স্মরণসভায় সালাহউদ্দিন

আবরার ফাহাদের আত্মত্যাগে তৈরি গণঅভ্যুত্থানের সিঁড়ি

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:১৮ এএম

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শহীদ শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনার ও চিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার আর্টস অডিটরিয়াম এবং টিএসসি অডিটরিয়ামে পৃথকভাবে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বক্তারা আবরারের আত্মত্যাগকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে আবরারের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তরুণ শিল্পীদের শিল্পকর্মে ফুটে উঠেছে আবরারের দেশপ্রেম, ন্যায় ও আদর্শের প্রতিচ্ছবি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘ছয় বছর আগে ছাত্রলীগের নির্যাতনে প্রাণ হারানো বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সিঁড়ি নির্মিত হয়েছে। গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি অডিটরিয়ামে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল আয়োজিত ‘মতপ্রকাশ থেকে মৃত্যু : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্যাসিবাদের বিস্তার ও প্রতিরোধ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা শাপলা চত্বরের শহীদ এবং আবরার ফাহাদের মতো শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গণঅভ্যুত্থানের সিঁড়ি নির্মাণ করেছি। ব্রিটিশ শোষণ, ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ, ১৯১১-এর বাধা ও লাহোর প্রস্তাবের মতো ঐতিহাসিক ঘটনা শোষণ ও বিভাজনের ধারাকে প্রভাবিত করেছে। ফ্যাসিবাদের শিকড় উৎপাটন করতে হলে জনগণের সামনে ভালো রাজনীতির উদাহরণ তুলে ধরতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী বৃহৎ শক্তিগুলোর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের কৌশল সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। বাংলাদেশে বিদেশি শক্তির অনুকূলে শাসকগোষ্ঠী সৃষ্টির প্রচেষ্টা আংশিক সফল হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুধু সেøাগান বা রাজনীতি দিয়ে ‘খারাপ রাজনীতি’ ধ্বংস করা যাবে না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করে ‘ভালো রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠাই একমাত্র সমাধান।

আলোচনা সভায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ‘২০১৯ সালে গভীর রাতে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তখনকার প্রতিবাদ সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, ‘জীবিত আবরারের চেয়ে শহীদ আবরার ফাহাদ অনেক বেশি শক্তিশালী। তিনি আমাদের দেখিয়েছেন কীভাবে আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলতে হয়, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে হয়। তিনি আমাদের প্রেরণার বাতিঘর।’

গতকাল আর সি মজুমদার আর্টস অডিটরিয়ামে ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব : স্মরণে শহীদ আবরার ফাহাদ’ শীর্ষক সেমিনার ও ‘স্মরণে মননে শহীদ আবরার ফাহাদ’ চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমার ও আবরারের মধ্যে মিল আছে। আমরা দুজনই বুয়েটের ছাত্র, শেরেবাংলা হলে ছিলাম এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। তবে আবরার শহীদ হতে পেরেছেন, আমি পারিনি। তার রক্ত বৃথা যায়নি; তিনি জাতিকে জাগিয়ে তুলেছেন।’

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদী বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোটি কোটি আবরার প্রয়োজন।’ তিনি বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউকে ‘শহীদ আবরার ফাহাদ অ্যাভিনিউ’ নামকরণের দাবি জানান।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আবরার ফাহাদের শাহাদাতের মধ্য দিয়েই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল। তার পথ ধরে তরুণরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।’ তিনি অভিযোগ করেন, আবরারকে ‘শিবির’ ট্যাগ দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল এবং তার শাহাদাতকে বিতর্কিত করার চেষ্টা এখনো চলছে।

আবরার ফাহাদকে উৎসর্গ করে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘আবরার ফাহাদ’ গতকাল (৭ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টায় দেশের সব শিল্পকলা একাডেমিতে একযোগে প্রদর্শিত হয়। এতে আবরারের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ডাকসুর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিত্র প্রদর্শনী ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ আবরারের বাবা মো. বরকতউল্লাহ প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।

এ ছাড়া বুয়েটের শেরেবাংলা হল প্রাঙ্গণে ‘আবরার ফাহাদ স্মৃতিফলক’ স্থাপন করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে শেরেবাংলা হল অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু বোরহান মোহাম্মদ বদরুজ্জামান এটি উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, ‘আবরার সত্য কথা বলার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আমাদের সচেতন থাকতে হবে।’ তিনি বুয়েটে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, স্মৃতিফলকটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অনুপ্রাণিত করবে।

পলাশীতে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ’ উদ্বোধন : নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নির্যাতনে শহীদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের স্মরণে রাজধানীর পলাশী মোড়ে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ’ উদ্বোধন করা হয়েছে। গতকাল পলাশী মোড়ে ‘আবরার ফাহাদ স্মৃতি সংসদ’ আয়োজিত উদ্বোধন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এটি উদ্বোধন করেন আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ।

শহীদ আবরার ফাহাদের স্মৃতি ও আগ্রাসনবিরোধী চেতনাকে সমুজ্জ্বল রাখতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ‘শহীদ আবরার ফাহাদ স্মৃতি স্মরণে পলাশী গোলচত্বরে আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভ নির্মাণ ও পলাশী ইন্টারসেকশন উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, বুয়েটের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, আবরার ফাহাদের ভাই আবরার ফাইয়াজ, জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, ডিএসসিসি প্রশাসক মো. শাহজাহান মিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

উদ্বোধনের পর আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, ‘আট স্তম্ভ তৈরি করায় আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। আবরার ফাহাদ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে শহীদ হয়েছে। আমি আহ্বান জানাই, জুলাইয়ে আহত এবং নিহতদের তালিকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিগত সময়ে অত্যাচারে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে শহীদদের তালিকা করার কথা ছিল, সেই তালিকা যেন দ্রুতই করা হয়।’

আটটি স্তম্ভের নাম সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, গণপ্রতিরক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, দেশীয় শিল্প-কৃষি ও নদী-বন-বন্দর রক্ষা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদা। এ স্তম্ভের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম।

২০২০ সালের ৭ অক্টোবর আবরার ফাহাদের প্রথম শাহাদাতবার্ষিকীতে আখতার হোসেনের উদ্যোগে আট স্তম্ভ নির্মাণ করা হলে সেটি ভেঙে দেওয়া হয়। চব্বিশের ৫ আগস্টের পর এটি নতুন করে তৈরি করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত