রাজধানী ঢাকার অদূরে অবস্থিত রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহরের নীলা মার্কেট ভোজনরসিকদের স্বর্গরাজ্য। বিশেষ করে, বালু নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই ‘ফুড স্ট্রিট’-এ সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমে উঠে হাঁসের মাংস আর চাপটির মহোৎসব। এখানকার হাঁসের মাংসের টানে যেমন ছুটে আসে সব বয়সী নারী-পুরুষ; বাদ যান না উপদেষ্টাসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বালু নদীর তীর, লেকপাড় ও খোলা আকাশের নিচে গড়ে ওঠা এ খাবারের জোনে রয়েছে প্রায় ২০০টির বেশি খাবারের দোকান ও রেস্টুরেন্ট। সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় কড়াইতে মাংস কষানোর উৎসব, আর পুরো এলাকা ভরে ওঠে ধোঁয়ার মাদকতা ও আলো-ঝলমলে সৌন্দর্যে। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে এমন আয়োজন। তাই ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে একটুখানি প্রশান্তির খোঁজে বালু নদীর তীরে পূর্বাচলের নীলা মার্কেটে ছুটে আসেন ভোজনরসিকরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ের পাশেই সেক্টর ১-এ বিশাল জায়গাজুড়ে অবস্থিত নীলা মার্কেটের খ্যাতি দেশজুড়ে। এছাড়াও কাছাকাছি সেক্টর ১১ ও ১২ এবং ময়েজউদ্দিন চত্বরেও রয়েছে অসংখ্য খাবারের দোকান।
ওই এলাকার প্রতিটি দোকানে আলাদা রেসিপিতে রান্না করা হয় দেশি পাতি হাঁসের ঝাল ঝাল ভুনা মাংস। সঙ্গে থাকে রুমালি রুটি, চালের রুটি বা বিশেষ চাপটি পিঠা। হাঁসের একটি প্লেটের দাম ৩০০ টাকা, যাতে থাকে ৫ পিস মাংস ও আনলিমিটেড ঝোল। গরুর মাংস ২৫০ টাকা, দেশি মুরগি ৩০০ এবং গরুর বট ২০০ টাকা প্লেট। চাপটি, আটার রুটি বা রুমালি রুটি ২০ টাকা, আর ডিম চাপটি ৪০ টাকা।
সেখানেই শুক্রবার বিকালে দেখা হয় উর্মী-আশিক দম্পতির সঙ্গে, রাজধানীর উত্তরা থেকে এসেছেন। নীলা মার্কেটের খাবারের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তারা বলেন, ‘মাটির চুলায় রান্না করা হাঁসের মাংস আর চাপটির স্বাদ মনে দাগ কেটে গেছে। শহরের ব্যস্ততা ছেড়ে শান্তির খোঁজে আমরা বারবার এখানে ছুটে আসি।’
শুধু উর্মী-আশিক নয় নীলা মার্কেটের হাঁসের মাংসের লোভনীয় স্বাদে দুর্বলতা রয়েছে উপদেষ্টাদের মধ্যেও। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এমন কথাই জানালেন।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমি মাঝেমধ্যে রাতে যখন কাজ শেষ হয়, কখনো ভোর হয়, সে সময় বাসায় খাওয়া-দাওয়া দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। তখন আমি বেশিরভাগ সময় ৩০০ ফিটের নীলা মার্কেটে যাই। সেখানে হাঁসের মাংস খুব ভালো পাওয়া যায়। ওখানে যাই ৪-৫ জন মিলে।’
স্থানীয় পিঠা ঘরের মালিক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিন বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত রান্না-বিক্রি চলে। শুক্রবারে তো লাইন লেগেই থাকে। সব দোকানেই রান্না হয় দর্শনার্থীদের সামনে।’
কুটির বাড়ি রেস্টুরেন্ট ও পিঠা ঘরের মালিক দোলা আক্তার বলেন, ‘দেশি পাতি হাঁসের গোস্ত এবং চাপটি আর পিঠার জন্য চাউলের গুঁড়িসহ সব কিছু রেডি করে পাকাতে দুপুর হয়ে যায়। আর তখন থেকেই শুরু হয় বেচাকেনা চলে গভীর রাত অবধি। দেশি পাতি হাঁসের মাংসের ভুনা ছাড়াও গরুর মাংস, দেশি মুরগি ভুনা, গরুর বটও পাওয়া যায় আমাদের দোকানেই। সেইসঙ্গে আরও পাওয়া যায় হরেক রকমের ভর্তা।’
রয়েছে সামুদ্রিক খাবারও
শুধু হাঁসের মাংসই নয়, এখানে আরও আছে সমুদ্রের স্বাদ। কোরাল, স্যামন, চিংড়ি, লবস্টার, কাঁকড়ার বারবিকিউ সরাসরি গ্রিল করে পরিবেশন করা হয় চোখের সামনেই। অনেকের মতে, রূপগঞ্জে বসেই যেন তারা উপভোগ করছেন উপকূলীয় খাবারের স্বাদ।
চা, পিঠা আর মিষ্টির বাহার
রসগোল্লা, বালিশ মিষ্টি, সন্দেশ, দধি, লেংচা সহ সব ধরনের মিষ্টি মিলছে এখানে। রয়েছে বাহারি পিঠাও। চা প্রিয়দের জন্য আছে ৫০ ও ৬০ টাকার তন্দুরি চা—যা এ এলাকার আরেক বিশেষ আকর্ষণ।
বিনোদনেও সমৃদ্ধ এই ভোজন কেন্দ্র
খাবারের পাশাপাশি এখানে সারা বছর ধরে চলে মেলা ও পারিবারিক বিনোদনের আয়োজন। এখানকার বছরজুড়ে চলা আনন্দ মেলা দর্শনার্থী টানতে বেশ ভূমিকা রাখছে, যেখানে রয়েছে মেলাকেন্দ্রিক বাহারি সব জিনিসপত্র। অন্য যেকোনো মেলার মতোই হরেক আইটেমের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। নাগরদোলা, ট্রেন, শিশুদের রাইডসহ নানা ধরনের আনন্দের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে পূর্বাচলের নীলা মার্কেটের পুরো এলাকা এখন এক স্থায়ী পারিবারিক ভ্রমণ কেন্দ্র এবং ভোজনরসিক ও বিনোদনপ্রেমীদের মিলনমেলার একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত
এই ফুড হাট প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ব্যবসা করে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বিশাল অবদান রাখছে। হচ্ছে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান। পর্যটন, খাদ্য সংস্কৃতি আর উদ্যোক্তা চেতনার মেলবন্ধনে রূপগঞ্জের এই নদী ও লেক পাড়ের নীলা মার্কেট এখন শুধু একটি স্থান নয়—এটি একটি অনুভব, একটি অভিজ্ঞতা।
রাজধানীর মালিবাগ থেকে হাঁসের মাংস আর চাপটি পিঠা খেতে এসেছেন শহীদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সময় পেলে প্রায়ই নীলা মার্কেটে আসি। এই হাঁসের মাংস আর চাপটির স্বাদ ভোলার মতো না। চারপাশের পরিবেশটাও মনোমুগ্ধকর।’
ডেমরা থেকে পরিবার নিয়ে আসা আকতার মিয়া বলেন, ‘এখানে যেমন রয়েছে বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট, তেমনি রয়েছে সাধারণ লোকের জন্য সাদামাটা খাবার ঘর। কিন্তু স্বাদে ভরপুর দোকানগুলোর সব খাবার। আমার বাচ্চারা এখানে এসে অনেক আনন্দ পায়। খাবার তো সুস্বাদু, তার ওপর মেলা ও বিনোদনের আয়োজন—সব মিলিয়ে চমৎকার সময় কাটে।’
ছুটির দিন হওয়ায় পুরো পরিবার নিয়ে হাঁসের মাংস খেতে এসেছেন সনিয়া আক্তার। তিনি জানালেন, ‘এই জায়গা এখন ভাইরাল। হাঁস খেতে হলে এখন সবাই জানে, নীলা মার্কেটেই যেতে হবে। বিশেষ করে চাপটি দিয়ে হাঁসের মাংস—অনবদ্য! খাবারও বেশ উপভোগ্য।’
পূর্বাচলের নীলা মার্কেট এখন শুধুই একটি খাবারের জায়গা নয়, এটি হয়ে উঠেছে এক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। ঢাকার পাশে এমন মনোরম ভোজন জগত রাজধানীবাসীর জন্যও এক অনন্য উপহার।
