বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে উত্তরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থীদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহমর্মিতা জানিয়েছেন দলটির নেতারা। এর অংশ হিসেবে গতকাল শুক্রবার সকালে মাইলস্টোন স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান আনিকার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সহমর্মিতা জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।
বিমান দুর্ঘটনার চারদিন পার হলেও বিমানবাহিনী এখন পর্যন্ত কোনো দায়দায়িত্ব না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে গয়েশ্বর বলেন, ‘ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বের করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় দেশের নানান সংকটে অন্তর্বর্তী সরকার দায় এড়াতে পারছে। নির্বাচন যত বিলম্বিত হবে সরকার নানান ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং সংকট সৃষ্টি হবে। সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি অভিজ্ঞতার অভাব থাকায় অন্তর্র্বর্তী সরকার বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে।’
এদিকে মাইলস্টোন স্কুলের একই পরিবারের নিহত দুই ভাই-বোন নাজিয়া ও নাফির পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। নাজিয়া-নাফির পিতা আশরাফুল আলম বলেন, আমার বাচ্চাদের কবরের ওপরে দুই বছর পরে যাতে অন্য কারও কবর না দেওয়া হয়।
এ সময় রিজভী বলেন, ‘আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মাইলস্টোনের ঘটনার পর থেকেই সার্বক্ষণিক আপনাদের সবার খোঁজ রাখছেন। সন্তান হারানোর বেদনার থেকে বড় শোক আর কিছু হতে পারে না। আপনার সন্তানদের কবরের ওপর যাতে আর কারও কবর দেওয়া না হয়; সেই বিষয়টি আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করব।’
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. শরীফুল ইসলাম, জাসাস যুগ্ম আহ্বায়ক জাহেদুল আলম হিটো, কেন্দ্রীয় ছাত্রদল সহ সভাপতি ডা. আউয়াল, উত্তরা আধুনিক মেডিকেলের ডা. মুনতাসির, তাসিন, মুসাদ্দিক-সহ নেতারা।
এ ছাড়া নিহত সারিয়া আকতারের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমাবেদনা জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটি সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সাদ আলাউদ্দিনের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, নাজিয়া নাফির পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন এবং নীলফামারীতে শিক্ষিকা মেহেরীন চৌধুরী কবর জিয়ারত করে তার পরিবারের সদস্যদের সমাবেদনা জানিয়েছেন মহিলা দল কেন্দ্রীয় কমিটির সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল বিকেলে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে দলের একটি প্রতিনিধিদল ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত তৌকিরদের বাসায় তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ সমাবেদনা জানায়।
বিএনপি মহাসচিব শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহমর্মিতার বার্তা পৌঁছে দেন।
এ সময় বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তাবিষয়ক টিমের চিফ কো-অর্ডিনেটর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কেএম শামছুল ইসলাম প্রমুখ। অন্যদিকে নিহত তৌকিরের পরিবারের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন তার শ্বশুর এবং স্ত্রী আকশা আহম্মেদ নিঝুমসহ অন্য সদস্যরা।
মাহেরীন চৌধুরী সব শিক্ষক জাতির জন্য আদর্শ :
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আফরোজা আব্বাস বলেছেন, ঢাকা উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাহসী শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী একজন জাতীয় বীর। তিনি নারী হয়েও সমগ্র জাতীর জন্য গর্বিত হয়ে চিরদিন মাইলস্টোন হয়ে থাকবেন। গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে নীলফামারীর জলঢাকা পৌরসভার তিন নম্বর ওয়াডের বগুলাগাড়ী চৌধুরীপাড়া এলাকায় নিহত মাহেরীন চৌধুরীর কবর জিয়ারত ও পরিবারকে সমবেদনা জানাতে বিএনপির পক্ষে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে মহিলা দলের নেতারা আসেন। এ সময় আফরোজা আব্বাস এ কথাগুলো বলেন।
তিনি বলেন, ওই ঘটনায় যারা স্বজন হারিয়েছেন তারাই বোঝেন কাউকে হারানোর কষ্ট, আমরা শুধু দেখছি আর বাকরুদ্ধ হয়ে কাঁদছি। আফরোজা আব্বাস আরও বলেন, মাহেরীন চৌধুরী এতগুলো বাচ্চাকে বাঁচিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করে প্রমাণ করেছেন তিনি একজন মা, তিনি একজন আর্দশবান শিক্ষক। বাচ্চাগুলোর সঙ্গে তার রক্তের সম্পর্ক ছিল না, তাদের সঙ্গে আত্মার সম্পর্ক ছিল। তিনি সেখানে সব বাচ্চাকে নিজের বাচ্চা মনে করে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। শিক্ষকতা যে একটি মহান পেশা সেটার যে মহানুভবতা, সেটা দেখিয়ে গেলেন তিনি। মানবতা কী সেটিও আমাদের শিখিয়ে দিলেন। তাই তিনি সব শিক্ষক জাতির জন্য আর্দশ উদাহরণ হয়ে থাকবেন। তিনি বলেন, আমরা নারী সমাজ গর্ব করে বলতে পারি, তিনি (নিহত মাহেরীন চৌধুরী) মহান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন আরেক বেগম রোকেয়া, আরেক বীর তারামন বিবি, আরেক বীর ড. সেতারা বেগম।
তিনি নিহত মাহেরীন চৌধুরীকে রাস্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন। আফরোজা আব্বাস বলেন, আমরা দেখতে পেলাম মালয়েশিয়া থেকে মাহেরীন চৌধুরীকে সম্মান দেওয়া হয়েছে। এটা সব থেকে আগে আমাদের দেশের সরকারের করা উচিত ছিল। তাকে অনেক দেরিতে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। তার যেটা প্রাপ্য তা তাকে সেটা অবশ্যই দিতে হবে। এখন তাকে সরকার কী দিল না দিল আমরা সেটা কেয়ার করি না, তবে আমরা সমগ্র নারী সমাজ মনে করি, তিনি আমাদের হৃদয়ে আছেন এবং থাকবেন। আমরা তার আদর্শকে ধারণ করে নারীদের এগিয়ে নিতে চাই। এ সময় উপস্থিত অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, নীলফামারী জেলার জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সভাপতি তাসনিম ফৌজিয়া ওপেল, রংপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট জিনাত ফেরদৌস রোজিসহ স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন মরহুম মাহেরীর চৌধুরীর স্বামী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার মনছুর হেলাল, দুই ছেলে আয়ান রহীদ মিনাদ চৌধুরী ও আদিল রহীদ মাহিন চৌধুরী এবং তাদের পরিবারের অন্য সদস্যরা।
গত ২১ জুলাই দুপুরে রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। ওই ২০ জন শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচিয়ে শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী দ্বগ্ধ হন।
প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নের জায়গা এখানে নয় : মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মরহুমা মাসুকা বেগম নিপুর কবর জিয়ারত করতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের সোহাগপুর গ্রামে আসেন কেন্দ্রীয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। গতকাল মাসুকা বেগম নিপুর কবর জিয়ারত শেষে নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন।
এ সময় তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও আমরা উপলব্ধি করব, সজাগ হব, সতর্ক হব। জনবহুল এলাকায় প্রশিক্ষণ করা যায় না। প্রশিক্ষণ বিমান উড্ডয়নের জায়গা এখানে নয়, এটা জনবহুল এলাকার বাইরে। কক্সবাজার হতে পারত। সেখানে সমুদ্রের পাড়ে, নদীর পাড়ে অন্যথায় হতে পারত। তারপর আমরা জানি যে, যশোরে সে ধরনের প্রশিক্ষণ হয়, সেখানে হতে পারত, অথবা যেখানে শীতের মৌসুমে অনেক সময় আমরা দেখেছি সামরিক যে মহড়া হয় এ ধরনের মহড়া হওয়ার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন এলাকা, শান্তিপূর্ণ এলাকা, সে জায়গায় হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু কেন এখানে হলো সেটাই তদন্তে বেরিয়ে আসবে।
এ সময় কেন্দ্রীয় বিএনপির অর্থনৈতিকবিষয়ক সম্পাদক ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জি. খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম সিরাজসহ জেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল অঙ্গ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
