সমুদ্রে ১০ ফুট পুরু বরফ কাটতে সক্ষম ‘উরাল’

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৫, ০৭:৩২ এএম

১৯১২ সালে বরফখণ্ডের আঘাতে ডুবে যায় বিখ্যাত জাহাজ টাইটানিক। এরপর এ ধরনের দুর্ঘটনা আর না ঘটলেও শীতকালে বরফে ঢাকা সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল বেশ চ্যালেঞ্জিং। বিভিন্ন দেশে ডিজেলচালিত আইসব্রেকার বরফ ভেঙে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখে, তবে রাশিয়া একমাত্র দেশ যেখানে পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকার রয়েছে। বর্তমানে দেশটির আটটি পারমাণবিক আইসব্রেকার সমুদ্রে ১০ ফুট পর্যন্ত পুরু বরফ ভেঙে জাহাজের পথ সুগম করে। এ ছাড়া আরও চারটি অত্যাধুনিক আইসব্রেকার নির্মাণাধীন, যা ১৪ ফুট পুরু বরফ ভাঙতে সক্ষম হবে। এগুলো শিগগিরই রাশিয়ার আইসব্রেকার বহরে যুক্ত হবে।

পারমাণবিক আইসব্রেকার বহর : আর্কটিক মহাসাগরের বেশিরভাগ সময় বরফে ঢাকা থাকা সমুদ্রপথে নিরাপদ নৌযাত্রা নিশ্চিত করতে আইসব্রেকার অপরিহার্য। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান রসাটমের শাখা অ্যাটমফ্লট এই বহর পরিচালনা করে।

২০১৮ সাল থেকে রসাটম উত্তর সমুদ্র পথের (এনএসআর) অবকাঠামো পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে। তারা নৌযাত্রার সংগঠন, অবকাঠামো নির্মাণ, নৌ-নেভিগেশন, হাইড্রোগ্রাফিক সহায়তা এবং আর্কটিকের চরম পরিবেশে সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

মুরমান্সকে আইসব্রেকার পরিদর্শন

রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরে পাহাড়, সমুদ্র ও জঙ্গলে ঘেরা মুরমান্সক শহরে রয়েছে ঐতিহাসিক সমুদ্রবন্দর। সম্প্রতি এখানে গিয়ে দেখা যায়, বন্দরের কাছে সারিবদ্ধভাবে নোঙর করা পারমাণবিক আইসব্রেকার। পাশেই রয়েছে এসব জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের বিশাল কারখানা এবং পারমাণবিক বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা। কঠোর নিরাপত্তা মেনে এই বর্জ্য সংরক্ষণ করা হয়, যাতে তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে না পড়ে। রসাটম ও অ্যাটমফ্লটের কর্মকর্তারা দুটি আইসব্রেকার পরিদর্শন করান। এর একটি ‘৫০ লেদ পবিদি’, যাতে বাংলাদেশসহ ২১ দেশের ৬৬ জন স্কুলছাত্র উত্তর মেরু ভ্রমণে গেছে। এই রোমাঞ্চকর অভিযানে শিক্ষার্থীরা আর্কটিকের নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পারমাণবিক আইসব্রেকার ও পরমাণু শক্তির বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছে। অপর আইসব্রেকার ‘উরাল’ অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী, যা বরফাচ্ছন্ন সমুদ্রপথে চলাচলের জন্য নির্মিত। এটি মানব প্রকৌশল ও সামুদ্রিক উদ্ভাবনের এক অনন্য নিদর্শন। ‘উরাল’ আর্কটিক অন্বেষণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মেরু অঞ্চলে নিরাপদ নৌযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই বিশাল আইসব্রেকারগুলোর ভেতরে রয়েছে ছোট আকারের ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি এড়াতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থাসহ জাহাজের নিচে পারমাণবিক রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়। ইউরেনিয়ামের ফিশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ বাষ্পে রূপান্তরিত হয়, যা টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই বিদ্যুৎ দিয়ে জাহাজের সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও নিরাপত্তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, বলেন অ্যাটমফ্লটের কর্মকর্তারা। জাহাজে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য রয়েছে সুসজ্জিত কক্ষ। অসুস্থতার জন্য ছোট ক্লিনিক রয়েছে, যেখানে জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় জাহাজে থাকার ক্লান্তি দূর করতে রয়েছে খেলার মাঠ, বিনোদনের জন্য টেলিভিশন, বাদ্যযন্ত্র, ব্যায়ামাগার, অফিস, মিটিং রুম, ক্যানটিনসহ নানা সুবিধা। এ যেন একটি ভাসমান ছোট শহর।

আইসব্রেকার কীভাবে কাজ করে

পারমাণবিক শক্তিচালিত এই জাহাজগুলো সমুদ্রের বরফ ভাঙতে ব্যবহৃত হয়। জাহাজের সামনের অংশ মোটা, শক্তিশালী ও বাঁকা। বরফের দিকে এগোলে জাহাজের নাক বরফের ওপর ওঠে, ওজনের চাপে বরফ ভেঙে যায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ ইলেকট্রিক মোটর ও প্রপেলার চালায়, যা জাহাজকে বরফের মধ্যে ঠেলে দেয়। প্রপেলারের স্রোত বরফের নিচের পানি সরিয়ে বরফ টুকরো করে।

ওজন, গতি ও বরফ ভাঙার সক্ষমতা

আইসব্রেকারের ওজন ৩০ হাজার থেকে ৭০ হাজার টন। বরফমুক্ত সমুদ্রে এগুলো ঘণ্টায় ১৮-২২ নটিক্যাল মাইল (৩৩-৪০ কিমি) গতিতে চলে, তবে বরফ ভাঙার সময় গতি ১-৩ নটিক্যাল মাইলে নামিয়ে আনা হয়। এগুলো ২-৩ মিটার (১০ ফুট) পুরু বরফ ভাঙতে পারে। নির্মাণাধীন ‘রসিয়া’ আইসব্রেকারের ওজন ৭০ হাজার টন, যা ৪ মিটার পুরু বরফ ভাঙতে পারবে এবং ৫০ মিটার প্রশস্ত নৌপথ তৈরি করবে। স্বাভাবিক পানিতে এর গতি ২৪ নটিক্যাল মাইল (৪৫ কিমি)।

ডিজেল বনাম পারমাণবিক আইসব্রেকার

পারমাণবিক আইসব্রেকারের ইঞ্জিন ডিজেলের তুলনায় বেশি শক্তিশালী, পুরু বরফ ভাঙতে সক্ষম। এগুলো দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারে, বাণিজ্যিক কার্যক্রমে সুবিধা দেয়। ডিজেল আইসব্রেকার পরিবেশ দূষণ করলেও পারমাণবিক আইসব্রেকার পরিবেশবান্ধব।

রাশিয়ার বর্তমান ও নির্মাণাধীন আইসব্রেকার

রাশিয়ার বহরে বর্তমানে আটটি আইসব্রেকার রয়েছে, যার মধ্যে ‘প্রজেক্ট ২২২২০’ সিরিজের চারটি আর্কটিকা, শিবির, উরাল, ইয়াকুটিয়া এবং পুরনো আর্কটিকা শ্রেণির চারটি ৫০ লেদ পবিদি, ভাইগাচ, ইয়ামাল, তাইমির। এ ছাড়া চারটি অত্যাধুনিক জাহাজ নির্মাণাধীন, যার মধ্যে ‘রসিয়া’ ১৪ ফুট পুরু বরফ ভাঙতে সক্ষম।

আইসব্রেকার বহর সম্প্রসারণ

উত্তর সমুদ্রপথ ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে দ্রুততম বাণিজ্যিক পথ হয়ে উঠছে। প্রতিবছর এই পথে কোটি কোটি টন কার্গো পরিবহন হয়। রাশিয়া এই পথে বাণিজ্য সম্প্রসারণে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে, আইসব্রেকার বহরের সংখ্যা ও আধুনিকতা বাড়াতে চায়। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে ও চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে মস্কো এই উদ্যোগ নিয়েছে। আর্কটিকে ৪১২ বিলিয়ন ব্যারেল তেল-গ্যাসের মজুদ রয়েছে, যা বিশ্বের অনাবিষ্কৃত মজুদের ২২ শতাংশ। মুরমান্সক থেকে বেরিং প্রণালি পর্যন্ত এই পথ নিয়মিত করতে রাশিয়া কাজ করছে। রসাটমের কর্মকর্তারা বলেন, ভবিষ্যতে কার্গো পরিবহন শত শত মিলিয়ন টনে পৌঁছাতে পারে, যার জন্য ১৫-১৭টি আইসব্রেকার প্রয়োজন। তবে শুধু আইসব্রেকার নয়, পর্যাপ্ত কার্গো জাহাজ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও প্রয়োজন। রাশিয়া চীন ও ভারতের সঙ্গে কাজ করছে এবং আর্কটিকে পর্যটন ও গবেষণার সুযোগ বাড়াচ্ছে।

উত্তর সমুদ্রপথ ইউরেশিয়া ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত নৌপথ। এর ইতিহাস শুরু হয় একাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পোমরদের নৌযাত্রার মাধ্যমে। ১৫২৫ সালে রুশ কূটনীতিক দিমিত্রি গেরাসিমভ এই পথের ব্যবহারের ধারণা দেন। এই পথের দৈর্ঘ্য ৫ হাজার ৬০০ কিলোমিটার, যা কারা, লাপতেভ, পূর্ব সাইবেরিয়ান ও চুকচি সাগর অতিক্রম করে। গত বছর এই পথে ৩৭ দশমিক ৯ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহনের রেকর্ড হয়েছে, সঙ্গে ৯২টি ট্রানজিট ভ্রমণ ও ৩ মিলিয়ন টন ট্রানজিট পণ্য পরিবহনের নজির স্থাপিত হয়েছে। মুরমান্সক রাশিয়ার শীর্ষ দশ বাণিজ্যিক বন্দরের একটি, যা কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত