তারকা হলে কি দায়মুক্তি মেলে?

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৫, ০৩:০৫ পিএম

দুই সহস্রাব্দ আগে প্রাচীন গ্রীক আইনজ্ঞ সলেন বলেছিলেন, ‘আইন যেন মাকড়সার জাল—যেখানে ছোটরা আটকে যায়, বড়রা ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে।’ ২৫০০ বছর পরেও সেই বাক্যটি আজও শঙ্কাজনকভাবে প্রাসঙ্গিক, বিশেষত বাংলাদেশে, যেখানে মাঠের খ্যাতি অনেক সময়ই খেলোয়াড়দের তুলে রাখে জবাবদিহির পরিধির বাইরে।

ক্রিকেটার তাসকিন আহমেদকে ঘিরে সাম্প্রতিক এক ঘটনায় বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। মারধর ও হুমকির অভিযোগে মিরপুর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন সিফাতুর রহমান সৌরভ। যদিও তাসকিন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং পরে বাদী নিজেই অভিযোগ প্রত্যাহার করতে চাইলে পুলিশ জানিয়েছে, তা লিখিতভাবে জানাতে হবে। ঘটনাটি আপাতভাবে সামান্য মনে হতে পারে, তবে এটি কেবল বরফচূড়ার অদৃশ্য অংশমাত্র—যেখানে একের পর এক উদাহরণ জমে উঠছে, কিছু প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি নিয়ে।

বিশ্বজুড়ে তারকাদের জীবনে শৃঙ্খলাহানির নজির বহু পুরনো হলেও, অনেক দেশে এসব অপরাধের পর খেলোয়াড়দের শাস্তি পেতে হয়েছে দ্রুত ও স্পষ্টভাবে। শেন ওয়ার্ন, তার ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকাকালীন, কেবল এক ব্রিটিশ নার্সের সঙ্গে অশালীন ফোনালাপের অভিযোগেই সহ-অধিনায়কত্ব হারান। টিম পেইন, অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট অধিনায়ক, চার বছর আগের এক অপ্রীতিকর আচরণের দায়ে পদত্যাগ করেন ২০২১ সালে। ইংলিশ পেসার অলি রবিনসন তার এক দশক পুরোনো টুইটের জন্য টেস্ট দলে নিষিদ্ধ হন, যদিও পরে ক্ষমা চাওয়ায় ফিরে আসেন। এমনকি নেপালের সন্দ্বীপ লামিচানেকে ধর্ষণের মামলায় ৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত, যদিও উচ্চ আদালত পরে রায় বাতিল করে।

বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। নানা ঘটনায় ক্রিকেটারদের নাম জড়ালেও শাস্তির দৃষ্টান্ত অপ্রতুল। নারী নির্যাতন ও সাইবার অপরাধের মামলায় কারাবরণ করতে হয় আরাফাত সানিকে। গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় গ্রেপ্তার হন শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী। যৌতুকের মামলায় অভিযুক্ত হন আল আমিন হোসেন। ধর্ষণের অভিযোগে মামলায় পড়েন রুবেল হোসেন ও মোহাম্মদ শহীদ। নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা তাম্মির বিরুদ্ধে অন্যের স্ত্রীকে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাওয়া ও মানহানির অভিযোগে চলছে বিচারিক প্রক্রিয়া। এসব অভিযোগের অনেকটাই নথিভুক্ত, আবার অনেক কিছু থেকে যায় অনুলিখিত, আড়ালে।

ব্যক্তিগত আচরণের প্রশ্নেও ক্রিকেটারদের মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব স্পষ্ট। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে পরাজয়ের পর দর্শকদের সঙ্গে বিবাদে জড়ান শামীম পাটোয়ারী, যা ক্যামেরায় ধরা পড়ে। বিসিবি কার্যালয়ে খাটো প্যান্ট পরে আসার ঘটনাতেও প্রশ্ন উঠে তার পেশাদারিত্ব নিয়ে। আর সাকিব আল হাসান যেন শৃঙ্খলাভঙ্গকে রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত করেছেন—দর্শককে মারধর, ভক্তের ফোন ভেঙে ফেলা, শুটিংয়ের জন্য অনুশীলন বর্জন—সবই যেন নির্বিকারভাবে ঘটেছে।

প্রশ্ন ওঠে, তারকাদের জন্য কি আলাদা নীতিমালা? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেসব খেলোয়াড়রা নিজেদের নৈতিক অবস্থান দিয়ে উদাহরণ স্থাপন করেছেন, তাদের দিকে তাকানোই কি আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়? শচিন টেন্ডুলকার কখনো মদ্যপান বা তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন করেননি—তিনি জানতেন, তার আচরণই অন্যদের প্রভাবিত করবে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো শরীরে উল্কি আঁকাননি, নিয়মিত রক্তদানের কারণে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণ আর দায়িত্ববোধই একজন তারকাকে 'বিশেষ' করে তোলে।

এমন দায়বোধের চরম অভাব আজকের অনেক বাংলাদেশি ক্রিকেটারের মধ্যে। বিসিবি হয়তো অবশেষে উপলব্ধি করেছে বিষয়টির গুরুত্ব। সংস্থাটির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ মিঠু দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ‘আগস্টের শেষ দিকে একটি কর্মশালা আয়োজন করা হবে মনোবিদের সহায়তায়। সেখানে খেলোয়াড়দের আচরণ, দায়িত্ববোধ ইত্যাদি নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—মনোবিদের এক দিনের সেশন কি আদৌ বদলে দিতে পারবে এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে খ্যাতি হয়ে উঠেছে দায়মুক্তির ঢাল?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত