মস্কোর ড্রোনে ভারতীয় যন্ত্রাংশ

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫, ০৩:১৬ এএম

ইউক্রেনে হামলায় রাশিয়া যেসব ড্রোন ব্যবহার করছে, সেগুলোতে ভারতের তৈরি যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে কিয়েভ। গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে প্রেসিডেনশিয়াল চিফ অব স্টাফ আন্দ্রিই ইয়ারমাক দাবি করেছেন, যুদ্ধের ময়দান এবং বেসামরিকদের ওপর পরিচালিত হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনে ভারতীয় সরঞ্জামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। তবে বার্তা সংস্থা রয়টার্স নিরপেক্ষ সূত্রে এ দাবি যাচাই করতে পারেনি। ভারতীয় পত্রিকা ‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’ জানায়, তাদের পর্যালোচনা করা নথি অনুসারে, গত বছর থেকে একাধিক মনুষ্যবিহীন কমব্যাট ড্রোনে ভারতে তৈরি যন্ত্রাংশ পাওয়া গেছে। এরপর ইউক্রেনের পক্ষ থেকে অন্তত দুবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক স্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

ইউক্রেনের দাবি, ভারতের বিষয় ইন্টারটেকনোলজি এবং অরা সেমিকন্ডাক্টর নামের দুই সংস্থার তৈরি যন্ত্রাংশ ব্যবহার হচ্ছে রাশিয়ার ব্যবহৃত ড্রোনে। দাবি করা হচ্ছে, রাশিয়ার ইরানি নকশার ‘শহিদ ১৩৬’ ড্রোনের ভোল্টেজ রেগুলেটর ইউনিনে ইন্টারটেকনোলজির ‘ব্রিজ রেকটিফায়ার ই৩০০৩৫৯’ আছে। আর ড্রোনটির স্যাটেলাইট নেভিগেশন সিস্টেমে আছে অরা সেমিকন্ডাক্টরের তৈরি সিগন্যাল জেনারেটর এইউ৫৪২৬এ চিপ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞাবিষয়ক দূত ডেভিড ও’সালিভানের সাম্প্রতিক নয়াদিল্লি সফরের সময় ইউক্রেনের কূটনীতিকরা রুশ ড্রোনে ভারতীয় এ যন্ত্রাংশ পাওয়ার বিষয়টি তাকেও জানান। ইউক্রেন চায়, রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সংযোগ হতে পারে এমন যেকোনো যন্ত্রাংশ রপ্তানি বন্ধ করুক ভারত।

পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়ার ড্রোন ও অন্যান্য সামরিক হাতিয়ার তৈরির প্রয়োজনে যন্ত্রাংশ কিংবা প্রযুক্তি সরবরাহ সীমিত করার চেষ্টা নিয়েছে, তখন মস্কো এগুলো ভারত, তুরস্ক ও চীনের মতো তৃতীয় পক্ষের কোনো দেশের কাছ থেকে সংগ্রহ করে চলেছে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলমান এ যুদ্ধে ভারত নিজেদের অবস্থান নিরপেক্ষ রেখেছে এবং দেশটি রাশিয়ার তেলের প্রধান ক্রেতাও হয়ে উঠেছে, যা নিয়ে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের উত্তেজনা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ভারত রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে তা প্রক্রিয়াজাত করে তৃতীয় দেশে বিক্রি করছে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত ৪ আগস্ট দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি ভারতের ওপর আরও উল্লেখযোগ্য হারে শুল্ক আরোপ করবেন। এ মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছে নয়াদিল্লি। ভারত পাল্টা দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারের নিয়ম মেনেই তারা রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজেরাও রাশিয়ার কাছ থেকে খনিজ ও জ্বালানি কিনে যাচ্ছে।

এর আগেও রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিদেশি শক্তির সহায়তায় হামলা করার অভিযোগ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সোমবার তিনি বলেন, মস্কোর হয়ে পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, চীন এবং আফ্রিকা মহাদেশের ভাড়াটে সেনারা যুদ্ধ করার তথ্য রয়েছে তাদের কাছে। অতীতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিজেদের বাহিনীতে চীনা সেনা নিয়োগের জন্য অভিযোগের তীর ছুড়েছিলেন জেলেনস্কি। মস্কোর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, বেইজিং তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, গত বছর থেকেই কুরস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার হয়ে উত্তর কোরীয় সেনাদের যুদ্ধ করার অভিযোগ রয়েছে। জেলেনস্কির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনে অবস্থিত তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান এবং পাকিস্তান দূতাবাসে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল রয়টার্স। তবে কোনো পক্ষই তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। এ ছাড়া ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের অভিযোগের জবাবে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা করতে ট্রাম্পের বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ মস্কো পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছেন এক রুশ কর্মকর্তা। গতকাল বুধবার তাকে স্বাগত জানাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন দেশটির বিনিয়োগ প্রতিনিধি কিরিল দিমিত্রিয়েভ। অবশ্য রাশিয়ায় ঠিক কার সঙ্গে উইটকফের বৈঠক হতে যাচ্ছে, সফর আয়োজনে সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা তা নিশ্চিত করতে পারেননি। তবে ওয়াশিংটনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, রুশ নেতাদের সঙ্গে বুধবারই সাক্ষাৎ করবেন উইটকফ। আর তার আগের দিন দেওয়া এক বিবৃতিতে পুতিনের সঙ্গে উইটকফের বৈঠকের সম্ভাবনার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছিল ক্রেমলিন।

ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতির জন্য পুতিন সম্মত না হলে রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি তাদের জ্বালানি তেলের ক্রেতা দেশের ওপরও ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। মস্কোর বৃহত্তম ক্রেতার তালিকায় রয়েছে চীন ও ভারত। তেল আমদানিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের চলা উত্তেজনার মধ্যে মস্কো সফরে গেছেন দিল্লির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। এনডিটিভি জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষদিকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করেরও রাশিয়া সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে। যদিও এ সফর আগেই নির্ধারিত ছিল, তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে এ সফর নতুন মাত্রা পেয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত