প্রাণের কোলাহল ফিরেছে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের ২ দ্বীপে

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:১৯ এএম

দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন স্বপ্নের দেশ। সাদা বালির সৈকত, স্বচ্ছ ফিরোজা নীল জল আর ঘন সবুজ অরণ্য প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ভেসে থাকা এই দ্বীপগুলোর নাম বিকার অ্যাটল এবং জেমো আইলেট। কিন্তু কয়েক দশক ধরে এই স্বর্গভূমি দখল করে নিয়েছিল ইঁদুরের দল। যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সংস্থা ‘আইল্যান্ড কনজারভেশন’-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক পল জ্যাক যখন এই দ্বীপগুলোতে যান, তখন চারদিক ইঁদুরে কিলবিল করছিল। তিনি বলেন, ওরা সবখানে দৌড়াদৌড়ি করছিল। রাতে টর্চ নিয়ে হাঁটলে ভয় লাগত মনে হতো যেন পায়ের তলার মাটিটাই ইঁদুরের কারণে নড়ছে। এই ইঁদুরগুলো জাহাজের মাধ্যমে দ্বীপে এসে পরিবেশের ভারসাম্যটাই নষ্ট করে দিয়েছিল। তারা স্থানীয় গাছপালা খেয়ে সাবাড় করত, আর কাঁকড়ার বাচ্চা, পাখির ডিম এবং কচ্ছপের ছানাদের শিকার করত। এক সময় যে দ্বীপগুলো বিপন্ন সবুজ সামুদ্রিক কচ্ছপ এবং সামুদ্রিক পাখিদের কলকাকলিতে মুখর থাকত, সেখানে নেমে এসেছিল নীরবতা।

জ্যাক বলেন, স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা যখন প্রথমবার জেমো দ্বীপে এসেছিলেন, তখন এর নাম দিয়েছিলেন ‘লস পাহারোস’ অর্থাৎ ‘পাখিদের দ্বীপ’, কারণ সেখানে এত পাখি ছিল। কিন্তু আমরা যখন গেলাম, তখন হাতেগোনা কয়েকটি পাখি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কিন্তু এক বছর পর, সেই চিত্রটা পুরোপুরি বদলে গেছে। ‘আইল্যান্ড কনজারভেশন’ এবং মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ মিলে এক সফল ইঁদুর নির্মূল অভিযান চালিয়েছে। জ্যাক ব্যাখ্যা করেন, ড্রোনের সাহায্যে পুরো দ্বীপে এমনভাবে ইঁদুর মারার বিষটোপ ছিটানো হয়েছিল যাতে এক ইঞ্চিও জায়গা বাদ না যায়। এই বিষটোপ বিশেষভাবে ইঁদুরদের লক্ষ্য করে তৈরি, তাই অন্য প্রাণীদের ওপর এর প্রভাব খুবই কম। লক্ষ্য ছিল, প্রতিটি ইঁদুর যেন অন্তত একটি বিষটোপ খায়। এই গ্রীষ্মে দলটি আবার সেই দ্বীপে ফিরে যায় এবার ছিল ফলাফল দেখার পালা। জ্যাক বলেন, দ্বীপে পা রাখার মুহূর্তটা ছিল অসাধারণ। আমাদের সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠেছিল। আমরা খুঁজছিলাম ইঁদুর আছে কি নেই? মাটিতে পাখিরা বাসা বেঁধেছে কি না? যে কোনো একটা চিহ্ন, যা বলে দেবে আমরা জিতেছি না হেরেছি।

আর এর ফলাফলও হয়েছে অবিশ্বাস্য! সামুদ্রিক পাখিদের ঝাঁক ফিরে এসেছে। বিকার দ্বীপে প্রায় ২,০০০ স্যুটি টার্ন পাখির একটি নতুন কলোনি তৈরি হয়েছে, যেখানে আগের বছর একটিও ছিল না। জ্যাক মাটিতে বাসা বাঁধা বাদামি নোডি এবং ক্রেস্টেড টার্ন দেখেছেন। এমনকি এমন কিছু প্রজাতির পাখি, টিকটিকি এবং কাঁকড়া দেখেছেন যা আগে কখনো রেকর্ড করা হয়নি। তিনি বলেন, ইঁদুরের অত্যাচারে যে প্রজাতিগুলো প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল, তারা আবার ফিরে আসছে। তবে সবচেয়ে বড় সাফল্যের চিহ্ন ছিল মাটি ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা হাজার হাজার পিসোনিয়া গাছের চারা। আগের বছর একটিও চারা ছিল না, আর এখন মাটি জুড়ে যেন সবুজ গালিচা বিছিয়ে দিয়েছে। জ্যাক বলেন, দ্বীপে ফিরেই এই দৃশ্যটা দেখে আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে, এখানে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটে গেছে। শুধু গাছপালা বা পাখিই নয়, পুরো দ্বীপটাই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছিল। পাখির মল মাটিকে উর্বর করে তুলছে, আর কাঁকড়ারা তাদের লার্ভা সমুদ্রে ছাড়ছে যা অন্য সামুদ্রিক প্রাণীদের খাদ্যের জোগান দিচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত