আইপিসির সতর্কবার্তা গাজায় দুর্ভিক্ষ চলছে

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৫, ০৭:১৭ এএম

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় দুর্ভিক্ষ চলছে বলে সতর্কতা জানিয়েছে বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তীব্র সমালোচনার মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার এই সতর্কবার্তা দিয়েছে সংস্থাটি। আইপিসি বলেছে, দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি এখন গাজা উপত্যকায় চলমান। পাশাপাশি গাজা উপত্যকার মানুষ অনাহারে আছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র ট্রাম্পের এমন মন্তব্য বেশ বিরল। এদিকে, গাজায় গণহত্যার কারণে ইসরায়েলের ২ প্রভাবশালী মন্ত্রীর ওপর প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নেদারল্যান্ডস। এরই মধ্যে চলমান এই যুদ্ধে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে।

বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইপিসি জানিয়েছে, গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ক্ষুধা, অপুষ্টি এবং রোগব্যাধির সঙ্গে ক্ষুধাজনিত মৃত্যুর হারও বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক ২১টি সংস্থার বৈশ্বিক উদ্যোগ আইপিসি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংগঠন ও জাতিসংঘের কিছু সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে এই সংস্থাটি। তারা বিশ্বের নানা প্রান্তের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষুধার মাত্রা নির্ধারণ করে থাকে। তবে আইপিসির এই সতর্কবার্তায় গাজাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এই ধরনের ঘোষণা কেবল বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেওয়া যায় বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আইপিসি বলেছে, তারা বিলম্ব না করে গাজা উপত্যকাকে দুর্ভিক্ষকবলিত হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার কাজ শুরু করবে। সতর্কবার্তায় আইপিসি বলেছে, গাজা উপত্যকায় এই মুহূর্তে সংঘাতের অবসান এবং বাধাহীন ও ব্যাপক পরিসরে জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তার অনুমতি দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। কেবল এই পদক্ষেপই সেখানে মৃত্যুহার ও মানবিক বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র উপায়। কোনো এলাকায় দুর্ভিক্ষ ঘোষণা করতে হলে সেখানকার অন্তত ২০ শতাংশ মানুষের চরম খাদ্যসংকট, প্রতি তিনজন শিশুর একজনের তীব্র অপুষ্টি ও প্রতি ১০ হাজার জনে দুজনের দৈনিক মৃত্যুহার থাকতে হয়। আইপিসির সতর্কবার্তার আগে ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির প্রধান ডেভিড মিলিব্যান্ড এক বিবৃতিতে বলেছেন, দুর্ভিক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা সবসময় বাস্তবতার পেছনে পড়ে থাকে। গত ২২ মাস ধরে গাজায় ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। মানবিক সংকটের কারণে বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার মুখে পড়া ইসরায়েল গত রবিবার থেকে ১০ ঘণ্টার জন্য গাজার কিছু অংশে সামরিক অভিযান বন্ধ রাখা এবং নতুন ত্রাণপথ চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২১ লাখ মানুষের যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার বেশিরভাগ এলাকায় খাদ্যগ্রহণের দিক থেকে দুর্ভিক্ষের মাত্রা অতিক্রম করেছে। এছাড়া গাজা নগরীতে তীব্র অপুষ্টির মাত্রাও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

এদিকে, গাজায় অনেক মানুষ না খেয়ে আছে বলে বিরল এক মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প মন্তব্য করেন, মানবিক ত্রাণ প্রবেশে ইসরায়েলের আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অবরুদ্ধ গাজায় ত্রাণের প্রবাহ বাড়াতে ‘কৌশলগত যুদ্ধবিরতি’ ও নিরাপদ করিডর চালুসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। তা সত্ত্বেও, এখনো গাজার ফিলিস্তিনিরা তাদের সন্তানদের জন্য একমুঠো খাবার জোগাড় করতেও হিমশিম খাচ্ছেন। গাজার মানুষ ক্ষুধার্ত থাকার বিষয়টিকে ‘বাস্তবতা’ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। অথচ রবিবার ট্রাম্পের মিত্র ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, গাজায় কোনো ক্ষুধার্ত মানুষ নেই। পাশাপাশি তিনি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র বাহিনী হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য তাকে নেতানিয়াহুর বচনের বিপরীত দিকে বসিয়েছে, যা বেশ বিরল।

বিশ্ব জুড়ে সমালোচনার মধ্যে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মৎরিচ ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসে প্রবেশ করতে পারবেন না। মঙ্গলবার এই তথ্য জানিয়েছে ইসরায়েলি গণমাধ্যম জেরুজালেম পোস্ট। ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাসপার ভেলদকাম্প বলেন, আমাদের মন্ত্রিসভা ইসরায়েলি মন্ত্রী স্মৎরিচ ও বেন-গাভিরকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশাপাশি, তাদের শেনজেন নিবন্ধন ব্যবস্থায় অনাকাক্সিক্ষত বিদেশি হিসেবেও তালিকাভুক্ত করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ। এটি বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েলের এই দুই মন্ত্রী শেনজেন ভিসার আওতায় থাকা দেশগুলোতেও প্রবেশ করতে পারবেন না। ডাচ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর কারণ হিসেবে বলেন, তারা বারবার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়াতে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের উসকে দিয়েছেন, ধারাবাহিকভাবে অবৈধ বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণের পক্ষে কথা বলেছেন এবং গাজা উপত্যকায় জাতিগত নিধনের আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের হামলায় গাজায় নিহতের সংখ্যা ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। উপত্যকাটিতে প্রায় ২২ মাস ধরে চলা সংঘাতের সময় হত্যা করা হয়েছে এই ফিলিস্তিনিদের। নৃশংস হামলার পাশাপাশি গাজা অবরোধ করে তীব্র খাদ্যসংকট সৃষ্টি করেছে ইসরায়েল। এর জেরে মৃত্যু হয়েছে দেড় শতাধিক মানুষের। তাদের বেশির ভাগই শিশু। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। আজ মঙ্গলবার উপত্যকাটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর ৬৬২ দিনে ৬০ হাজার ৩৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সে হিসাবে প্রতিদিন নিহত হয়েছেন ৯০ জনের বেশি। হামলা শুরুর পর থেকে আহত হয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮৭০ ফিলিস্তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত