জাকসু নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন বর্জন করেছে ছাত্রদলসহ একাধিক প্যানেল। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক রায়হান রাইন কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। তার সঙ্গে আলাপ করেছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন
দেশ রূপান্তর : ৩৩ বছর পর জাকসু নির্বাচন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক হিসেবে ঐতিহাসিক এই জাকসু নির্বাচন আপনি কীভাবে দেখছেন?
রায়হান রাইন: আজকের (গতকাল) নির্বাচন নিয়ে আমি সর্বোপরি হতাশ। কারণ, প্রশাসন যত রকম অব্যবস্থাপনা এবং যত ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি করা সম্ভব, তার অনেকটাই করেছে দেখা গেল। তার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্ররা যেভাবে বিভিন্ন প্যানেল থেকে বয়কট ঘোষণা করল, নির্বাচন বর্জন করল সব মিলিয়ে পরিস্থিতি খুবই হতাশাব্যঞ্জক। এমন একটা নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে মনে হয় না, নির্বাচনটা স্থগিত করা উচিত।
দেশ রূপান্তর : সম্প্রীতির ঐক্য বলি, সংশপ্তক বলি, এমনকি বিএনপির ছাত্রদল পর্যন্ত নির্বাচনটা বয়কট করেছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে প্রশাসনের যে ভূমিকা তাকে কীভাবে দেখছেন? প্রশাসন কি আসলে কারও দ্বারা এটা করতে বাধ্য হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
রায়হান রাইন: কেউ বাধ্য করেছে কি না জানি না, তবে তাদের পক্ষপাতটা স্পষ্ট হয়ে দেখা গেছে। কারণ, সম্প্রীতির ঐক্য প্যানেলের সহসভাপতি প্রার্থীর প্রার্থিতা যে পন্থায় বাতিল করা হলো, সেটা খুবই অনায্য। পরে আদালতে যাওয়ার পরও আদালত তার প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিতে বললেও প্রশাসন কিন্তু সেটা করেনি। তারা চেম্বার আদালতে গিয়ে ভুয়া অজুহাত দেখিয়ে তার প্রার্থিতা বাতিল করে ছেড়েছে এবং তাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি।
দেশ রূপান্তর : ভিসি স্যার বা প্রশাসন এমন একটা মিথ্যাচারও করেছে, যে মিথ্যাচার আবার ধরাও পড়েছে।
রায়হান রাইন: হ্যাঁ, সেটা বোঝা গেল এবং এই যে নির্বাচনে পোলিং এজেন্ট না রাখা, আমরা জানি, নির্বাচনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা যুক্ত থাকেন, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো পক্ষের, পক্ষের বা মতের হয়ে থাকেন। সেরকম একটা পরিস্থিতিতে পোলিং এজেন্ট না থাকলে কীভাবে একটা নির্বাচন স্বচ্ছ হয়? সেটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে পরশু রাত ৩টায়। সকালবেলা যখন নির্বাচন শুরু হয়, তখন অনেক প্রার্থীর কোনো পোলিং এজেন্ট ছিল না। ফলে সেখানে কী হয়েছে? পোলিং এজেন্টবিহীনভাবে যে নির্বাচনটা শুরু হয়, সেখানে কী হয়েছে কে বলবে? এ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তারপর এক জায়গায় ভোট দিতে গিয়ে শিক্ষার্থী দেখেছে যে, তার ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থীর কাছে আলাদা ব্যালট পাওয়া গেছে, সেখানে আগে থেকেই দাগানো। সব মিলিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে এবং এটার যৌক্তিকতা আছে।
দেশ রূপান্তর : শিক্ষক মঞ্চও রয়েছে এখানে, শিক্ষকদের নানান রকম সমিতি রয়েছে। শিক্ষকদের ভূমিকাকে স্যার আপনি কীভাবে দেখছেন, এ নির্বাচন ঘিরে?
রায়হান রাইন: শিক্ষকদের ভূমিকা এখানে তো অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার কথা ছিল। নির্বাচন কমিশনার থেকে শুরু করে সব পর্যবেক্ষক এবং নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত যারাই আছেন, বেশিরভাগই তো প্রশাসনপন্থি। এখানে ইনক্লুসিভ হওয়ার জায়গাটা তো দেখলাম না আমরা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে ঐক্য আসলে ছিল, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই ঐক্য আসলে অনেক বেশি ভেঙে গেল এবং বাধাগ্রস্ত হলো?
রায়হান রাইন: এটা সারা দেশেই হয়েছে। আমরা দেখি গণঅভ্যুত্থানের সময়ে ছাত্র, জনতা, শ্রমিক, সবার মধ্যে যে ঐক্য ছিল, সেই ঐক্যটা তো মতাদর্শিক জায়গায় গিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে এবং সেই প্রক্রিয়াটা চলমান। আমরা এখানেও সেটাই দেখলাম, যে মতাদর্শিক বা দলীয় মনোভাবের ঊর্ধ্বে উঠে একটা সুস্থ নির্বাচন করা, সেটা তো দেখা গেল না এবং তার জন্য যে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, যে ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে বিশ্বাসযোগ্য একটা নির্বাচন হতে পারে, সেটা তো করা হলো না।
দেশ রূপান্তর : আপনি কি স্যার মনে করেন এই যে ছাত্রশিবির শেষ পর্যন্ত আসলে জিতল জাহাঙ্গীরনগরে; এটা তো একটা প্রায় সারা দেশবাসীর কাছেই অবিশ্বাস্য ব্যাপার ছিল, বিশেষ করে জাহাঙ্গীরনগরের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে যে সুনাম, তার প্রতিবাদী চরিত্রের যে সুনাম, সেই জায়গায় চিন্তা করলে? তো, এটাকে আপনি কী বলবেন স্যার? এটা কি একটা ম্যাস সুইসাইডাল?
রায়হান রাইন : না, না, ছাত্রশিবির জিতল, এটা কীভাবে বোঝা যাবে? ছাত্রশিবির জিতেছে, এটা আমি মনে করি না। এটা বরং আমি বলব, তাদের জিতিয়ে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া, সেটাকে শিক্ষার্থীরা আটকে দিয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধ এখানে গড়ে উঠেছে। জাহাঙ্গীরনগরের যে দীর্ঘকালের ঐতিহ্য অসাম্প্রদায়িক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্যাম্পাস, সেই জায়গাটায় শিক্ষার্থীরা আছে বলেই আমার মনে হয়।
দেশ রূপান্তর : আপনি মনে করেন স্যার, দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্রশিবির যে এক অর্থে নিষ্পেষিত ছিল, তারা প্রকাশ্য রাজনীতি করতে পারেনি, সেই সময় তারা আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিকস করে নিজেদের সুসংগঠিত করেছে, তাদের সেই শক্তির একটা আপনি যদি ইঞ্জিনিয়ারিং বলেন, ভোট রিগিং যদি বলেন, কিংবা প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব যদি বলেন, সেগুলো তারা সাংগঠনিকভাবে নিজেদের দিকে নিতে পেরেছে? সেটাকে আপনি তাদের ক্রেডিট মনে করেন না?
রায়হান রাইন: সেটা কীভাবে বোঝা গেল? এখানে অনেকেই গুপ্ত আছে। তাদের এই গুপ্ত থেকে যে কর্মতৎপরতা, এটা তারা করেছে, সেটা তো বোঝাই যায়। কিন্তু এর মাধ্যমে তারা সবকিছু তাদের অনুকূলে নিয়েছে, এটা বলা যায় না। কারণ ক্যাম্পাসে যদি ভোটটা সুষ্ঠু হতো, তাহলে তো এই ভোটের ক্ষেত্রে এ অব্যবস্থাপনা বা এই ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো হওয়ার কথা ছিল না। যদি তারা এতটাই অবিশ্বাসী হয় যে তারা জিতবে, তাহলে তো এত কায়দাকানুনের দরকার ছিল না এবং কোনো প্রার্থীকে এভাবে বাতিল করা কিংবা পোলিং এজেন্ট ঢুকতে না দেওয়ার দরকার ছিল না। আবার ওএমআর পদ্ধতিতে যে সফটওয়্যার জালিয়াতির চেষ্টাটা করা হয়েছিল, তাও লাগত না। সেটাও তো ছাত্ররাই নজরে এনেছে।
দেশ রূপান্তর : আজকের (গতকাল) যে নির্বাচনের ঘটনা, আপনি তো বলছেন এটা স্থগিত হওয়া উচিত বা এটা পুনরায় হওয়া উচিত। কিন্তু সেটার প্রক্রিয়াটা কী হবে স্যার? এই ভিসির অধীনেই কি আবার সেটা করার আস্থা শিক্ষার্থীরা পাবে?
রায়হান রাইন : না, উপাচার্যের ব্যাপারে অনেকেরই আস্থার সংকট তৈরি হলো। কারণ, উপাচার্য সেই নিরপেক্ষতা দেখাতে পারলেন না। বলেন যে, তিনি সবার অভিভাবক এবং গণঅভ্যুত্থানের ভিসি। সেই জায়গাটা তিনি রাখতে পারলেন না। আমার যেটা মনে হয়, জাকসুকে যদি সফল হতে হয়, তাহলে এর যিনি প্রধান থাকবেন, তিনিই কেন ছাত্র হবেন না। উপাচার্য কেন ছাত্র সংসদের সভাপতি হবেন, মানে গঠনতন্ত্রেই তো সমস্যা।
দেশ রূপান্তর : স্যার, আপনি দর্শন বিভাগের অধ্যাপক, আপনাকে একটা দার্শনিক প্রশ্ন আমি করতে চাই। সেটা হলো, এই যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিজস্বতা, এখানকার সাংস্কৃতিক জোটসহ তার সংগঠনগুলোর যে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, তার পরিপ্রেক্ষিতেই আসলে জাকসু বাস্তবায়নের কথা। এ সংগ্রাম তারা অনেক দিন ধরে করে আসছে। মানে জাকসুর জন্য তারা দীর্ঘ সময় ধরে সংগ্রাম লড়াই করে আসছে। তারপর এরকম একটা নির্বাচন যে হলো, এটাকে আপনি কি এই জাহাঙ্গীরনগরের যে প্রগতিশীল দলগুলো বা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো বা ধরেন জাহাঙ্গীরনগরের সাংস্কৃতিক জোটসহ যে সংগঠনগুলো আছে, তাদের প্রতিরোধটা আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
রায়হান রাইন : না, তারা তো প্রতিরোধ করছে এবং তারাই যাবতীয় সংকটগুলোকে সামনে এনেছে। এই যে পোলিং এজেন্ট না থাকা থেকে শুরু করে কোথাও কোথাও যে ব্যালট পেপারেরও ভুলভাল আছে, কোনো কোনো হলে; তো, সেই অব্যবস্থাপনাগুলো এবং নির্বাচনের যে পক্ষপাত, এগুলো তো তারাই সামনে এনেছে। ফলে তাদের ক্রেডিট দিতে হবে প্রতিরোধের জন্য। অবশ্য তাদের সংকটও আছে, তারা ঐক্যবদ্ধ না। অভ্যুত্থানের পর যে প্রক্রিয়ায় এখানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু হয়েছে, ধর্মীয় উগ্রবাদের যে সম্ভাবনা তৈরি হলো, এ জায়গাগুলোতে কিন্তু তারা কোনো প্রতিরোধ করতে পারেনি। কারণ, শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেই অনেক বিরোধ আছে। তারা নানানভাবে বিভক্ত হয়েছে, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারেনি। তারপরও এ নির্বাচন কেন্দ্র করে, সম্প্রীতির ঐক্য নামে একটা প্যানেল তারা করেছে এবং সংশপ্তক ও স্বতন্ত্র আলাদা একটা প্যানেল আছে। তো, এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তারা ঐক্যবদ্ধ হয়েছে জানলাম। এটা তো আশাব্যঞ্জক।
দেশ রূপান্তর : অনেক ধন্যবাদ স্যার। আমি একটু জাতীয় পরিসরের জায়গা থেকে আপনার কথা শুনতে চাই বা জানতে চাই যে, ধরেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা ডাকসু নির্বাচনে আমরা দেখলাম যে, ছাত্রদলের ব্যাপক ভরাডুবি হয়েছে এবং শিবির প্রায় পুরো প্যানেল ধরে জিতেছে। অনেকেরই পূর্বাভাস ছিল যে, জাহাঙ্গীরনগরেও একই ঘটনা ঘটবে, কিন্তু জাহাঙ্গীরনগরে আসলে একটা প্রতিরোধ তৈরি হচ্ছে?
রায়হান রাইন : হ্যাঁ, সেটা তো দেখাই যাচ্ছে।
দেশ রূপান্তর : আপনি জাতীয় রাজনীতিতে এই নির্বাচন বা আজকের এই ঘটনা কী প্রভাব রাখতে পারে বলে মনে করেন?
রায়হান রাইন: জাতীয় রাজনীতিতে কী প্রভাব রাখবে সেটা এই মুহূর্তে বলা মুশকিল, তবে এর যে মানে সর্বোপরি মানে অভ্যুত্থানের পর যে দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটেছে, এই উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে যত ধরনের ধর্মীয় উগ্রবাদ আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই মাজার, খানকা শরিফ ভাঙা, বাউল ফকিরদের আক্রমণ, তৌহিদী জনতার নামে বা মব কিংবা নানান নামে যখন এদের নির্মূল করার চেষ্টা করা হচ্ছে, এদের খানকা জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, ওরস আটকে দেওয়া হচ্ছে। তো, এ ঘটনাগুলো কিংবা নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাদের ফুলের মালা পরানো হচ্ছে নির্যাতকদের। তো, এ যাবতীয় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে প্রতিরোধ তৈরি হওয়া দরকার, সেটা এখন এই মানে জাকসু বা ডাকসু নির্বাচন থেকে সেটা বোঝা যাবে না, কিন্তু শিবিরের পক্ষে যে কারচুপি, শিবিরের পক্ষে যে তৎপরতা আমরা দেখলাম, তার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ এখানে হয়েছে এবং সেটা নিশ্চয়ই একটা ভূমিকা রাখবে।
দেশ রূপান্তর : অনেক ধন্যবাদ স্যার।
রায়হান রাইন: তোমাকেও ধন্যবাদ শিমুল।
