিতা করেছি। কিন্তু আজ গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। বিভিন্নভাবে পরিকল্পিতভাবে ইস্যু সৃষ্টি করে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘কারা এসব করছে? কারা ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের পথ পুনরায় সৃজন করতে চাচ্ছে? সেই প্রশ্নের জবাব আমরা দিতে পারি। যারা ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসন চায়, যারা গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় এবং বিভিন্ন ইস্যু সৃষ্টি করে গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে কলঙ্কিত করতে চায়, তারা।’
এ সময় জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, ‘গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠেছে যেকোনো মূল্যে এই ঐক্যকে অটুট রাখতে হবে।’
সরকারের উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচনকে বিলম্বিত করতে যারা ষড়যন্ত্র করছে, তারা যেন আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়। জনগণের মনে যেন এ রকম প্রশ্নের উদ্রেক না হয়, যে সরকার একটি বিশেষ দলকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।’
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম লন্ডন বৈঠকের পর আপনি ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন আয়োজনে কমিশনকে যথাযথ নির্দেশনা দেবেন। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করলাম আপনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ে মিটিং করছেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে এখনো যথাযথ নির্দেশনা দেননি। আশা করি, জাতিকে আশ্বস্ত করবেন।’
অন্তর্র্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন পৃথিবীর ইতিহাসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ।
যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্নার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়ন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক এনাম, সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, উত্তরের আহ্বায়ক শরিফউদ্দিন জুয়েল, সদস্যসচিব সাজ্জাদুল মিরাজ প্রমুখ।
ছাত্রদলের ১৪২ শহীদের কেউ গেজেটেড হয়নি : মির্জা ফখরুল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমার খুব দুঃখ হয়, যখন দেখি আমাদের আহতরা বলে ‘আমরা সাহায্য-সহায়তা পাইনি।’ এই সরকার কেন পারল না এখনো সহায়তা দিতে? ছাত্রদলের ১৪২ শহীদের কেউ গেজেটেড হয়নি। তাহলে কার নাম গেজেটেড হচ্ছে? কেবল একটা কথা বলি, আমরা তাদের অবদান যেন স্মরণে রাখি। গতকাল বৃহস্পতিবার জুলাই আন্দোলনের শহীদ ছাত্রদের স্মরণে ছাত্রদল আয়োজিত স্মরণসভায় তিনি এমন মন্তব্য করেন।
স্মরণ সভায় ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সভাপতিত্বে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমান, বিএনপি কেন্দ্রীয় তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলালসহ বিএনপির সিনিয়র নেতারা বক্তব্য প্রদান করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গত ১৭ বছরে ২০ হাজার নেতাকর্মীকে এক্সট্রা জুডিসিয়াল কিলিং ও বিভিন্নভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ মামলা দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা মিথ্যা মামলায় আমাদের দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ৬ বছর কারাগারে রাখা হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে শারীরিক নির্যাতন করে আমাদের দেশনেতা তারেক রহমানকে বিদেশে নির্বাসিত করা হয়েছে। এসবের মধ্যেও বিএনপি থামেনি, ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আজকে ছাত্রদলের যারা আছেন, সবার সঙ্গে আমরা কারাগারে ছিলাম। অনেক ছাত্রদল নেতাকর্মী এলাকায়, গ্রামে থাকতে না পেরে শহরে এসে নৈশপ্রহরীর কাজ করেছে, গাড়িচালক হয়েছে, রিকশা চালিয়েছেন। এই বয়সে আমি এতটুকু হতাশ নই। বাংলাদেশের মানুষের এটাই ইতিহাস লড়াই করে করেই বাংলাদেশের মানুষ বেঁচে থাকে।
তিনি আরও বলেন, বন্ধুরা, আপনারা গর্ব করতে পারেন, এদেশে যা কিছু মহান অর্জন হয়েছে, তা হয়েছে বিএনপির হাতে। কারণ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। এই স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশাল থেকে টেনে সামনে এনে প্রথম যে রাজনৈতিক সংস্কার করা হলো, একটা বহুদলীয় গণতন্ত্র যে করা হলো, তা করেছেন জিয়াউর রহমান। সংবাদপত্রগুলোকে স্বাধীন করেছেন। ৪টি ব্যতীত সব বন্ধ করেছিল শেখ মুজিবুর রহমান। ওই ফ্যাসিস্টরা এভাবেই দেশকে গোলাম বানাতে চেয়েছিল।
তিনি বলেন, ইঘচ রং ফবসড়পৎধপু, ইঘচ রং ভৎববফড়স, ইঘচ রং ফবাবষড়ঢ়সবহঃ এটা মনে রাখবেন। আমরাই করেছি, আমরাই করব। তাই আমরা কারও পাতা ফাঁদে পা দেব না। উত্তেজিত হব না, প্ররোচিত হব না। তারা চায়, গণতন্ত্রের উত্তরণ ব্যাহত হোক। নির্বাচন নিশ্চয়ই ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে। আপনারা ধৈর্য হারাবেন না, উত্তেজিত হবেন না, প্ররোচিত হবেন না।
চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান বলেন, দেশব্যাপী তারেক রহমান আজকে মানুষের মন জয় করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচনে তারেক রহমান আসবে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে, দ্রুত আমরা তাকে নিয়ে আসব এবং নির্বাচনে আল্লাহর রহমতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। সেজন্য প্রস্তুতি নেন। ছাত্রদল অপ্রতিরোধ্য শক্তি। এই শক্তিকে কেউ দমাতে পারবে না, কোনোদিন পারেনি।
বিএনপির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারি হেলাল বলেন, ১৭ বছর যে আন্দোলন হয়েছে তাতে এককভাবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ১৭৬ জন শহীদ রয়েছেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ১৪২ জন আছেন। গতকাল গোপালগঞ্জে যে আঘাত হয়েছে তা গণঅভ্যুত্থানের ওপর আঘাত। মনে রাখতে হবে, নো কমপ্রোমাইজ ফ্যাসিবাস। নো কমপ্রোমাইজ আওয়ামী লীগ। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে পরাজিত হয়েছে। পরাজিত শক্তির কোনো আঘাতকে বাংলাদেশে ছাড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম খান আলিম বলেন, শেখ মুজিব বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় শাসন কায়েম করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুতরাং সেই জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে কথা বলার আগে দশবার চিন্তা করবেন।
ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ১৬ জুলাই রংপুরে গিয়ে জানতে পারি, নির্দলীয় সরকারের চার উপদেষ্টা শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারতের কথা থাকলেও তারা সময় পাননি। এলাকাবাসী ও স্বজনরা আমাদের জানিয়েছেন, এই শহীদদের প্রতি বিরোধী ব্যানারের নেতাদেরও কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। তারা কেউ কবর জিয়ারতে যাননি। এক বছরের মাথায় এমন দৃশ্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। যারা শহীদের রক্তে রাজনীতি করে আজ নেতৃত্বে এসেছেন, তারাই সেই শহীদদের ভুলে গেছেন। আমাদের পক্ষ থেকে জানিয়ে দিচ্ছি, ছাত্রদল সবসময় শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণে রাখবে এবং রক্তঋণ শোধের সংগ্রামে সামনের কাতারে থাকবে।
