ছেলেকে মুক্ত করতে আদালত চত্বরে ভিক্ষা মায়ের

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৭:৩২ এএম

আদালত চত্বরে ছেলেকে মুক্ত করতে ভিক্ষা করছেন এক মা। কিন্তু কী অপরাধ তার ছেলের। মা অপত্য মমতার। কিন্তু ছেলে তো অপরাধী? কিন্তু কতটা অপরাধী হয়? বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ভুতেরদিয়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারের এক অসহায় মায়ের এই চিত্র সম্প্রতি সবার নজরে এসেছে। মামাতো-ফুফাতো ভাইবোনের প্রেমের ঘটনায় দায়ের হওয়া অপহরণ মামলায় তার ছেলেকে জেলে পাঠানো হয়েছে। আর  ছেলেকে বের করতে আদালত চত্বরসহ মসজিদ-মাদ্রাসার সামনে ভিক্ষা করছেন।

ঘটনার শুরু কয়েক মাস আগে। কিশোরী প্রেমিকা ও যুবক প্রেমিক, যারা মামাতো-ফুফাতো ভাইবোন, প্রেমের টানে পালিয়ে যায়। পরে মেয়ের মা বাদী হয়ে বাবুগঞ্জ থানায় একটি অপহরণ মামলা করেন। পুলিশ তাদের বরিশাল নগরীর পলাশপুর এলাকা থেকে উদ্ধার করে। মেয়েকে মায়ের জিম্মায় এবং ছেলেকে আদালতে পাঠানো হয়। আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মফিজুর রহমান জানান, চলতি বছরের ২৩ জুন আছিয়া বেগম বাদী হয়ে মাজাহারুল ইসলাম (২১) এর বিরুদ্ধে মামলা করেন। তদন্তে দেখা যায়, মেয়েটি আসামির সঙ্গে পলাশপুরে অবস্থান করছিল। তবে তদন্ত কর্মকর্তা স্বীকার করেন, ঘটনাটি প্রেমঘটিত পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

বাদী আছিয়া বেগম অভিযোগ করেন, তিনি বড় মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে গেলে সুযোগ বুঝে আসামি তার মেয়েকে তুলে নিয়ে যায়। পরে মেয়ে উদ্ধার হলে সে জানায়, তাকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে প্রতারণার মাধ্যমে অপহরণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে আসামির মা মাহিনুর বেগম ভিন্ন মত প্রকাশ করে বলেন, তার ছেলে ও ওই কিশোরীর মধ্যে পারস্পরিক প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি ছেলের ব্যবহৃত মোবাইলে থাকা তথ্যের কথা উল্লেখ করেন, যদিও সেটি পুলিশ নষ্ট করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। মাহিনুর বেগমের স্বামী বহু বছর আগে পরিবার ছেড়ে চলে যান। অল্প আয়ে সংসার চালাতে তিনি একসময় অন্যের বাসায় কাজ করতেন। বয়স ও অসুস্থতার কারণে আর কাজ করতে পারেন না। ছেলে হেলপারের কাজ করে সংসার চালাত। এখন ছেলে জেলে থাকায় তিনি আদালত চত্বরে ভিক্ষা করছেন। তার অভিযোগ, ‘ওকিলগো কাছে গেলে আমার ভিক্ষা করা ২০০-৫০০ টাকা নিয়ে যায়, কিন্তু ছেলে মুক্ত হয় না। এখন নতুন এক ওকিল পেয়েছি, উনি টাকা চাননি।’

কিশোরী ভিকটিম জানায়, মীরগঞ্জে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে তাকে আসামি বের করে নিয়ে যায়। তবে ৯ দিন একসঙ্গে থাকার সময় কোনো নির্যাতনের শিকার হননি বলে সে আদালতে জানায়। বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায়ও সে একই কথা জানায়।

পলাশপুরে যেখানে তারা অবস্থান করছিলেন, সেই বাড়ির মালিক ময়না বলেন, মেয়েটিকে দেখে তার মনে হয়নি সে অপহৃত। ‘সে একদম মুক্তভাবে ছিল, চাইলে চলে যেতে পারত।’ তবে তিনি কিশোরীকে সতর্ক করে বলেছিলেন, বয়স কম হওয়ায় পরিবারের কাছে ফিরে যেতে। কিন্তু কিশোরীর উত্তর ছিল ‘মা আমার বড় বোনকে বিক্রি করে দিয়েছে, আমি ওর কাছে থাকব।’

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, মাজাহারুল আগে ভিকটিমের বড় বোনের সঙ্গেও সম্পর্ক করেছিল। পরে মেজো মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ আছে, আসামি তার আয় থেকেও বাদী পরিবারকে সহযোগিতা করত। ফলে অনেকে মনে করেন, পরিকল্পিতভাবেই অপহরণ মামলা দেওয়া হয়েছে।

এ ঘটনার আইনি সত্যতা আদালতই নির্ধারণ করবে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, একজন দরিদ্র মা, যিনি এক সময় অন্যের বাসায় কাজ করতেন, আজ ছেলেকে মুক্ত করার জন্য আদালত চত্বরে ভিক্ষা করছেন। এ দৃশ্য আমাদের সমাজে কী বার্তা দেয়?

একদিকে প্রেম নাকি অপহরণ? এই বিতর্ক, অন্যদিকে অর্থবিত্তের টানাপড়েনে আইন ও বিচারব্যবস্থায় দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্ব।

এই মামলার ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে প্রেম, সামাজিক সম্পর্ক, আইন এবং দারিদ্র্যের বাস্তবতা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক মানবিক ট্র্যাজেডি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত