যশোরের মনিরামপুরে উৎপত্তি হওয়া গতকাল শনিবারের ৩ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে হয়েছিল। শুধু কি মনিরামপুর? এ পর্যন্ত দেশের ভেতরে উৎপত্তি হওয়া প্রায় সব ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ১০ কিলোমিটার গভীরে। কাকতালীয় মনে হলেও এটাই বাস্তব।
দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলোর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর সিলেটের ছাতকে উৎপত্তি হওয়া ৪ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছিল ১০ কিলোমিটার গভীরে। এর আগে ২০২৩ সালের ১৬ জুন সিলেটের গোলাপগঞ্জে উৎপত্তি হওয়া ৪ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটিও ১০ কিলোমিটার গভীরে হয়েছিল। একই বছর ৫ মে ঢাকার দোহারে ৪ দশমিক ৩ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছিল ১০ কিলোমিটার গভীরে। ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর খুলনার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে ৫ দশমিক ১ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছিল। ২০১০ সালে ৯ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে উৎপত্তি হওয়া ৪ দশমিক ৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি ছিল ১৬ কিলোমিটার গভীরে। ২০০৮ সালের ২৬ জুলাই ময়মনসিংহে ৪ দশমিক ৮ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি ছিল ১৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার গভীরে। ঢাকায় ২০০১ সালের ১৯ ডিসেম্বর ৪ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পটি ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছিল।
১০ কিলোমিটার গভীরে হচ্ছে কেন : ভূমিকম্পের উৎপত্তির উপাত্তে পাওয়া ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক ও দেশের অন্যতম ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেহেতু আমাদের বাংলাদেশ পলি সঞ্চয়নের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। তাই মাটির এই গভীরতার পর হয়তো আরেকটি স্তর রয়েছে। তাই দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলো অগভীর তথা ১০ কিলোমিটার গভীরে হচ্ছে।’
মমিনুল ইসলামের এই বক্তব্যের বিষয়ে জানতে কথা হয় জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের উপপরিচালক ও ডাউকি ফল্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি গবেষক আকতারুল আহসানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশসহ সীমান্তবর্তী ভারতের এলাকাটিতে যেসব ফল্ট রয়েছে সেগুলোর গভীরতা কম। এতে কম গভীরতায় শক্তিগুলো জমা থাকে এবং সেখান থেকেই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। আর এজন্যই কিছুদিন আগে আসামে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পটি মাত্র পাঁচ কিলোমিটার গভীরে এবং সর্বশেষ সিলেটের ডাউকি ফল্টের কাছের ভূমিকম্পটি ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হয়েছে।’
কিন্তু ভূমির গঠন কাঠামো অনুসারে যেহেতু গাঙ্গেয় বেসিন (পুরো বাংলাদেশ) পলি সঞ্চয়নের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে তাহলে কি এখানে মাটির পুরুত্ব কম? এই প্রশ্নের জবাবে আকতারুল আহসান বলেন, ‘রংপুর ও দিনাজপুর হয়ে বগুড়া পর্যন্ত ১০ কিলোমিটারের নিচেই শক্ত মাটির স্তর রয়েছে। রংপুরের কঠিন শিলার উপস্থিতি কিন্তু তাই প্রমাণ করে। কিন্তু বগুড়া থেকে দক্ষিণ দিকে এবং সিলেট হয়ে দক্ষিণের পুরো এলাকায় কাদা ও বালি মাটির মিশ্রণের গভীরতা প্রায় ২০ কিলোমিটার।’
অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলো কম গভীরতায় উৎপত্তি হচ্ছে। এমনকি ডাউকি ফল্টের গভীরতাও কিন্তু ১০ কিলোমিটারের মধ্যে।’
এমন গভীরতায় ভূমিকম্প কিন্তু আগেও হয়েছে উল্লেখ করে দেশের অন্যতম সেরা ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আনসারী বলেন, ‘২০০৬ সালেও কিন্তু যশোরের মনিরামপুর এলাকায় ৪ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ছাড়া ১৯০৬ সালে যশোরের পশ্চিমে কলকাতা অংশেও ৫ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প হয়েছিল। এ ছাড়া এই এলাকায় পলল মাটির গভীরতা প্রায় ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত।’
গতকাল শনিবার দুপুর ২টা ২৭ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে ঢাকার আগারগাঁও থেকে ১৫৭ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে যশোরের মনিরামপুর এলাকায় ৩ দশমিক ৫ রিখটার স্কেলের ভূমিকম্প হয়। ভারতীয় সিসমোলজির উপাত্ত অনুযায়ী উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পটি মাটির ১০ কিলোমিটার গভীরে হয়েছিল। এ ছাড়া সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় দুই হাজারবার ভূমিকম্প হয়। এদের মধ্যে বছরে ১০০ ভূমিকম্প তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে। এই ১০০ ভূমিকম্পের মধ্যে কিছু ভূমিকম্প ধ্বংসলীলায় খুব মারাত্মক হয়ে থাকে। পৃথিবী ছোট-বড় ২৭টি প্লেট নিয়ে গঠিত এবং এই প্লেটগুলো প্রতিনিয়ত গতিতে রয়েছে। ফলে প্লেটগুলোর প্রান্তসীমায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে থাকে। আমাদের দেশের পূর্বপাশ দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের মধ্যবর্তী হয়ে একটি ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মা প্লেটের ফল্টলাইন রয়েছে, যা সিলেটের উত্তরপ্রান্ত হয়ে হিমালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। এই ফল্টলাইনের কারণে ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে প্রায়ই ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। সেগুলো আবার মাটির অনেক গভীরে হয়ে থাকে।
