সিরাজগঞ্জে ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব হাসপাতালে ৩ শতাধিক রোগী

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৫৬ এএম

সিরাজগঞ্জ পৌরশহরের ধানবান্ধি মহল্লায় হঠাৎ ডায়রিয়া রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত ১০ দিনে তিন শতাধিক ব্যক্তি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। তাদের কেউ পাশের বেসরকারি নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল হাসপাতাল অথবা সিরাজগঞ্জ জেলারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। অনেকে আবার বাড়িতে থেকেও চিকিৎসা নিচ্ছে।

এদিকে মহামারী আকারে ডায়রিয়া রোগের প্রাদুর্ভাবের কারণ হিসেবে রোগী ও তাদের স্বজনরা পৌরসভার সাপ্লাই পানিকে দূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন। অন্যদিকে ঘনবসতিপূর্ণ ধানবান্ধি মহল্লাবাসীদের দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে দায়ী করেছেন সিরাজগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন। এ ব্যাপারে ঢাকার রোগতত্ত্ব বিভাগের লোকজন মোবাইল ফোনে সিরাজগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে ঘন ঘন খোঁজখবর নিচ্ছেন। তবে গত বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার জন্য তারা মাঠপর্যায়ে আসেননি। নমুনা সংগ্রহে রোগতত্ত্ব বিভাগের লোকজন না এলেও এদিন বিকেলে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের মাঠকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করতে দেখা গেছে।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ধানবান্ধি মহল্লায় সরেজমিনে গিয়ে কথা হয়, কামারখন্দ সরকারি কোরপ আলী ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোকতেল হোসেন, সাবেক কাউন্সিলর আব্দুস সাত্তার ও শিক্ষক সাইফুল ইসলামের সঙ্গে। তারা জানান, গত তিন দিন ধরে তাদের মহল্লার দুই শতাধিক ব্যক্তি হঠাৎ ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে। এতে বাকিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। রোগাক্রান্ত হয়ে পাশের বেসরকারি নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল হাসপাতাল ও সিরাজগঞ্জ জেলারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে অনেকে। তারা ডায়রিয়া রোগের প্রাদুর্ভাবের নেপথ্যে পৌরসভার সাপ্লাইয়ের পানিকেই দায়ী করেছেন।

বেসরকারি নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি রোগী আলামিন হোসেন বলেন, ‘আমি ও মা-বাবা পৌরসভার সাপ্লাই পানি ব্যবহার করি। তিনজনই গতকাল ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছি।’

সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আকিকুন নাহার বলেন, ‘ধানবান্ধি ও হোসেনপুর মহল্লা থেকে গত কয়েক দিনে বেশ কয়েকজন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে এসে ভর্তি হয়েছে। তাদের উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সিরাজগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগও এ বিষয়ে অবগত হয়েছে। দূষিত সাপ্লাই পানি ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে তারা হয়তো আক্রান্ত হতে পারে।’ 

সিরাজগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স সোমা রানী ঘোষ বলেন, ‘গত ১০ দিনে হাসপাতালে ১৭৭ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই জেলা শহরের ধানবান্ধি মহল্লার বাসিন্দা। গত বৃহস্পতিবার  মহল্লার ২১ জন নারী-পুরুষ ভর্তি হয়েছে। সাধারণত একসঙ্গে এত ডায়রিয়া রোগী দেখা যায় না। প্রতিদিন গড়ে চার-পাঁচজন করে রোগী ভর্তি হয়। হঠাৎ রোগীর ভর্তির কারণে হাসপাতালেও আমাদের চাপ বেড়েছে।’

সিরাজগঞ্জ ধানবান্ধি মহল্লার ভেতরে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি নর্থ বেঙ্গল জেনারেল হাসপাতাল। এ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘গত ১৫ দিনে ১২২ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ১৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। ৫০ জন ডায়রিয়ার রোগী চিকিৎসা নিয়েই সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি চলে গেছে। বাকি ৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। ডায়রিয়া রোগীদের বেশিরভাগই ধানবান্ধি মহল্লার। এলাকায় পৌরসভার সাপ্লাই পানি থেকে তাদের ডায়রিয়া রোগের উৎপত্তি বলে আমাদের তাৎক্ষণিকভাবে জানিয়েছে রোগীরা।’

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজনকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’

সিরাজগঞ্জ পৌরসভার প্রাশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) গণপতি রায় বলেন, ‘পৌরসভার সাপ্লাই পানি পরীক্ষা করে দূষণ খুঁজে পাওয়া যায়নি।’

সিরাজগঞ্জ জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোকন উজ্জামান বলেন, ‘পৌরসভার সাপ্লাই পানি পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। পানিতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া নেই। তবে, স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণেও ধানবান্ধি মহল্লাবাসী ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে।’ 

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শারমীন খোন্দকার বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে ধানবান্ধি মহল্লায় তিন দিনে ৯০ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পেয়েছি। তারা প্রাথমিকভাবে পৌরসভার সাপ্লাই পানিকেই দায়ী করেছে। স্বাস্থ্য বিভাগও ঘিঞ্জি ওই এলাকার পরিবেশ ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে কারণ হিসেবে দেখছে।’

সিরাজগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমীন বলেন, ‘কারণ অনুসন্ধানে ঢাকার রোগতত্ত্ব গবেষণা ইনস্টিটিউটের লোকজনকে খবর দেওয়া হয়েছে। তারাও ঘন ঘন যোগাযোগ করছেন। আক্রান্ত এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করছেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত