বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এত সমস্যার পরও ১২টা মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য এসেছে, বাকিগুলোতে ঐকমত্যে যাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, প্রতিদিন বৈঠক হচ্ছে কয়েক ঘণ্টা ধরে। অনেক বিষয় আছে যেগুলো তারা করতে চান, সেগুলোর অনেকটা আমরাও ঠিক বুঝি না। আমার মনে হয়, এগুলোকে বাদ দিয়ে যে মৌলিক বিষয় আছে, সেই বিষয়ের সমাধান করে অতিদ্রুত নির্বাচনের দিকে যাওয়া উচিত।’ মির্জা ফখরুলের ভাষ্য, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে নির্বাচনটা হলে অনেক সমস্যা, অনেক দ্বিধা কাটিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছানো যাবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শহীদ স্মরণে আয়োজিত আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল এ কথা বলেন। তার আগে ১৫ বছরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই অভ্যুত্থানে সাংবাদিকদের ওপর সরকারের নিপীড়ন-নির্যাতনে ওপর আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন বিএনপি মহাসচিব।
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব, এতটা হতাশ হবেন না, নিরাশ হবেন না। অতীতে, সেই ’৫২ ভাষা আন্দোলনে, ’৬৯ এ সফল হতে পারি, ’৭১ সফল হতে পারি, ’২৪ সফল হতে পারি, উইথ অল লিমিটেশনস, তাহলে আমরা এটাও পারব। আমরা বিশ্বাস করি বলেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘আমি কারও সমালোচনা করতে চাই না। আজকে পারস্পরিক একটা বোঝাপড়ার সময় যাচ্ছে। একটু বুঝে নিয়ে পরস্পরকে বুঝে আমরা যদি খুব দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে ফলটা লাভ করবে জনগণ। সমস্যাগুলো মিটে যাবে, তা কিন্তু নয়। কিন্তু একটা রাস্তা তৈরি হবে। যে রাস্তার মধ্য দিয়ে আমাদের কথাগুলো, জনগণের কথাগুলো সরকারের কাছে পৌঁছাবে, সেই জায়গাটাতে আমরা যেতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক একটা বোঝাপড়া থাকতে হবে। গণতন্ত্রের কাদা ছোড়াছুড়ি হবে। কিন্তু এটার যেন একটা সীমা থাকে। তা না হলে একটা তিক্ততা সৃষ্টি হয়। যে তিক্ততা ভবিষ্যতে রাজনীতিকে আরও কলুষিত করে।’
স্থায়ী কমিটির সদস্য অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ সাহেব তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করেছিলেন। ওইসময়েও এরকম বিশৃঙ্খল অবস্থা ছিল স্বৈরাচারের পতনের পরে। হোয়াট ইজ গোয়িং অন নাউ। এখন কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একটা মগের মুল্লুুকের মধ্যে আমরা চলছি। এটা থেকে বের হয়ে আসতে হলে ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে জনগণকে অধিকারটা প্রয়োগ করার সুযোগটা সৃষ্টি করে দিয়ে ইজ্জত-সসম্মানে বিদায় হোন। দয়া করে জনগণের অর্জনকে কুক্ষিগত করে শেখ হাসিনার মতো পলায়নের রাস্তা তৈরি করবেন না।’
আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের স্বাধীনতা এখনো আসেনি। ভবিষ্যতে আসবে কি না আমি সন্দিহান। যেদিন আমরা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে আদর্শের ভিত্তিতে ইউনাইটেড হতে পারব সাংবাদিকদের স্বার্থে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার স্বার্থে সেদিন সংবাদপত্র স্বাধীন হবে। তার আগে হবে না।’
মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমার ভয় হচ্ছে, আমাদের হয়তোবা আবার হাত-পা বাঁধা হয়ে যেতে পারে। কোরাজন একুইনো যখন ক্ষমতায় আসেন, ফিলিপাইনে মার্কোসের ২০ বছরের শাসনের পর, তখন তিনি কিন্তু আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন একদিন। তিনি সম্পাদক-বার্তা সম্পাদকদের ডেকে বলেছিলেন, আপনারা যা-ইচ্ছা আমার সরকারের বিরুদ্ধে লেখেন কিন্তু এমন কিছু লিখবেন না, যাতে আপনাদের হাত-পা আবার বাঁধা হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি আমি লক্ষ্য করছি। আমি জানি না আমরা ভুলও হতে পারে। এই হঠকারিতার এই সময়ে কথা বলা খুব বিপজ্জনক।’
জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি হাসান হাফিজের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমা তুজ জোহরা ও শহীদ জাবির ইব্রাহিমের বাবা কবির হোসেন বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে মানবজমিন সম্পাদক মাহবুবা চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য বখতিয়ার রানা, সৈয়দ আবদাল আহমদ, জাহেদ চৌধুরীসহ বিভিন্ন পত্রিকা ও গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে পাঁচ সম্পাদক যায়যায়দিনের শফিক রেহমান, মানবজমিনের মতিউর রহমান চৌধুরী, আমার দেশ-এর মাহমুদুর রহমান, নিউ এজ-এর নুরুল কবীর এবং সংগ্রামের সাবেক সম্পাদক আবুল আসাদকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এ সময় জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের দুই শহীদ পরিবারের সদস্যদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেনকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠান শুরুর আগে প্রেস ক্লাব চত্বরে বিএনপি মহাসচিব নিমগাছের চারা রোপণ করেন।
