চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম টানেল নিয়ে যে ধরনের আশা ও সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল ২০ মাস পর তার চিত্র হতাশায় ডুবছে। চট্টগ্রামকে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’ হিসেবে গড়ে তোলা ছিল এ টানেল নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য। বাস্তবে টানেলের প্রভাবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন এলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে সেভাবে আলো ফেলতে পারেনি। যার কারণে সমীক্ষায় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো যানবাহনের সংখ্যার সিকিভাগও চলে না এ টানেলে। সবমিলিয়ে আশার আলো জ¦লছে মিটমিট করে।
প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার এ টানেল চালুর পর থেকেই লোকসানে রয়েছে। টোল বাবদ যা আয় হচ্ছে, তা দিয়ে টানেলটির পরিচালন ব্যয়ই উঠছে না। ব্যয় মেটাতে প্রতিবছর শত কোটি টাকা লোকসান গুনছে নির্মাণকারী সংস্থা বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরও এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর টানেল থেকে লোকসান গুনতে হতে পারে ১৬৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।
সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, টানেলটি চালুর পর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টোল আদায় হয় ২৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর টানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় হয় ১৭৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এই অর্থবছর প্রায় ৮৭ লাখ টাকা টোল অব্যাহতি দেওয়া হয়। সবমিলিয়ে ১৭৫ কোটি টাকার বেশি পরিচালন ব্যয় হয়। সে হিসাবে টানেল চালুর প্রথম অর্থবছরেই প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টানেলের টোল আদায় হয়েছে ৩৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। আর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় হয়েছে ২২২ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ অর্থবছর টোল অব্যাহতি দেওয়া হয় ৭৮ লাখ টাকার বেশি। এ ছাড়া টানেলের বাইরে রাস্তা ও মহাসড়ক সংস্কার, স্যানিটেশন এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় হয় আরও ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। সবমিলিয়ে ২২৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এ হিসাবে গত অর্থবছর প্রায় ১৮৯ কোটি টাকা টানেলে লোকসান হয়েছে।
এই দুই অর্থবছরের লোকসানের ধারা চলতি অর্থবছরেও অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধরে নিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। প্রায় ১৭০ কোটি টাকা লোকসানের পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে টানেল থেকে টোল আদায় হবে ৩৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। বিপরীতে টানেল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় হবে ২০৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী টানেল প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। কিন্তু টানেল চালু হয়েছে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর। টানেলের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। তখন সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, টানেল চালু হলে ২০২০ সালে দিনে ২০ হাজার ৭১৯টি গাড়ি চলবে। প্রতিবছর তা ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়বে। ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলবে। ২০৩০ সালে সংখ্যাটি দাঁড়াবে দিনে প্রায় ৩৮ হাজারে। কিন্তু এই সমীক্ষার ধারেকাছেও নেই বাস্তব চিত্র। চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের তথ্য বলছে, গত এপ্রিল মাসে প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার ১০টি যানবাহন টানেল ব্যবহার করেছে।
সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, কক্সবাজার ও মাতারবাড়ীকে টানেলের সঙ্গে দ্রুত যুক্ত করা হবে। মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গেও সংযোগ হবে টানেলের। যুক্ত হবে চট্টগ্রাম বন্দরের বে টার্মিনাল প্রকল্পও। তবে এসবের কোনোটিই হয়নি বাস্তবে। অন্যদিকে টানেলের আনোয়ারা প্রান্তে এখনো তেমন কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। এতে যান চলাচলও বাড়ছে না। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এসব অবকাঠামো যতদিন না হবে, ততদিন এ প্রকল্প থেকে কোনো সুফল পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এদিকে, টানেলের চাইতে এখনো ছয় গুণ বেশি জনপ্রিয় আগের শাহ আমানত সেতু, আয়ও দ্বিগুণের বেশি। টানেল যেখানে গাড়িশূন্য, সেখানে সেতুতে রীতিমতো যানজট। পরিসংখ্যান বলছে, টানেলে যেখানে প্রতিদিন গাড়ি চলাচল করে চার হাজার, সেখানে শাহ আমানত সেতুতে চলে ২৫ হাজারের কাছাকাছি। টানেলে ১২ লাখ টাকা দৈনিক আয়, আর সেতুতে হয় ২৫ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা থেকে আনোয়ারা প্রান্ত হয়ে টানেলের সংযোগ সড়ক যুক্ত হয়েছে পিএবি সড়কে। টানেলের সঙ্গে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার হাইওয়ে সড়ককে যুক্ত করতে আনোয়ারার কালাবিবি দীঘির মোড় থেকে কর্ণফুলীর শিকলবাহা ওয়াই জংশন পর্যন্ত সড়কটি ছয় লেনে উন্নত করার প্রকল্প নেয় সওজ। তবে এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি সেই সড়কের কাজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিগগিরই পর্যটন শহর কক্সবাজার পর্যন্ত সড়ক না হলে, আগামীতে এ টানেল বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
এ বিষয়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী পিন্টু চাকমা বলেন, ‘সংযোগ সড়ক নির্মাণ কাজের ২০ শতাংশ এখনো বাকি রয়েছে। পুরো কাজ সম্পন্ন হলে যানবাহন চলাচল আরও গতি পাবে।’
নদীর তলদেশে নির্মিত টানেলের ভেতরে প্রতিদিন কৃত্রিম অক্সিজেন ও আলো সরবরাহ রাখতে হয়। এ ছাড়া সামগ্রিক নিরাপত্তা ও জরুরি নিরাপত্তা বাবদ বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। এ কারণে টানেলটি পরিচালনা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তাছাড়া টানেলের প্রায় ১০ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল চীনের এক্সিম ব্যাংক থেকে। সে ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় বর্তমানে সুদ যুক্ত কিস্তি প্রদান করতে হচ্ছে। সার্বিক হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিন গড়ে টানেলটির ব্যয় নির্বাহে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। অথচ বিশাল এই প্রকল্প থেকে প্রতিদিন সরকারের লোকসান গুনতে হচ্ছে ২৭ লাখ ৯ হাজার টাকারও বেশি। বিপরীতে আয়ের প্রধান খাত টানেলে চলাচল করা যানবাহন থেকে আদায় হওয়া টোল।
টানেলটি লাভজনক পর্যায়ে নিতে সরকার কাজ করছে জানিয়ে সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, ‘টানেলে এখন গাড়ি কম চলছে, এজন্য পরিচালনায় জনবলও কমিয়ে দিয়েছি। আমাদের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে যতটা সম্ভব ব্যয় কমিয়েছে। এরই মধ্যে টানেলের ব্যয় খাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা কমানো সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া লোকসান কমিয়ে আনার জন্য টানেল দিয়ে যাতে ঢাকা-কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়, সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে টানেল ব্যবহারে গাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং আয়ও বাড়বে।’
যদিও বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এই প্রকল্পটিকে তাদের বড় অর্জন হিসেবে প্রচার করে আসছিল। এখন লোকসান হলেও ঋণের টাকা পরিশোধে এটি চালু রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখছেন না কেউই।
