শত বছরের ঐতিহ্যবাহী চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাচন ঘিরে নতুন করে আমেজ সৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের মধ্যে। এক বছরেরও বেশি সময় ব্যবসায়ী নেতৃত্বাহীন থাকা এই চেম্বারে আগামী ১ নভেম্বর পরিচালনা বোর্ডের নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এদিকে, ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এই চেম্বার সাবেক এমপি এম এ লতিফের নিয়ন্ত্রণমুক্ত হলেও নতুন করে এর নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর রয়েছে বিএনপিপন্থি একাধিক ব্যবসায়ী গ্রুপ। এ নিয়ে একাধিক বলয়ে ভাগ হয়ে পড়ছেন তারা।
চেম্বার সূত্র জানায়, ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১ নভেম্বর চেম্বার নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহীদের কাছে মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ সেপ্টেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ২৩ সেপ্টেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাই, ২৫ সেপ্টেম্বর খসড়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশ, ৮ অক্টোবর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার ও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের তারিখ রাখা হয়েছে।
ইতিমধ্যে নতুন প্রশাসনের দায়িত্ব পাওয়া চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নূরী চেম্বারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আগের ধারাবাহিকতায় ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন তিনি।
জানা যায়, চেম্বারের আগামী নির্বাচন নিয়ে বেশি তৎপর রয়েছেন বিএনপিপন্থি ব্যবসায়ীরা। জামায়াতপন্থি বেশ ক’জন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীও চেম্বারের আগামী নেতৃত্বে নিজেদের পছন্দের লোকজনকে আনতে বিএনপির একটি অংশের সঙ্গে লিয়াজোঁর চেষ্টা চালাচ্ছে।
জানা যায়, আগামীতে চেম্বারের নেতৃত্ব প্রত্যাশীদের একটি গ্রুপ সাবেক চেম্বার সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তার আনুকূল্য পাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সাবেক চেম্বার নেতা এরশাদ উল্লাহর সমর্থন পেতে তৎপর রয়েছে আরেকটি গ্রুপ। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা লায়ন আসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই সাবেক চেম্বার পরিচালক আমজাদ হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বেও ব্যবসায়ীদের আরেকটি শক্তিশালী গ্রুপও নির্বাচনকে সামনে রেখে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কোন গ্রুপ থেকে কাদের শীর্ষ নেতৃত্বে মনোনয়ন দেওয়া হবে তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
চেম্বারের সাবেক একাধিক পরিচালক ও আগামীতে চেম্বার নেতৃত্বে আসতে আগ্রহী একাধিক ব্যবসায়ী নেতা দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এক ব্যক্তির হাতের মুঠোয় থাকা চট্টগ্রাম চেম্বারকে রাহুমুক্ত করতে আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচালনা বোর্ডকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যবসায়ীদের সংগঠন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস এসোসিয়েশন যে স্টাইলে দখল হয়েছে, কিংবা শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের নির্বাচন প্রক্রিয়া যেভাবে বারবার বাধাগ্রস্ত করা হয়েছেÑ চট্টগ্রামের শতবর্ষী চেম্বারকেও একইভাবে দখলে নিতে কোনো কোনো মহল নানা কূটকৌশল আঁটতে পারে। তবে, তারা আশা করেন চেম্বার প্রশাসক ও নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করতে সক্ষম হবেন।
চট্টগ্রাম চেম্বার ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পোদ্যোক্তা প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চেম্বারের আগামী নেতৃত্ব নিয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের। চেম্বারের হারানো ইমেজ ফিরিয়ে আনার এখনই সময়। একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানে সত্যিকার অর্থে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব আসবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এস এম নুরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিন এই চেম্বার ব্যবসায়ীদের স্বার্থে পরিচালিত হয়নি, ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করেছে। এখন সুযোগ এসেছে সত্যিকারের ব্যবসায়ীবান্ধব নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। আশা করি, একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচিত করার এই সুযোগ কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন।
প্রায় দুই যুগ ধরে সাবেক এমপি এম এ লতিফের আঙুলের ইশারায় চলে আসছিল ব্যবসায়ীদের ঐতিহ্যবাহী এই সংগঠনটি। তার সম্মতি ছাড়া কারও চেম্বার বোর্ডে আসার সুযোগ হতো না। তার দেওয়া তালিকা অনুযায়ী হতো চেম্বার পরিচালনা বোর্ড। তার সিদ্ধান্তে গঠিত হতো প্রেসিডিয়াম। এক পর্যায়ে পুরোপুরি পরিবারতন্ত্রে রূপ নিয়েছিল এই চেম্বার। নিজেদের ছেলেমেয়ে, আত্মীয়-স্বজনরা স্থান পেতে থাকে পরিচালনা বোর্ডে। ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে যারাই তার সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন তাদের ছিটকে পড়তে হয়েছে চেম্বার রাজনীতি থেকে। এমন পরিস্থিতিতে চেম্বারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন ব্যবসায়ীরা। অনেকে পুরনো সদস্যপদ নবায়ন থেকেও বিরত থাকেন। আবার চেম্বারের সদস্য হওয়ার যোগ্য নয় এমন অনেকের নাম উঠে যায় চেম্বারের সদস্য তালিকায়।
২৪-এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালনা বোর্ডকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে তাদের পদত্যাগ দাবিতে বিভিন্ন ব্যানারে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন ব্যবসায়ীরা। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সভাপতি ওমর হাজ্জাজের নেতৃত্বাধীন পরিচালনা বোর্ড গত ৩ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়। এরপর থেকে বিগত প্রায় এক বছর ধরে ব্যবসায়ী নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় রয়েছে ব্যবসায়ীদের এই সংগঠনটি।
মূলত চেম্বার পরিচালনা বোর্ডের পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসেই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. আনোয়ার পাশাকে চেম্বার প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাণিজ্য সংগঠন আইন ২০২২ এর ১৭ ধারা অনুযায়ী ১২০ দিনের মধ্যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করারও নির্দেশনা দেওয়া হয় প্রশাসককে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে চেম্বারের সদস্য, ভোটার তালিকাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের দাবি আসায় নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন করা যায়নি। এর মধ্যে কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয় প্রশাসকের। এক বছর পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় গত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে আনোয়ার পাশার পরিবর্তে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নূরীকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রসঙ্গত, আগে চেম্বার নির্বাচনে মোট চারটি ক্যাটাগরি থেকে ২৪ জন পরিচালক নির্বাচিত হতেন। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে টাউন এসোসিয়েশন ও ট্রেড গ্রুপ থেকে পরিচালক নির্বাচনের সুযোগ থাকছে না। এ অবস্থায় অর্ডিনারি গ্রুপ থেকে ১২ জন, অ্যাসোসিয়েট গ্রুপ থেকে ৬ জন পরিচালক সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন।
