অসমাপ্ত মাস্তুল ও বানরের মুখচ্ছবি

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৫, ০৪:৫৫ এএম

কিতাবুদ্দিন লুদিয়া এক শুক্রবারে জুমা পড়বার জন্য মাথায় কাশ্মীরি নামাজি টুপি চেপে বেরিয়ে দেখলেন তার ঘরের সামনের ইট সুরকি বিছানো রাস্তায় মৌসুমি ফল কাঁঠাল ও পেয়ারার স্তূপ; যশোর ও বরিশাল  থেকে ফড়িয়া নৌকা ভরে রাতে এসেছে।  শ্রাবণ বর্ষার কাদায় পথে ছড়ানো পেয়ারা আর কাঁঠাল পাতা এড়িয়ে তার আখরোট বাদাম গাছের কাঠ হতে নির্মিত খড়ম পরে পরনের সাদা চৌকা-অংকিত লুঙ্গি প্রায় হাঁটু অবধি গুটিয়ে খট-খট করে যাওয়ার কালে ওই কাঁঠাল পাতা খেতে থাকা একটি বাঁকানো শিংয়ের মারখোর ছাগলের নাড়ানো লেজে লেপ্টে থাকা জল এসে পড়লে মনে মনে বলে, ‘আরে মড়ার মরুর ছাগল পবিত্রতা নষ্ট করলি’।

কিতাবুদ্দিন বেরিয়ে যাওয়ার পর স্ত্রী হুরমাতয়ারা পিয়ালী পতরে যে লাল সুতা দিয়ে সাদা কাপড়ের ওপর কারুকাজ সূচিকর্ম বুননের সেলাই করছিল তাতে বিরতি নিয়ে জলচৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। বেড়ায় লটকানো মোটা কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো উপবৃত্তাকার আকারের প্রাচীন আয়নায় নিজেকে দেখে। আয়নার সামনেই খোঁপা খুলে আবার বেঁধে পেছনের দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে বাগানের ছাড়িয়ে নদীর ঘাটের দিকে হাঁটে। বাগান শেষে নদীতে সানের ঘাটলা, তার নিচে জিয়ল গাছের গুঁড়িতে বসে গৃহপরিচারিকা শেহজারা দীপালি লেটকে বসে কিতাবুদ্দিনের লুঙ্গি, পায়জামা ও গামছা তরল সাবানে কেচে ধোয়, আর ফাঁকে তার শাড়ির আঁচলের খোটে জমানো জামরুল ছুড়ে মারে ঘাটলার দিকে যেখানে বাগানে বসবাস করা বানরেরা বসে আছে তার ছোড়া জামরুল খাবে বলে।

সিঁড়ি ধরে নেমে হুরমাতয়ারা বাগানের শ্রাবণের কাদা এড়াতে ইটের ওপর এক-পা করে ঘাটের দিকে হাঁটে। মাঝপথে জামরুল গাছের শেকড়ে বসা তার প্রিয় বানর মধুবতী পেছন হতে তার কাঁধে ঝুলে থাকা আঁচল টেনে ধরলে ‘ছেড়ে দে মধুবতী’ বলে টান দেয়, মধুবতী তখন হুরমাতয়ারার কোলের দিকে ঝাঁপায়। মধুবতীকে ঠেলে দিয়ে বকা দেয় ‘তোর সাড়া গায়ে পায়ে কাদা, আমার কাপড় নষ্ট করেছিসরে মধুবতী’। মধুবতী এরপর ঠিক হুরমাতয়ারার অনুকরণে তার সামনে ইট ধরে হাটে। তখন চোখ পরে নদীর ওপারে ইটের ভাটার লম্বা নল হতে বেরুনো ধোঁয়া যেন এক খণ্ড শ্রাবণের কালো মেঘ; তা দেখে তার কেমন লেগে ওঠে।  অ্যারে মধুবতী তোর মধুসোম কই? জিজ্ঞেস করলে পুরুষ সঙ্গী মধুসোম জামরুল গাছের ডাল হতে ঝাঁপিয়ে নেমে হুরমাতয়ারার সামনে দিয়ে লেজ নাড়িয়ে গাব গাছের কাণ্ড বেয়ে ওপরে উঠে যায়; যেন হুরমাতয়ারার প্রশ্ন ‘মধুসোম কই’ কৌতূহলে সাড়া দেওয়া।

হুরমাতয়ারা ঘাটলার নদী-কিনারে বসে তার আলপনা আঁকা পা দু’খানি জলে ডুবিয়ে দেয়। নদীতে উত্তর হতে আসা স্বচ্ছ জলের ওপর দিয়ে আলতা আঁকা বিম্বিত পা’দুখানি  দেখে ভালো লাগে। পার্বতী শেহজারা মাথায় ঘোমটা টেনে কাপড় কাচে, সে টের পায় না পেছনে যে হুরমাতয়ারা ঘাটলায় বসে জলে পা ডুবিয়েছে। সে তার পা ছুড়ে পার্বতীর দিকে জল ছিটিয়ে বলে কীরে পার্বতী তুই ঘোমটা টেনেছিস ক্যানে, তোর কী হয়েছে? পার্বতী জানায় বরিশাল হতে সাত পাল-এর সাম্পান ওই ঘাটে ভিড়েছে, মাঝিরা শোন মেরে আছে যে? ‘তাতে তোর নিজেকে ঢাকতে হবে না; ওরাই এক সময় চোখ ফিরিয়ে নেবে’ হুরমাতয়ারা দেখে, কি বিশাল নৌকা। তার মাস্তুলগুলো কেমন দাঁড়িয়ে আছে। তার ইচ্ছা হয় যদি এমন মাস্তুল নৌকার ছবি কশিদা করে কাপড়ে তুলতে পারত।

শেহজারা  হুরমাতয়ারাকে খবর দেয় এই সাম্পানে বরিশালের লাকুইট্যার নিশিবাবু জমিদার এসেছে নাকি চল্লিশজন পাইক-পিয়াদা লয়ে। একলা মানুষের এত পাইক-পিয়াদা? গৃহকর্মী শেহজারার পার্বতীর এ বিষয়ে অভিমত থাকলেও হুরমাতয়ারার নেই। সে বুড়িগঙ্গার সদরঘাট এর দক্ষিণ দিকের বাড়িটির পেছনের বাগান প্রান্তরের ঘাটলায় জলে ডুবানো তার আলতামাখা পা দুখানি তা তুলে ঘরের দিকে ফেরে পার্বতীকে এই কথা বলে যে, ‘তাতে তোর কিছু যাওয়া-আসা উচিত নয়রে, সে  চল্লিশ কি চারশ।’ হুরমাতয়ারা ঘরে ফিরবার সময়ে আরেকবার পেছনে-ডানে  পাগলা-পোস্তগোলার দিকে তাকায়, দেখে নেয় তাদের ঘাটলা লাগোয়া দক্ষিণে নোঙর করা সাত-পালের সাম্পানের নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকা মাস্তুলদের! হুরমাতয়ারা এমন; কখনো লম্বা-উঁচুর দিকে চোখ পরলে অন্তত আরও একবার তাকায়; মগ ডালে, তালগাছ মাথা, উঁচু ভবনের ছাদের কার্নিশ। ঘরে ফিরেও সাম্পানের সব চেয়ে লম্বা নিঃসঙ্গ মাস্তুলটা তার মন জুরে থাকে।

নামাজ শেষে ফিরবার পথে কিতাবুদ্দিন সেই মাখরোর ছাগল খোঁজে কিন্তু দেখতে পায় না। ঘরে ফিরে সেই দুপুরে পোলাও, ঝিঙ্গা ভাজি আর পাঙ্গাশ মাছের ঝোল দিয়ে শীতল পাটি বিছিয়ে খাওয়ার সময়ে হুরমাতয়ারা পাশে তাল পাতার পাখা নিয়ে বসলে  কিতাবুদ্দিন ঘোষণা দেয়, সে আসলে ভাবছে দুটি অন্তত মাখরোর ছাগল নেবে পোষ্য হিসাবে। কিতাবুদ্দিন জানে তার স্ত্রীর গৃহপালিত কোনো প্রাণীর প্রতি অনাগ্রহ নেই তবুও কথাটা উঠাল। হাত-পাখা রেখে হুরমাতয়ারা কিতাবুদ্দিনের পিঠে কিছু একটা আঙুল দিয়ে ঘষে সরিয়ে দিল।

১৯৪৬ সালের সেই জুলাইয়ের শুক্রবার রাতে মুষল ধারায় বৃষ্টি নামে, সেই বৃষ্টির সঙ্গে ছিল ঝড়; রাত বাড়ার সঙ্গে ঝড়ও বেড়েছিল। এলাকার আশপাশের অনেক বাসাবাড়ির টিনের চালা উড়ে গিয়েছিল, গাছপালা ডাল ভেঙেছিল। কিতাবুদ্দিন ও হুরমাতয়ারা বাড়ির পেছনে বানরদের প্রিয় জামরুল গাছটিও উপড়ে যায়। জামরুল গাছ ভাঙার চেয়েও বড় কষ্ট ছিল বাগানের বানরেরা কোথায় বসবে যেহেতু এই গাছটিই অধিক প্রিয় ছিল তাদের। বানরেরা দূরের গাছে চলে যেতে থাকল। সেই বাস্তবতায় হুরমাতয়ারা বিষণœ হলো যদিও তখনো জানত না তার চেয়েও কিছু ঘটে গেছে, যা ছিল আরও বিষণœতার। তাদের জোড়া বানর মধুবতী ও মধুসোমকে ঝড়ের রাতের পরে আর দেখা যায় না। হতবুদ্ধ, বিমূঢ় হুরমাতারাকে কিছুটা সান্ত্বনা দিয়েছিল পার্বতী শেহজারার এই খবর দিয়ে যে ঝড়ের বিকেলে যখন বরিশালের সেই সাম্পান ছেড়ে নদীর মাঝে যায় তখন সে মাস্তুলের মাথায় ঝুলে থাকা জোড়া বানর দেখতে পেয়েছিল।

হুরমাতয়ারা সেই ঝড়ের রাতের সাঁঝের কালেই আর একটা পতরে (হুপ) সাদা কাপড় কষিয়ে প্রস্তুত রেখেছিল নিঃসঙ্গ মাস্তুলের কশিদা সূচিকর্ম করবে বলে। এই বিষণœ বাড়িতে কুতুবউদ্দিন আর মারখোর ছাগল নেয় না। হুরমাতয়ারা পিয়ালী একদিন কিতাবুদ্দিনের কাছে দাবি করে সে বরিশালে নিশীবাবু জমিদারের বাড়িতে যাবে। উত্তরে কিতাবুদ্দিন হা সূচক প্রতিশ্রুতি দেয়। তিন দিন পরে বুড়িগঙ্গার তীর এলাকায়ও খবর আসে কলকাতায় ইতিহাসের ভয়াবহ হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা হওয়ার। তা ওই শুক্রবারেই হয় যে শুক্রবারে কিতাবুদ্দিন ও হুরমতায়ারার বানর জোড়া বুড়িগঙ্গা ধরে সাম্পানের মাস্তুলে ঝুলে ভাটিতে দক্ষিণে ভেসে যায়। ৪৭-এর পর আহসান মঞ্জিলের পাচক মর্যাদার কিতাবুদ্দিন যে এক  হিন্দু নারীকে  বিয়ে করে তারা দুজন কেন কলকাতা চলে যায় তার কোনো ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারে না।

এরপর ওই জোড়া বানরের ‘সংসার-গল্প’ নানাভাবে  ছড়িয়ে পড়ে  ঢাকার সদরঘাট সংলগ্ন বুড়িগঙ্গার তীরে আহসান মঞ্জিলের কোনো এক পাচক নিঃসন্তান কিতাবুদ্দিন লুদি ও তার স্ত্রী হুরমাতয়ারা পিয়ালীর সন্তান সমতুল্য জোরা-বানর যথাক্রমে মধুমতী ও মধুসোম বরিশাল ফিরতি নিশি জমিদারের সাম্পানে চলে গিয়ে সেখানে ঘরসংসার শুরু করে। সিমসন রোড থেকে জনসন, গে-ারিয়া, নারিন্দা সর্বত্র অলি-গলিগুলোতে এই গল্প এমনভাবে ছড়ায় যে, পরবর্তী সময় আর বোঝা যায় না বরিশালের সে ‘সংসার’ কোনো মানুষের না বানরের।

এবং ওই ‘সংসার-গল্পের’ একটা সমাধান হয় তার প্রায় ৮০ বছর পরে যখন পুরনো ঢাকার সাধনা ঔষধালয় এলাকায় বহু বছরের লঙ্গরখানায়ও ঢাকার এই আদি অধিবাসীদের জন্য খাবার বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ক্ষুধায়, এবং কিছু বাসিন্দাদের অনাচার ও ব্যাবিচারে এই বানর জ্ঞাতি-গোষ্ঠী যখন বিলুপ্ত প্রায়; ঠিক তখন এলাকায় কোথা হতে এক ঝড়ের রাতের আগের সাঁঝের কালে এক-পাল বানর দল এসে বসবাস শুরু করে। যাদের দলনেতা দম্পতিদের নারিন্দায় হরিপদ কবিরাজের পরিত্যক্ত বাড়ির আমগাছের বাঁকা কাণ্ডে কি জীর্ণ ক্ষয়ে যাওয়া ইট-ভবনের কার্নিশে ক্লান্ত শুয়ে বসে থাকতে দেখা যেত। দেখতে বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা ক্লান্ত এই বানর জোড়াকে এলাকার লোকেরা কী কারণে মধুসোম ও মধুমতী নামে ডাকে তার সঠিক কোনো ইতিবৃত্ত জানা যায় না। এমন কথাও প্রচলিত হয়, বানর অগণতান্ত্রিক কোনো সমাজে স্বস্তিবোধ করে না বলে সেখানে তারা দ্রুত  ক্লান্ত ও বুড়ো হয়ে যায়। এবং একদা তথায় অগণতান্ত্রিক সমাজে ক্ষমতার বিবাদ বাধলে তাণ্ডবে এক অগণতন্ত্র হতে আর এক অগণতন্ত্রে পরিবর্তন হয়। তবে তা হাজার মানব লাশ ও দুটি বানর লাশের বিনিময়ে।

কথিত আছে তাণ্ডব ও প্রাণনাশ সময় কালের কোনো এক সকালে নারিন্দার লোকজন দেখতে পায় কালো কাপড়ে মুখ ঢাকা একদল ‘দুর্বৃত্ত’ এসে একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় ওই মধুসোম ও মধুবতীকে মোট তেরোটা গুলিতে হত্যা করে। জোড়া দম্পতি আম গাছের কাণ্ড কি জীর্ণ কার্নিশ হতে গড়িয়ে মাটিতে পড়ে।

এলাকার লোকজন জানে ও বিশ্বাস করে জোড়া বানরেরা মরেছে বলেই সম্ভব হয়েছে সবকিছু। কিন্তু মধুসোম ও মধুবতীকে আসলে কারা মেরেছে সে নিয়ে ভিন্নমত আছে। কেউ বলে ক্ষমতা-পক্ষ কেউ বলে ক্ষমতালাভী গুপ্তপক্ষ। এলাকার লোকজন কার্যত ‘গুপ্তপক্ষ’কে দায়ী করে সে দলেরই হোক। এবং গুঞ্জন এখনো আছে এই হত্যা হয়েছে বলেই যেমন পরিবর্তন হয়েছে তেমনই একদিন গণতন্ত্রও আসবে এবং সেদিন নারিন্দা-বাসীরা ওই আত্মদানের কথা ঘটা করে পালন করবে। এইটুকুই।

আর বাকি থেকে যায়  হুরমাতয়ারার পতরের বানর ও মাস্তুলের অসমাপ্ত সূচিকর্ম কাহিনি!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত