জাকসুর প্যানেল গোছাচ্ছেন প্রার্থীরা, বাড়ছে নিরাপত্তা শঙ্কা

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৩০ পিএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১১ সেপ্টেম্বর। জাকসুর নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হালনাগাদ ভোটার তালিকা ও চূড়ান্ত আচরণ বিধি প্রকাশ করেছে। শক্তিশালী প্যানেল গড়তে তৎপর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ছাত্রসংগঠনসহ অনান্য প্রার্থীরা। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা শুরু করেছেন প্রার্থীরা।

আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত ৩০০টাকা মূল্যের জাকসুর মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ৮৭ জন এবং মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ৪ জন প্রার্থী। এছাড়াও হল সংসদে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন ২৪১ জন প্রার্থী।

এরইমধ্যে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের সময় দুইদিন বাড়নোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। গত ১০ আগস্ট ঘোষিত জাকসুর তফসিল অনুযায়ী প্রার্থী কর্তৃক মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের সময় ছিল ১৮ ও ১৯ আগস্ট। প্রথম দিন জাকসুর বিভিন্ন পদে ৪৭ জন এবং হল সংসদের বিভিন্ন পদে ৮৬ জন প্রার্থী মনোনয়ন সংগ্রহ করেন। ওইদিন রাতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের সময় দুইদিন বাড়িয়ে ২১ আগস্ট পর্যন্ত করার সিন্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন।

এর আগে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমাদানের সময়সীমা দুইদিন বাড়ানোর দাবিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে স্মারকলিপি দেন শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। সময় বাড়ানোর দাবি জানান গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতাকর্মীরাও।

১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮ বার জাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ১৯৯২ সালে। ওই নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন মাসুদ হাসান তালুকদার এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) হন শামসুল তাবরীজ।

দীর্ঘ ৩২ পর শিক্ষার্থীদের জোরালো আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জাকসু নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

জাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে শক্তিশালী প্যানেল গড়তে তৎপরতা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। এককভাবে প্যানেল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ ও ছাত্রদল। গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখা শিক্ষার্থীসহ কোনো রাজনৈজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নেই এমন শিক্ষার্থীদের নিয়ে পূর্নাঙ্গ প্যানেল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসলামি ছাত্রশিবির।

অরাজনৈতিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে পূর্নাঙ্গ প্যানেল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলনের আহ্বায়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক আব্দুর রশিদ জিতু। এছাড়াও প্রগতিশীল শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত দুটি প্যানেল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । সমমনা রাজনৈতিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে জোট করে দুটি ভিন্ন ভিন্ন প্যানেলে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট।

একটি প্যানেলে থাকছে ছাত্র ইউনিয়নের একাংশ (জাহিদ-তানজিম), জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট (মেঘ), জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার (টিএসসি), গণ-অভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলনসহ কয়েকটি সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থী। অন্য প্যানেলে থাকতে পারে ছাত্র ইউনিয়ন অন্য অংশ (অদ্রি-অর্ক), জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট (ফাইজা), ছাত্র ফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী), বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীসহ কয়েকটি সমমনা সাংস্কৃতিক সংগঠন। তবে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তাদের সম্ভাব্য প্যানেল থেকে কারা শীর্ষ পদগুলোতে নির্বাচন করবেন তাদের নাম এখনও নিশ্চিত করতে পারেনি।

শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর বলেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এককভাবে প্যানেল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের জাবি শাখার সদস্য সচিব তৌহিদ সিয়াম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এককভাবে প্যানেল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। অন্য কোনো সংগঠন বা ব্যক্তির সঙ্গে জোট করব কিনা সেটা এখনও নিশ্চিত নই।

শাখা ছাত্রশিবিরের অফিস ও প্রচার সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নেই এমন কিছু শিক্ষার্থীদের আগ্রহের ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে নিয়ে প্যানেল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া অন্য একটি সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে তাদের সঙ্গে জোট করছি কিনা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।

ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের একাংশের সভাপতি অদ্রি অংকুর বলেন, আমরা এতদিন যাবৎ একসাথে যেসকল সংগঠন, নির্দলীয় আন্দোলন কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের সঙ্গে আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি তাদের সবাইকে নিয়েই আমরা একটা প্যানেল ঘোষণা করবো। ভিপি ও জিএস পদে কারা নির্বাচন করবেন এই ব্যাপারে এখনও আলাপ আলোচনা চলছে। খুব শীঘ্রই হয়ত আমরা আমাদের সম্পূর্ণ প্যানেলের ঘোষণা দিতে পারব।

জাকসু নির্বাচনের আমেজের সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে নিরাপত্তা শঙ্কাও। আবাসিক হলগুলোতে এখনও আসন দখল করে রেখেছেন শিক্ষাজীবন শেষ হওয়া (অছাত্র) শিক্ষার্থীরা। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রবেশ করছেন বহিরাগতরা। এছাড়াও শাখা ছাত্রদলের দুই গ্রুপের দ্বন্দে বিভিন্ন সময়ে হাতাহাতি ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। ১৭টি আবাসিক হল ও শাখা কমিটি বর্ধিত করার পর নবগঠিত কমিটিতে বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ মিছিল ও শোডাউন দিচ্ছে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের একটি অংশ।

সর্বশেষ গত রবিবার কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছিরসহ কয়েকজন নেতার ক্যাম্পাসে আগমণ উপলক্ষে শাখা কমিটির শীর্ষ পাঁচ নেতাসহ তাদের অনুসারিদের সঙ্গে হাতাহাতি ও বাকবিতন্ডায় জড়ান বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা।

এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন শিক্ষার্থীরা।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে প্রশাসনিক বডি। গত ১৬ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত ছাত্র ও ছাত্রীদের ২১টি হলের মধ্যে ৩টি ছাত্র হলে অছাত্রদের বের করার জন্য অভিযান চালানো হয়েছে।

তবে হলগুলো থেকে এখন পর্যন্ত কত জন অছাত্রকে বের করা হয়েছে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক আবেদা সুলতানা।

ছাত্র ইউনিয়ন জাবি সংসদের একাংশের সাধারণ সম্পাদক তানজিম আহমেদ বলেন, জাকসুর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ভোট গ্রহণ হবে হলগুলোতে। কিন্তু প্রশাসন এখনও হলগুলো থেকে সাবেক শিক্ষার্থীদের বের করার ব্যপারে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে হলগুলো তথা ভোটকেন্দ্রগুলোতে কোন সমস্যার সৃষ্টি যে হবে না, এই নিশ্চয়তা কে দিবে?

এছাড়াও, ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরিণ কারণে ক্যাম্পাসে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। প্রশাসন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার কাজে সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হয়েছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এম মাহফুজুর রহমান বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। হলগুলোতে সাবেক শিক্ষার্থীদের বের করার জন্য অভিযান চালাচ্ছি। জাকসুর সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতের লক্ষ্যে আগামী ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ক্যাম্পাসে সব ধরনের অনুষ্ঠান, সভা সমাবেশ, কর্মসূচি ও ২৫ জনের অধিক জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত