একটি প্রতিষ্ঠান সেরা মানের এ কথার মূল বক্তব্যাই হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিতে সেরা মানের কর্মীরা কাজ করেন। তাই প্রতিষ্ঠানে ভালো কর্মী নিয়োগ দেওয়া এবং তাকে ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠানের মানব সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রতিনিয়ত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।
কর্মী চলে গেলে প্রতিষ্ঠানের কিছু যায় আসে না এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই ‘ভালো কর্মী’ চলে গেলে প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় ক্ষতি হতে পারে। প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের এই সিদ্ধান্তগুলো বিজ্ঞানসম্মতভাবে নেওয়া উচিত, আবেগবশত নয়। একজন কর্মী ভালো নাকি মন্দ সেটা বোঝারও খুব সহজ পদ্ধতি আছে। মানবসম্পদ বিভাগ কর্মীদের দক্ষতা মূল্যায়ন করার জন্য অ্যানুয়াল কনফিডেন্সিয়াল রিপোর্ট (এসিআর) বা বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে খুব সহজেই পরিমাপ করা যায় কোন কর্মীর চেয়ে কোন কর্মী ভালো বা মন্দ।
সপ্রণোদিত, প্রতিষ্ঠানের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ভালো কর্মী ধরে রাখার জন্য নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন। ভালো কর্মীকে মোটিভেটেড রাখার জন্য যেমন কৌশল প্রয়োগ করতে হয় তেমনি সুযোগ-সুবিধাও প্রদান করতে হয়। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের যথাযথ কর্তৃপক্ষ বা মালিক পক্ষের সঙ্গে সমঝোতাও করতে হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে যেমন একসঙ্গে সব সুবিধাও প্রয়োগ করা উচিত নয় আবার দীর্ঘ ব্যবধানও ঠিক নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, মুদ্রাস্ফীতি হয়, জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়, বাজারমূল্য বৃদ্ধি পায়, কর্মীর পারিবারিক খরচ বাড়ে। ঠিক এই উপাদানগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্মীর বেতন, ভাতা, অন্যান্য সুবিধা প্রদান করা উচিত।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানে কর্মীর মানসিক অবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় না। কম ক্ষেত্রেই কর্মীকে একবার নিয়োগ দেওয়ার পর মানবসম্পদ বিভাগ তার খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি খেয়াল রাখেন। ফলে নিভৃতে সবার অগোচরে কর্মী তার উৎসাহ হারাতে থাকেন এবং এক সময় ঝরে পড়েন।
কর্মীকে জিজ্ঞেস না করে কখনোই আপনি আসল অবস্থা জানতে পারবেন না। যদি জিজ্ঞেস করেন, কর্মী সবসময়ই ভালো আছি, কোনো সমস্যা নেই স্যার, এই জাতীয় ইতিবাচক উত্তরই দেবেন। মানবসম্পদ বিভাগ থেকে বলুন, আপনার দরজা সব সময় তার জন্য খোলা। কোনো সমস্যা হলেই যোগাযোগ করতে পারবেন। বলুন, আপনার নিজের অভিজ্ঞতার কথা। কীভাবে আপনি নিজের সমস্যার কথা মানবসম্পদ বিভাগের সঙ্গে শেয়ার করে উপকৃত হয়েছিলেন। বলুন, সমস্যা প্রাথমিক স্তরেই চিহ্নিত করা এবং সমাধান করা উচিত ইত্যাদি। মানবসম্পদ বিভাগ একসঙ্গে শাসক এবং বন্ধু হলে উপকৃত হতে সবাই।
মানবসম্পদ বিভাগকে ভালো কর্মী ধরে রাখতে বড় ভূমিকা পালন করতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করার মাধ্যমে। মাঝ বরাবর থেকে ওপর এবং নিচকে সামলানোই এই বিভাগের এক বিশাল টানাপড়েনের কাজ। যদিও খুব কম ক্ষেত্রেই মানবসম্পদ বিভাগ মালিক পক্ষকে ব্যবসায়িক সত্য বোঝাতে সক্ষম হয়। ফলে এ রকম পরিস্থিতিতে বড় বড় প্রতিষ্ঠানে বিভাগীয় প্রধানকে বড় বড় কর্মকর্তাদের হারাতে হয়। মানবসম্পদ বিভাগের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তখন করার কিছুই থাকে না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বা বসকে তার অধীনস্ত কর্মীর ক্যারিয়ার সংক্রান্ত দেখভালের দায়িত্ব নেওয়া উচিত। তাকে যথাযথ নির্দেশনা দেওয়া উচিত। মানবসম্পদ বিভাগের চেয়ে কর্মীর ইমিডিয়েট বস তার সবচেয়ে কাছে থাকেন ফলে কর্মীর দৈনন্দিন দেখাশোনার দায়িত্ব তার বস যাতে পালন করেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে যথাযথ কাউন্সেলিংয়ের চর্চা নেই। ভালো কর্মী ধরে রাখার মোক্ষম উপায় হলো কাউন্সেলিং। ইমিডিয়েট বস এবং মানবসম্পদ বিভাগ উভয়েই কাউন্সেলিং করতে পারে। ফলে কর্মীর মানসিক সত্তার দারুণ পরিচর্যা করা যেতে পারে।
কর্মীর সমস্যা যত দ্রুত চিহ্নিত করতে পারবেন তত দ্রুত তাকে ধরে রাখার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবেন। নিয়মিত ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানে মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ব্যাবস্থা করুন। কর্মীর ঝরে পড়ার হার কমে যাবে। প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ একটি অনেক বড় সমাধান যা অনেক সমস্যার ইতি ঘটাতে পারে।
