‘দরিদ্রতা’ শব্দটি যতটা অনুশোচনাদায়ক তা দূর করতে বিশ্ব নেতাদের প্রচেষ্টা ততটা আশানুরূপ নয়। দারিদ্র্য বা দরিদ্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পায়। সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়তে থাকে। একটি ভারসাম্যহীন সমাজব্যবস্থার দিকে ধাবিত হয় দেশ। করোনা মহামারীর আগে দেশের দরিদ্রতা পরিস্থিতির ক্রমোন্নতি ঘটলেও, এরপর থেকে যেন কোনোভাবেই পরিস্থিতি একেবারে অনুকূল পর্যায়ে নেওয়া যাচ্ছে না। এর পেছনে আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তা গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে। করোনার পরপরই রাশিয়া ইউক্রনের যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর থেকে যেন যুদ্ধ পৃথিবীতে স্থায়ী আবাস গড়েছে। ইসরায়েল-ইরান, ইসরালের ফিলিস্তিনে আগ্রাসন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং এখন ভোগাচ্ছে ট্রাম্পের শুল্কনীতি। মোট কথা, একটি ওলটপালট পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে বিশ্ব এগিয়ে চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই গ্লোবাল ভিলেজের অংশ হওয়াতে, আমাদের দেশও এর বাইরে থাকছে না। কারণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা আমদানিনির্ভর। তা ছাড়া নানা কারণে অভ্যন্তরীণ সমস্যা সামাল দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন স্থিতিশীল পরিস্থিতি। এর ভেতরে স্বস্তির খবর হলো, দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু দরিদ্রতা পরিস্থিতির এখনো কাক্সিক্ষত উন্নতি সাধন করা যায়নি। কারণ কোনো একটি নির্দিষ্ট নয়। দেশে বিগত তিন বছরে দারিদ্র্য বেড়েছে। প্রতি চারজনের একজন এখন গরিব। আরও অনেক মানুষ এমন আর্থিক অবস্থায় রয়েছেন যে, অসুস্থতা বা অন্য কোনো সংকটে তারা গরিব হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। দারিদ্র্যের এ হিসাব উঠে এসেছে, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় করা ‘ইকোনমিক ডায়ানামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেভেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়, গত মে মাসে এসে দেশের দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশে, যা ২০২২ সালে সরকারি হিসাবে (পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপ) ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
পিপিআরসির তথ্যমতে, দরিদ্রের বাইরে এখন দেশের ১৮ শতাংশ পরিবার হঠাৎ দুর্যোগে যেকোনো সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তিন বছরে অতি বা চরম দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। ২০২২ সালের অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে। বিবিএসের জনশুমারি অনুসারে, ২০২২ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। তখন পরিবারের সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ১০ লাখ। জনসংখ্যার ওই হিসাবটি বিবেচনায় আনলে দেশে এখন কমপক্ষে পৌনে পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন। তিন বছরে জনসংখ্যাও বেড়েছে। আর বছরের শুরুতেই বাংলাদেশে এ বছর আরও ৩০ লাখ মানুষ ‘অতিদরিদ্র’ হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হবে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। আমরা দারিদ্র্যকে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। দরিদ্রতা দেশের বহুবিধ সমস্যার কারণ। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরে শ্রমবাজারের দুর্বল অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের প্রকৃত আয় কমতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকা-ের শ্লথগতির কারণে ঝুঁকিতে থাকা দরিদ্র মানুষের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে। এতে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে বলে বিশ্বব্যাংক মনে করে। অর্থনীতিতে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করে দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব। মূলত এই দুটি একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত এবং প্রভাবিত বিষয়। অর্থাৎ যখন দেশে দরিদ্র বৃদ্ধি পায় তখন কর্মহীনতাও বৃদ্ধি পায়। দরিদ্রতা অর্থনীতির সূচককে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশে দরিদ্রতার হার বৃদ্ধি পাওয়া অবশ্যই অর্থনীতির জন্য দুঃসংবাদ। কর্মক্ষম মানুষ যখন কর্মহীন অবস্থায় থাকে তখন সেই দেশের অর্থনীতি এগিয়ে নেওয়াটা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের হয়। সেই ধাক্কা সামলানোও বেশ কঠিন। দরিদ্রতা দূরীকরণে বহু ব্যক্তি নতুন নতুন মতবাদ দিয়েছেন, মডেল দিয়েছেন এবং প্রয়োগ করেছেন। প্রতিটি দেশের প্রধান এবং প্রথম চ্যালেঞ্জ থাকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণ। এই দুটি ক্ষেত্রে উন্নতি করার পর অন্যান্য ক্ষেত্রে উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ক্রমোন্নতির দিকে ধাবমান। উন্নয়নের প্রতিটি সূচকেই এ উন্নতি দৃশ্যনীয়। ক্ষুধা ও দরিদ্রতা দূরীকরণ ছিল বাংলাদেশের প্রধানতম লক্ষ্য। এ দেশে কোনো মানুষ দরিদ্র থাকবে না, কেউ না খেয়ে ঘুমাতে যাবে না। তবে সেই লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ এখনো অনেক দূরে। বেকারত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশে দারিদ্র্যের সমস্যাও বেড়ে চলেছে। বিশেষত শিক্ষিত বেকারত্ব বৃদ্ধি আশঙ্কার কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ হিসাবে, ২০২৪ সাল শেষে দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। ২০২৩ সালে এই সংখ্যা সাড়ে ২৫ লাখ। গত বছর বেকারের হার ছিল ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। বেকারত্বের সংজ্ঞায় ছদ্ম বেকারত্ব নামে এক ধরনের বেকারত্ব রয়েছে। সেই সংখ্যা কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই অনেক বেশি। ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, এমন নিষ্ক্রিয় তরুণ-তরুণী আছেন ৯৬ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীর সংখ্যা প্রায় ৪১ লাখ। একটি সময় পর এসব মানুষ কর্মহীন থাকছে। বছরের একটি সময় জুড়ে এই সংখ্যা মূল বেকারের সঙ্গে যোগ হচ্ছে এবং তখন সংখ্যাটা যাচ্ছে কয়েকগুণ বেড়ে। বেকারত্ব না কমাতে পারলে দেশের অর্থনীতিও সুষ্ঠু গতিতে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। বেকারত্ব সমস্যা স্বাভাবিক সময়েই অধিকাংশ দেশের জন্যই মাথাব্যথার কারণ। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রায় বেকার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়। দারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। চাকরির বাজারে যুক্ত হচ্ছে কয়েক লাখ নতুন মুখ। কিন্তু সে অনুপাতে বাড়ছে না কর্মসংস্থানের সংখ্যা। একটি অভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। দরিদ্রতা মানুষের এমন এক অবস্থা যে, তা থেকে মুক্তি পেতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন এবং সেই সঙ্গে পর্যাপ্ত সুযোগ দরকার। প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাটাও সময়সাধ্য। বাংলাদেশের প্রধান সম্পদের মধ্যে রয়েছে জনশক্তি। প্রবাসী আয়ে গত কয়েক মাসে রেকর্ড হয়েছে। প্রচুর পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে আসছে। এটা ইতিবাচক। কিন্তু নির্ভরতা ঠিক নয়। অর্থনীতিতে একক নির্ভরতা ভোগাতে পারে। যদি কোনো কারণে বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি ধাক্কা খায়, তাহলে বিভিন্ন খাত সমস্যায় পড়তে পারে। তবে জনশক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জনশক্তি শুধু বিদেশেই পাঠাতে হবে এমন নয়। দেশেও যদি কাজে লাগানো যায়, তাহলেও অর্থনীতিতে শুভ ফল বয়ে আনতে পারে। এক্ষেত্রে চীন বড় একটি উদাহরণ। বিশাল জনশক্তি নিয়েও চীন আজ অর্থনীতি ও সামরিকসহ সব দিক থেকে উন্নত দেশ। চীন তার জনশক্তিকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পেরেছে। আমরা পারছি না।
দক্ষ জনসম্পদ গড়ে তোলা সহজ নয়। আবার ভারতও তার জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে। জনশক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার করার জন্য জনগণকে দক্ষ করে গড়ে তোলা আবশ্যক। জনগণকে সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রযুক্তি এবং কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। শিক্ষিত বেকারদের অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। ফ্রিল্যান্সিং করেও আজ দেশের বহু যুবক-যুবতি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এভাবে চাকরির আশায় না ঘুরে, তাদের যদি স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলা যায়, তাহলে দেশের অর্থনীতির অগ্রগতি আরও ত্বরান্বিত হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি অবশ্যই সম্ভাবনাময়। বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমাগতভাবে শক্তিশালী হয়েছে। তবে প্রযুক্তি খাতে আরও বেশি মনোনিবেশ করতে হবে। কারণ বিশ্ব এখন প্রযুক্তির দিকে ধাবমান। ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য একটি দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। উন্নয়নের লাগাম টেনে ধরে এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে দরিদ্রতা বৃদ্ধি অথবা অগ্রগতি না হওয়া, দেশের জন্য অবশ্যই ভাবার বিষয়। এখান থেকে যেকোনো উপায়ে বের হতে হবে। ভেবে দেখতে হবে, চাকরি পেতে আমরা যে শিক্ষার ওপর নির্ভর করছি সেই শিক্ষা চাকরি দিতে বা কর্মসংস্থান গড়ে দিতে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে। প্রচলিত শিক্ষা যদি দক্ষ জনসম্পদ তৈরিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিবর্তন করতে হবে। সেক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষার প্রসারে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রতি মানুষকে কাজ করাতে হবে। একজনও যেন অলস বা বেকার না থাকে। কাজের ভেদাভেদ তুলে দিতে হবে সমাজ থেকে। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। এর পেছনের কারণগুলো সমাধান করা তাই জরুরি। ২০১৫ সালে এন এজেন্ডা ফর দ্য গ্লোবাল ফুড সিস্টেম শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এশিয়া বা আফ্রিকাসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়ার এ পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে গোটা বিশ্ব থেকে দারিদ্র্য দূর করার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। আরও উল্লেখ করা হয়, বিশ্বে প্রতি রাতে কমপক্ষে ৮০ কোটি মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়। বিভিন্ন দেশ এ থেকে উত্তরণের জন্য একটি ভালো খাদ্য ব্যবস্থা গড়তে গ্রামাঞ্চলে উন্নত কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নিয়ে যে শুধু আমাদের মতো উন্নয়নশীল বা দরিদ্র দেশগুলোই চিন্তিত বিষয়টা এমন নয়। অনেক উন্নত দেশেই ক্ষুধা এবং পুষ্টি বিষয়টি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। মাথাপিছু আয় দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের চিত্র নির্দেশ করে। প্রকৃত উন্নয়ন তখন সম্ভব হবে, যখন আমরা দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমাতে সক্ষম হবো। এর লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হবো। এটা একটা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। আমাদের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। দরিদ্রতা দূরীকরণে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী গড়তে সারা বিশ্বের সামনে নিজের উন্নয়ন একটি মডেল। উন্নত দেশ গড়ার লক্ষ্যে আমরা এগিয়ে চলেছি। তবে এসডিজি অর্জন করতে হলে অবশ্যই দরিদ্রতার হার একেবারে কমিয়ে আনতে হবে। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়া বড় চ্যালেঞ্জ। যেভাবেই হোক, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
