ঘড়ির কাটা টিক টিক করে প্রতিটি সেকেন্ড চলে যাওয়ার বার্তা দেয়। ঘড়ির এই মৃদু শব্দটাই কনডেম সেলে বন্দিদের বুকের ভেতরে তীব্রভাবে আঘাত করে। তাদের জীবন থেকেও যে একটা সেকেন্ড কমে গেল! সেই কনডেম সেলে এখন ২ হাজার ৬০০ বন্দি, যা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অর্থাৎ রেকর্ডসংখ্যক।
বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ যখন এই চরম শাস্তি থেকে বের হয়ে আসছে তখনো এ দেশের জেল কর্তৃপক্ষ স্পর্শকাতর এসব বাড়তি বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থের ওপর বিশেষ নজর রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সর্বোচ্চ মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি এখন কারাগারে আছেন। সংগত কারণেই এই বন্দিদের বিষয়টি স্পর্শকাতর। অনেকেই অসহিষ্ণু আচরণ করেন। তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের বিষয়টির দিকে যথাযথ খেয়াল রাখতে হয়।’
আইন ও বিচার বিশ্লেষকদের মতে, অধস্তন আদালতে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হিসেবে প্রাণদন্ডাদেশ হচ্ছে প্রায় নিয়মিতই। আইন ও বিধিবিধানের বাইরেও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাপক হারে সর্বোচ্চ এই সাজা দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ আদালতে মামলার জট ও বেঞ্চ স্বল্পতায় মৃত্যুদন্ড অনুমোদনের ডেথ রেফারেন্স মামলা নিষ্পত্তিতে রয়েছে ধীরগতি। বছরে ৮০০ থেকে ১ হাজার ডেথ রেফারেন্স মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় গড়ে মাত্র ৫০ থেকে ১০০টি। এর জন্য চার-পাঁচটি বেঞ্চ থাকে। তবে, প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের উদ্যোগে হাইকোর্টে এখন সাতটি দ্বৈত বেঞ্চে ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হচ্ছে, যা আশাব্যঞ্জক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশে খুন, ধর্ষণ, ধর্ষণজনিত কারণে মৃত্যু, যৌতুকের জন্য হত্যা, ডাকাতিকালে হত্যা, অ্যাসিড নিক্ষেপ, মাদক বহন, মানব পাচার, রাষ্ট্রদ্রোহ, অপহরণকালে কারও মৃত্যু ঘটানো এ ধরনের গুরুতর অপরাধে প্রাণদন্ডের মতো কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। বিশেষ ক্ষমতা আইনের কিছু ধারায় মৃত্যুদন্ডের বিধান আছে। অধস্তন আদালতে কারও মৃত্যুদন্ড হলে কারাবিধির (জেল কোড) ৯৮০ ধারা অনুযায়ী আসমিকে অন্যান্য বন্দি থেকে পৃথক রাখা হয়। এই পৃথক সেল ব্রিটিশ আমল থেকে ‘কনডেম সেল’ নামে পরিচিত। অন্যান্য বন্দি থেকে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামির জীবনাচারও ভিন্ন হয়। তবে, অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদন্ডের সাজা হলেও উচ্চ আদালতের অনুমোদন ছাড়া সাজা কার্যকর করা যায় না।
প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সর্বোচ্চ এবং কঠোর এই সাজা নিয়ে পৃথিবী জুড়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি ও মত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া, সৌদি আরব, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরাকসহ যেসব দেশে মৃত্যুদন্ডের সাজা বেশি হয় বাংলাদেশ তার একটি। তবে, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সাজার রায় হলেও অন্যান্য দেশের তুলনায় সাজা কার্যকর হয় কম। অধস্তন আদালতে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত বেশিরভাগ আসামির সাজা উচ্চ আদালতে রহিত হয়ে যাবজ্জীবন হয়। এমনকি খালাসের ঘটনাও কম নয়।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক তথ্যমতে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর ১১৩টি দেশ মৃত্যুদ-ের বিধান আইন বাতিল করেছে। ৫৪টি দেশে মৃত্যুদন্ডের সাজা কার্যকর হয়। ২৩টি দেশে আইনে মৃত্যুদন্ড থাকলেও গত ১০ বছরে সেসব দেশে এই সাজা কার্যকর হয়নি। আর ৯টি দেশে গুরুতর অপরাধ ছাড়া সর্বোচ্চ এই সাজা দেওয়া হয় না। বিভিন্ন দেশে ফায়ারিং স্কোয়াড, লেথাল ইনজেকশন, নাইট্রোজেন গ্যাস প্রয়োগ করে, শিরেদ ও ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে প্রাণদন্ড কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হচ্ছে।
ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বন্দি : কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ জুলাই পর্যন্ত ২ হাজার ৬১৮ মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি রয়েছেন ১৩টি কেন্দ্রীয় ও ৫৫টি জেলা কারাগারে। এর মধ্যে নারী আসামি ৫৭ জন। আসামিদের মধ্যে হাইকোর্টে বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছেন ২ হাজার ২৭৩ জন বন্দি। এ ছাড়া আপিল বিভাগে মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছেন ৩৪৫ জন আসামি। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে শূন্য থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত আসামি আছেন ৭৮১ জন। ৬ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত আসামি আছেন ৬৫৫ জন। ১১ থেকে ১৫ বছর বা এর ঊর্ধ্বে ৬২০ জন আসামি। ১৬ বছর বা এর বেশি সময় ধরে বন্দি আছেন ৫৬২ জন। কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত মৃত্যুদ-াদেশপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন ১ হাজার ৭৫০ জন। সাড়ে পাঁচ বছরের কিছু বেশি সময়ে সর্বোচ্চ সাজার আসামি বেড়েছে সাড়ে ৮০০’র বেশি।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জানান, মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ সেলে সাধারণত তিনজন করে আসামি রাখা হয়। সেলের দীর্ঘ কারাবাসে আসামিদের অনেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। অনেকে অসহিষ্ণু ও অপ্রকৃস্থিত আচরণ করেন। কারা কর্তৃপক্ষের তরফে তাদের নিয়মিত চিকিৎসা, কারাবিধি অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হয়। তারা যেন মানসিক প্রশান্তির মধ্যে থাকেন সেজন্য অনেক কারাগারের বিশেষ সেলে এখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিনোদন হিসেবে টেলিভিশন দেখা, দাবা, লুডু খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ছাড়া সকালে ও বিকেলে দুই বেলা কিছু সময়ের জন্য বাইরে হাঁটাহাঁটির সুযোগ দেওয়া হয়। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারে প্রশিক্ষণ বা সশ্রম কারাবাসের বিধান নেই।
অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ শাহজাহান সাজু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী, সাক্ষ্য, তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করেই সর্বোচ্চ সাজার বিধান রয়েছে। বিচারকরাও তা অনুসরণ করেই রায় দেন। তবে, এটা ঠিক বিচারকদের সবার মানসিকতা সমান নয়। কারও কারও মধ্যে হয়তো বেশি বেশি মৃত্যুদন্ড দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ডেথ রেফারেন্স মামলা স্পর্শকাতর। এমনিতেই বেঞ্চ স্বল্পতা রয়েছে। আর আইনি বিশ্লেষণ করে বিচার শেষ হতেও একটু সময় লাগে। এই সময়টা কীভাবে যৌক্তিক করা যায় তা নিশ্চয়ই সুপ্রিম কোর্টের চিন্তাভাবনায় রয়েছে।’
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা অনুযায়ী, অধস্তন আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদন্ডের রায়ের পর যাবতীয় নথি হাইকোর্টে পাঠালে তা ডেথ রেফারেন্স হিসেবে নথিভুক্ত হয়। আসামির (কারাগারে থাকলে) পক্ষে আপিল এবং আপিলের আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে জেল আপিল হয়। পেপারবুক (রায়সহ যাবতীয় নথি) প্রস্তুত সাপেক্ষে মামলা শুনানির কার্যতালিকায় আসে। হাইকোর্টে মৃত্যুদন্ড বহাল থাকলে আপিল বিভাগে আপিল কিংবা জেল আপিলের সুযোগ পান আসামি। আপিল বিভাগে সাজা বহাল থাকলে আসামি রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করতে পারেন। রিভিউ আবেদন নামঞ্জুর হলে আসামি শেষ সুযোগ হিসেবে দোষ স্বীকার করে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করতে পারেন। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হলে কারাবিধি অনুযায়ী আসামির ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
সাড়ে ১১শ ছাড়িয়ে ডেথ রেফারেন্স মামলা : ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ডেথ রেফারেন্স মামলা ছিল ৮১৫টি। ওই বছর নতুন করে যুক্ত হয় ১৪৭টি মামলা। একই বছর ৯৬২ ডেথ রেফারেন্স মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় ৮৮টি। ওই বছরের শেষ পর্যন্ত মামলা ছিল ৮৭৪টি। ২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুতে হাইকোর্টে অনিষ্পন্ন ডেথ রেফারেন্স মামলা ছিল ১ হাজার ২১টি। ওই বছর নতুন ডেথ রেফারেন্স আসে ১৯১টি। গত বছরের ১২ মাসে ১ হাজার ২১২টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ৫৮টি। বছর শেষে ডেথ রেফারেন্স মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৫৪টি। চলতি বছরের শুরুতে ১ হাজার ১৫৪টি ডেথ রেফারেন্স মামলার সঙ্গে গত মার্চ পর্যন্ত নতুন করে যুক্ত হয় ২৫টি মামলা। অর্থাৎ বছরের প্রথম তিন মাসে অনিষ্পন্ন ডেথ রেফারেন্স মামলা ১ হাজার ১৭৯। তিন মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩টি ডেথ রেফারেন্স মামলা। মার্চ পর্যন্ত বিচারাধীন রয়েছে ১ হাজার ১৬৬টি ডেথ রেফারেন্স মামলা। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হাইকোর্টে এর আগে এত সংখ্যক ডেথ রেফারেন্স মামলা বিচারাধীন থাকার নজির নেই। তিন বছরের কিছু বেশি সময়ে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স মামলা বেড়েছে প্রায় ৩০০। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া কমপক্ষে পাঁচ বছর আগে ডেথ রেফারেন্স মামলা শুনানির জন্য আসে না। আর আপিল বিভাগ পর্যন্ত ফাঁসির মামলা নিষ্পত্তিতে দুই যুগ পর্যন্ত পেরিয়ে যাওয়ার নজিরও রয়েছে।
হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চে দায়িত্বরত রাষ্ট্রপক্ষের একাধিক আইনজীবী (ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার) আলাপকালে বলেন, এখন ২০১৯ সালের ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি চলছে। একই বেঞ্চে অন্য ফৌজদারি মামলাও থাকে। ব্যতিক্রম বাদে সপ্তাহে দুই বা তিন দিন ডেথ রেফারেন্স মামলার শুনানি হয়। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। কিন্তু তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলা যখন কার্যতালিকায় ও আমাদের কাছে আসে, আমরা শুনানি করি। বেঞ্চ বাড়ানো, দেওয়া না দেওয়া, এটা তো প্রধান বিচারপতির এখতিয়ার।’ তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টে বিচারক স্বল্পতা রয়েছে। তবে, বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগ নিয়ে কাজ করছেন। কী হচ্ছে না হচ্ছে তা সময়মতো জানা যাবে।’
