চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) এবং হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল বুধবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হওয়া এই ভোটগ্রহণ বিকেল ৪টা পর্যন্ত একটানা চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি অনুষদ ভবনে ১৫টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে ক্যাম্পাসে নিিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ভবনের সামনে এলইডি স্ক্রিন স্থাপন করা হয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল লক্ষণীয়। তবে, অমোচনীয় কালির অপ্রতুল ব্যবস্থা, কিছু ব্যালট পেপারে প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরের অভাব এবং কয়েকটি এলইডি স্ক্রিন বন্ধ থাকার বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ কয়েকটি সংগঠন অভিযোগ উত্থাপন করেছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান, আইটি, নতুন কলা, ব্যবসায় প্রশাসন এবং বিজ্ঞান অনুষদ ভবনে ১৫টি কেন্দ্রে ৬০টি নির্বাচনী কক্ষে ভোটগ্রহণ হয়। প্রতিটি কক্ষে পাঁচটি ব্যালট বক্স ছিল চাকসুর জন্য চারটি এবং হল সংসদের জন্য একটি। প্রতিটি কক্ষে ৫০০ জন ভোটার ভোট প্রদান করেছেন। সকাল সাড়ে ৮টায় ১৫টি কেন্দ্রে ব্যালট বক্স খুলে গণমাধ্যমকর্মী ও প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিতে সিলগালা করা হয়। হল সংসদের ফল ভোটকেন্দ্রে এবং কেন্দ্রীয় সংসদের ফল ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদে ঘোষণা করা হবে।
শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস : চাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। দীর্ঘদিন পর ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়ে শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল, তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পায়। গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী জয়নাব সাদিয়া বলেন, ‘ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের এমন উৎসাহ-উদ্দীপনা আগে কখনো দেখিনি। জীবনের প্রথম এমন পরিবেশে ভোট দিতে পেরে অসাধারণ লাগছে। চাকসু নির্বাচন শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ সমাজতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী প্রতীক সিকদার বলেন, ‘ছাত্র সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ নির্বাচনে অংশ নিতে পেরে আমরা আনন্দিত। আশা করি, আগামী বছরগুলোতে নির্বাচনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’ প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মনির উদ্দিন বলেন, ‘৩৫ বছর পর চাকসু নির্বাচন হয়েছে। ছোটখাটো কিছু ত্রুটি বাদে পুরো প্রক্রিয়া সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’
৭০ শতাংশ ভোট প্রদান : চাকসু, হল ও হোস্টেল সংসদ নির্বাচনে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৭০ শতাংশ ভোট প্রদান করা হয়েছে। তবে কোন কেন্দ্রে কত শতাংশ ভোট পড়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. কেএম আরিফুল হক সিদ্দিকী জানান, এবারের নির্বাচন ওএমআর পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভোট গণনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ১৪টি এলইডি স্ক্রিনের মাধ্যমে ফল প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়।
ছাত্রদলের অবস্থান : চাকসু নির্বাচনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতামত মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার জানিয়েছে ছাত্রদল। বুধবার রাত সাড়ে ৭টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় বলেন, ‘অমোচনীয় কালির অপ্রতুল ব্যবস্থা, জাল ভোট প্রদান এবং স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট পেপার প্রদানের মতো অনিয়ম আমরা লক্ষ করেছি। তবে শিক্ষার্থীরা কী চান, তার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। তাদের মতামতই আমরা মেনে নেব।’
বহিরাগতদের উপস্থিতি : নির্বাচন কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ছাত্রদল ও যুবদলের বহিরাগত নেতাকর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। ১ নম্বর রেলগেট এলাকায় রফিক ছাত্রাবাসের সামনে ২০-৩০টি মোটরসাইকেলসহ শতাধিক বহিরাগত অবস্থান করছিলেন। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের সদস্য সচিব শরিফুল ইসলাম তুহিন। সময়ে সময়ে স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের কর্মীরা মোটরসাইকেল ও গাড়িতে করে এলাকায় জড়ো হন।
স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট পেপারে ভোট : নির্বাচনে প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষরবিহীন ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। আইটি ভবন কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানান স্বতন্ত্র শিক্ষা সম্মিলনের সমাজসেবা ও পরিবেশবিষয়ক পদপ্রার্থী হাসিবুর রহমান রনি। তিনি বলেন, ‘আইটি ভবনের ২১৪ নম্বর কক্ষে ১০-১৫টি ব্যালট পেপার স্বাক্ষর ছাড়াই বাক্সে ফেলা হয়েছে।’ অভিযোগের বিষয়ে স্বীকার করে ওই কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার অধ্যাপক ড. হাসান খালেদ রউফ বলেন, ‘১২টি ব্যালটে এমন ঘটনা ঘটেছে। পোলিং এজেন্টদের অভিজ্ঞতার অভাবে এ ভুল হয়েছে।’
অমোচনীয় কালি নিয়ে অভিযোগ : ভোটারদের আঙুলে দেওয়া অমোচনীয় কালি মুছে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় ও ছাত্রশিবিরের ভিপি প্রার্থী ইব্রাহিম হোসেন রনি। বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় আইটি ভবন কেন্দ্রে ভোট প্রদানের পর তারা এ অভিযোগ করেন। সাজ্জাদ বলেন, ‘কালি মুছে যাওয়ায় পুনরায় ভোট প্রদানের আশঙ্কা রয়েছে।’ ইব্রাহিম বলেন, ‘প্রশাসন জানিয়েছিল, কয়েক দিনেও কালি মুছবে না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তা মুছে গেছে।’
একটি প্যানেলের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা : কারচুপির অভিযোগ এনে চাকসু নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ব ইনসানিয়াত বিপ্লব স্টুডেন্ট ফ্রন্ট সমর্থিত প্যানেল ‘রেভল্যুশন ফর স্টেট অব হিউম্যানিটি’। পুনরায় ভোটগ্রহণেরও দাবি করেছেন প্যানেলটির প্রার্থীরা। গত বুধবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে চাকসু ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে প্যানেলটির পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়।
প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী কেফায়েত উল্লাহ সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আজ (গতকাল) পুরো দিন পক্ষপাতমূলক আচরণ করেছে। আমরা যখনই বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছি, তখনই প্রশাসনের দায়সারা আচরণ দেখতে পেয়েছি।’
উত্তেজনা : ভোটগ্রহণ শেষে কলা অনুষদের সামনে এলইডি প্রজেক্টরের লাইন বিচ্ছিন্ন হওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন সালাম মিঠু জানান, নতুন কলা অনুষদের প্রজেক্টর ৩০ মিনিট বন্ধ ছিল। কর্মকর্তাদের বারবার বলার পরও তা ঠিক করা হয়নি। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি বাপ্পি বলেন, ‘ছাত্রদলের কিছু নেতাকর্মী ফ্যাকাল্টির তালা ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিরোধ করেন।’
হোস্টেল সংসদের ফল : শিল্পী আব্দুর রশিদ হোস্টেল সংসদের ফল ঘোষণা করা হয়েছে। ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী সাজ্জাদ হোসেন হৃদয় (৩৪ ভোট) এবং এজিএস প্রার্থী আইয়ুবুর রহমান তৌফিক (৩৮ ভোট) এগিয়ে রয়েছেন। ছাত্রশিবিরের ইব্রাহিম রনি ২৭ এবং বামপন্থি প্যানেলের ধ্রুব বড়–য়া ২৬ ভোট পেয়েছেন। জিএস পদে বামপন্থি প্যানেলের সুদর্শন চাকমা ২৯, ছাত্রশিবিরের সাঈদ বিন হাবিব ২৮ এবং ছাত্রদলের শাফায়েত হোসেন ১৪ ভোট পেয়েছেন।
