কিছুতেই ঠেকানো যাচ্ছে না কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল। গোয়েন্দা নজরদারি, চেকপোস্ট, পেট্রোলিং জোরদারের পরেও যতই দিন যাচ্ছে বাড়ছে মিছিলের সংখ্যা। এমনকি যে থানা এলাকায় ঝটিকা মিছিল হবে সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে বরখাস্তের মতো কড়া নির্দেশনা ও এক্ষেত্রে দায়ের হওয়া মামলার চার্জশিট ১৫ দিনের মধ্যে জমা দেওয়ার সিদ্ধান্তের পরেও দমানো যাচ্ছে না মিছিল। কয়েক মিনিটের জন্য রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই বের হচ্ছে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী স্বৈরাচারের দোসরদের মিছিল। যেখানে গণঅভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে নিয়ে নানা রকম স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। সবশেষ গতকাল বুধবারও গুলিস্তান, ফার্মগেট, পান্থপথ, সংসদ ভবনসহ আরও কয়েকটি এলাকায় ঝটিকা মিছিল করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, জাতীয় নির্বাচনকে বানচাল করতে ঢাকায় ঘাঁটি গেড়েছে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাওয়ায় গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগের দোসরদের তথ্য দিতে নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গতকাল রাজধানীতে কাছাকাছি সময়ে গুলিস্তান, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, আগারগাঁও, পান্থপথ এলাকায় মিছিল বের করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তেজগাঁওয়ের মিছিল থেকে অর্ধশত নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের পাশে পানি ভবনের সামনে ককটেল উদ্ধার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গুলিস্তানের বায়তুল মোকাররম মসজিদের দক্ষিণ প্লাজার সামনে থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীর মিছিল নিয়ে ভাসানী হকি স্টেডিয়ামের সামনে দিয়ে আহাদ পুলিশ বক্সের দিকে যায়। এ সময় দলের পক্ষে তারা স্লোগান দিচ্ছিলেন। খামারবাড়ি থেকে বের হওয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে যান ফার্মগেটের দিকে। ডিএমপির এক খুদেবার্তায় জানানো হয়, ফার্মগেট ও বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের পাশে পানি ভবনসহ তেজগাঁও এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের লোকজন ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন টিম এসব এলাকায় তৎপর রয়েছে। দুপুর ২টার দিকে বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্সের উল্টো পাশের রাস্তা ধরে মিছিল বের করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তারা মিছিল নিয়ে কারওয়ান বাজার মোড়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ সেখান থেকে কয়েকজনকে আটক করে। এর আগে গত কয়েকদিনের মধ্যে আগারগাঁও, শ্যামলী, গুলিস্তান ও তেজগাঁও নাবিস্কো এলাকায় মিছিল করেছিল দলের নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগ কর্মীদের তথ্য চাইল পুলিশ : ঢাকার আবাসিক হোটেল, ফ্ল্যাট ও ছাত্রাবাসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী থাকলে নগরবাসীকে তথ্য দিতে অনুরোধ জানিয়েছে ডিএমপি। যারা তথ্য দেবে তাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। গতকাল বিকেলে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, পুলিশ আবাসিক হোটেল, ফ্ল্যাট ও ছাত্রাবাসে গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, অনেক ফ্ল্যাটে ফ্রি থাকছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। জনগণ পুলিশকে তথ্য দিলে পুলিশ সেখানে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আটক করবে। তাদের গ্রেপ্তার করলে পরবর্তী সময়ে ঝটিকা মিছিলের সংখ্যা কমে যাবে। যারা তথ্য দেবে তাদের নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে। অতিরিক্ত কমিশনার আরও বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ঝটিকা মিছিল বের করছে। এসব মিছিল থেকে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারে জনসাধারণ পুলিশকে সহায়তা করেছে। আগামীতেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরিয়ে দিতে জনগণ পুলিশকে সহায়তা করবে। তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিনষ্টের চেষ্টা করছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
একদিনেই গ্রেপ্তার ২৪৪ নেতাকর্মী : রাজধানীতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের ঝটিকা মিছিলের চেষ্টার অভিযোগে ১৪টি ককটেল ও ৭টি ব্যানারসহ ২৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিল আয়োজনের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বিনষ্ট করে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে ডিএমপির সব ইউনিটের চেষ্টায় এদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে ডিবি পুলিশ ৫০ জনকে, সিটিটিসি ২৭ জনকে, তেজগাঁও বিভাগ ১০০ জনকে, রমনা বিভাগ ৫৫ জনকে, গুলশান বিভাগ ৫ জনকে, মিরপুর বিভাগ ৪ জনকে এবং উত্তরা বিভাগ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এই গ্রেপ্তারের সময় ১৪টি ককটেল ও ৭টি ব্যানার উদ্ধার করা হয়। তিনি আরও বলেন, ঝটিকা মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের অর্থ জোগানদাতা, আশ্রয়দাতা ও লোক সরবরাহকারীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। তিনি আজকের ঝটিকা মিছিল থেকে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেপ্তারে সহযোগিতার জন্য নগরবাসীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গ্রেপ্তার : কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। গতকাল ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, গুলশান এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এদিকে ভোলা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের ভাতিজা ও দিঘলদী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইফতারুল হাসান স্বপনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল রাজধানীর মালিবাগের গুলবাগ এলাকা থেকে সিটিটিসির একটি দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করে। মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, স্বপনের বিরুদ্ধে এলাকায় চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, সরকারি কর্মচারীদের মারধর ও হুমকি, নারী ও সাংবাদিক নির্যাতন, চাকরি দেওয়ার নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়াসহ নানা প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও মঙ্গলবার দিবাগত রাতে শাহজাদপুরের আজমেরী এলাকার নিজ বাসা থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর হাজেরা খাতুন ওরফে নার্গিসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে ডিএমপির বিভিন্ন ইউনিট কর্তৃক ধারাবাহিক অভিযানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের প্রায় ৫ শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে।
