ইলিশ নেই তো কাজও নেই

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৫, ০৮:১৪ এএম

একসময় যেখানে প্রতিদিন ভোর থেকেই গুঞ্জনে মুখরিত হতো বরিশালের পোর্ট রোড মৎস্য পাইকারি অবতরণ কেন্দ্র, সেই জায়গাটি আজ যেন একটি নিঃশব্দ নদীর ঘাট যেখানে নেই ইলিশের ছলছল শব্দ, নেই আড়তের হাঁকডাক, নেই রোজগারের ব্যস্ততা। নদীমাতৃক বাংলাদেশের হৃদয়পুর বরিশাল আর বরিশালের প্রাণ ছিল এই পোর্ট রোড, যেখানে প্রতি মৌসুমে হাজার হাজার ইলিশ নামত ঘাটে, ছড়িয়ে পড়ত জেলার আনাচে-কানাচে। কিন্তু এখন নদীতে চর, সাগরে ঝড় আর ব্যবস্থাপনায় রূপালি জৌলুস যেন হারিয়ে গেছে।

অন্যদিকে কর্মহীন হয়ে বসে আছেন শত শত শ্রমজীবী মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৎস্য ব্যবসায়ী, বিক্রেতা, আড়তদার, এমনকি সেসব মাঝি ও জেলে, যারা বছরের এ সময়টাই অপেক্ষায় থাকতেন রুপালি স্বপ্নে। বরিশালের পোর্ট রোড এখন শুধুই এক নীরব বেদনার নাম।

বর্তমানে জেলা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রটির ১৬০টির বেশি আড়তে কার্যত মাছ নেই বললেই চলে। আগে যেখানে প্রতিদিন ভোরে মাছভর্তি ট্রলার ভিড়ত, সেখানে এখন ঘাটে বসে থাকতে দেখা যায় আড়তদার, শ্রমিক, বস্তাবাহক, বরফ কাটার শ্রমিকসহ শত শত মানুষকে। নেই কাজ, নেই আয়। এ যেন জোয়ারের বদলে নেমে আসা দীর্ঘ খরা।

গতকাল শনিবার বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভরা মৌসুমে ইলিশের সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বেড়েছে দিগুণেরও বেশি। এই দিন এক কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৩৫০ টাকা, দেড় কেজি ওজনের ইলিশ ২ হাজার ৮০০ টাকা এবং ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ইলিশ ২ হাজার ১০০ টাকা দর বিক্রি হয়েছে। ইলিশের পাশাপাশি অন্য মাছেরও চড়া দাম লক্ষ করা গেছে।

অন্যদিকে বাজারেও চড়া দাম আর অপ্রতুল সরবরাহের কারণে সাধারণ মানুষও ক্ষোভে ফুঁসছেন।

মো. আলি নামের এক ক্রেতা বলেন, ‘ইলিশের দিকে তাকাতে ভয় লাগে। আগে মাসে একবার হলেও কিনতাম, এখন শুধু দেখে চলে আসি।’

আরেকজন ক্রেতা মো. শাহিন বলেন, ‘সরকার যদি দাম নির্ধারণ না করে, তাহলে ইলিশ খাওয়া আমাদের জন্য স্বপ্নই থেকে যাবে।’ ক্রেতা মো. ইমরান হোসেন নামের এক তরুণ বলেন, ‘ছোট সাইজের এক কেজি ইলিশের দাম ৭০০-১১০০ টাকা। শুনলেই মনে হয় এটা শুধু ধনীদের খাবার। আমাদের পক্ষে এখন আর কেনা সম্ভব না।’

ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারাও একইভাবে দিশেহারা। পোর্ট রোডের খুচরা বিক্রেতা মো. সেলিম আকন বলেন, ‘সরকার অভিযান চালাচ্ছে, ভালো কথা। কিন্তু যদি অভিযান সঠিকভাবে চলত, তাহলে বাজারে এত জাটকা বা ছোট ইলিশ কীভাবে আসে?’

আড়তদার সীব সিকদার জানান, নদীতে মাছই নেই। জেলেরা আবহাওয়ার কারণে সাগরে যেতে পারছেন না। যে অল্প কিছু মাছ উঠছে, তা দিয়ে বাজারের চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। ফলে দামের ওপরও চাপ পড়ছে।

এ সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন মৎস্য মালিক সমিতির সদস্য সচিব মো. কামাল সিকদার। তিনি বলেন, ‘মেঘনার বিভিন্ন পয়েন্টে চর পড়ে গেছে, ফলে ইলিশ চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। যদি এখনই নদী রক্ষা না করা হয়, ভবিষ্যতে বরিশালে আর মিঠাপানির ইলিশ পাওয়া যাবে না। কুয়াকাটার মহিপুর থেকেও এখন আর মাছ আসে না। তারা সরাসরি ঢাকাসহ অন্য স্থানে ইলিশ বিক্রি করে। পদ্ম সেতু এবং পায়রা সেতু হওয়ার কারণে তাদের বরিশাল পোর্ট এখন প্রয়োজন হয় না। আর বরিশালের আশপাশের নদীতেও মাছ নেই। ব্যবসা একেবারেই ভেঙে পড়েছে।

সরকারি পর্যায় থেকেও সংকটের কারণ স্বীকার করা হচ্ছে। বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ বলেন, ‘বজরের সাগর থেকে যদি ইলিশের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকত, তাহলে কেজিপ্রতি ইলিশের দাম অনেক কমে যেত। কিন্তু চলতি বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে সমুদ্র থেকে ইলিশ আহরণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।’

ইলিশ শুধু একটি মাছ নয় এটি নদীকেন্দ্রিক জীবিকা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবনের গল্প। যে জাতি ইলিশকে তার জাতীয় মাছ হিসেবে মর্যাদা দেয়, সেই জাতির মৎস্যকেন্দ্রিক কেন্দ্রবিন্দুগুলোর এই করুণ চিত্র শুধুই উদ্বেগজনক নয়, এটি সতর্কবার্তাও বটে। এখনই যদি নদী রক্ষা, সঠিক অভিযানের বাস্তবায়ন, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও সামঞ্জস্য না আনা হয়, তবে ইলিশ একসময় হয়তো গল্পেই থেকে যাবে বলে মনে করে সচেতন মহল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত