স্মৃতির মিনারে প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৪৮ এএম

প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান (রহ.) ছিলেন একাধারে ইসলামি আন্দোলনের অগ্রজ নেতা, তুখোড় রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সংগঠক, লেখক ও গবেষক। দ্বীনি শিক্ষার অগ্রগতি ও আদর্শ জাতি গঠনের নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে তার অবদান অবিস্মরণীয়। ধর্মদ্রোহী ও অপশক্তির বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ছিল বলিষ্ঠ। যার গর্জনে কেঁপে উঠত বাতিলের সিংহাসন। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। সভা-সমাবেশে তার বক্তব্যের ভাষা ছিল তেজোদীপ্ত।

ব্যক্তি হাবীবুর রহমান তিলে তিলে হয়ে উঠেছিলেন জনতার হাবীবুর রহমান হিসেবে। তার বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি যেখানেই বক্তব্য দিতেন সেখানেই লোকে-লোকারণ্য হয়ে যেত। এমনও দেখা যেত, তিনি কোনো ওয়াজ মাহফিল বা সমাবেশে গেছেন, যেখানে মানুষের সংখ্যা খুব কম ছিল, কিন্তু যখনই তিনি বক্তব্য শুরু করতেন, সঙ্গে সঙ্গে মানুষের উপস্থিতিতে সভা-সমাবেশ কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যেত। তার জানাজায়ও একই চিত্র ফুটে উঠেছিল।

তিনি ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথের এক বিপ্লবী জননেতা। সামনের কাতার থেকে তিনি নেতৃত্ব দিতেন। কারও রক্তচক্ষু পরোয়া করতেন না। সেই কারণেই তাকে বলা হতো রাজপথ কাঁপানো সিংহপুরুষ। যখনই কোনো বাতিল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠত, তখনই প্রিন্সিপাল হাবীবুর রহমান (রহ.) মাথায় পাগড়ি বেঁধে সৈনিকের বেশে রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তিনি অনেক চক্রান্তের শিকার হয়েছেন, আলোচিত-সমালোচিতও হয়েছেন বহুবার। আন্দোলন-সংগ্রামের কারণে একাধিকবার কারাবরণ করেছেন দ্বীনের এই রাহবার। সব বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে সাফল্য ছিনিয়ে আনতেন আপসহীন এই বিপ্লবী সিপাহসালার।

শাহজালালের পুণ্যভূমি সিলেটের পবিত্রতা রক্ষায় তিনি ছিলেন এক বীর সেনানি। শুধু সিলেট নয়, বাংলার ৫৬ হাজার বর্গমাইল পেরিয়ে বহির্বিশে^ও তার হুংকার বাতিলের মসনদ কাঁপিয়ে দিত। দ্বীনের খেদমতে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। ধর্মদ্রোহীদের আতঙ্ক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও এদেশ থেকে ধর্মদ্রোহীদের বিতাড়িত করব।’ এই লক্ষ্যে তিনি সাহাবা সৈনিক পরিষদের ব্যানারে সিলেটে অসংখ্য সভা-সমাবেশ ও তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলে দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্ব পর্যন্ত ধর্মদ্রোহীবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এ আন্দোলন-সংগ্রাম করে তিনি মুসলমানদের মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন।

জন্ম : জীবন পথের ক্লান্তিবিহীন এই বিপ্লবী বীর ১৯৪৫ সালে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ি ইউনিয়নের ঘনশ্যাম গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মাওলানা মাহমুদ আলী দীর্ঘদিন সিলেটের হাওয়াপাড়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন।

শিক্ষাজীবন : প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান (রহ.) ফুলবাড়ী ইউনিয়নের বইটিকর প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর কিছুদিন রুস্তুমপুর কওমি মাদ্রাসায় পড়ালেখা করে ইলমে দ্বীন শিক্ষায় অনুপ্রাণিত হন। এরপর ফুলবাড়ী আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৭০ সালে ফুলবাড়ী মাদ্রাসা থেকে ফাজিল পাস করেন। ১৯৭৩ সালে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে কামিল পাস করেন।

কর্ম জীবন : এ দেশের আলেম সমাজের অহংকার প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান (রহ.)-এর রয়েছে বর্ণাঢ্য এক কর্মময় জীবন। ১৯৭৩ সালে কাজির বাজার পেয়াজ হাটা মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭৪ সালের জুন মাসে সুরমা নদীর তীরে ঐতিহ্যবাহী জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। দারুল উলুম দেওবন্দের আদলে প্রতিষ্ঠিত জামেয়া মাদানিয়ার শিক্ষা পদ্ধতিতে মাদ্রাসার মূল সিলেবাসের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে সিলেবাস প্রণয়ন করে তিনি কওমি শিক্ষার ক্ষেত্রে যুগপৎ পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। তিনি কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতি আদায়ের আন্দোলনে শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.)-এর সঙ্গে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দেন। আমৃত্যু সিলেটের ঐত্যিবাহী জামেয়া মাদানিয়া কাজির বাজার মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। লেখালেখিতেও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি ‘বিশ্বনবীর ডায়েরী’ নামে একটি সিরাত গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি উন্নত চরিত্র ও ইমান জাগানিয়া বহু গ্রন্থ রচনা করেন। আলেম সমাজের মধ্য থেকে একদল যোগ্য লেখক তৈরি করা ছিল তার জীবনের অন্যতম সাধনা। সেই লক্ষ্যে তিনি মাদ্রাসায় মাসিক ও বার্ষিক ম্যাগাজিন বের করতেন। প্রবন্ধ রচনা, কবিতা ও সাহিত্যের প্রতি তিনি ছাত্রদের অনুপ্রাণিত করতেন।

রাজনৈতিক জীবন : প্রিন্সিপাল আল্লামা হবীবুর রহমান (রহ.)-এর রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত হয়েছিল জমিয়তে যুগদানের মাধ্যমে। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর সিলেট জেলা জমিয়তের সেক্রটারি জেনারেল ছিলেন। এরপর মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর (রহ.) কর্র্তৃক খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি তাতে যোগ দেন। পরবর্তী সময় শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস প্রতিষ্ঠা করলে তাতে যোগ দিয়ে তিনি শায়খুল হাদিসের সংস্পর্শে আসেন। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ খেলাফত মজসিলের আমির নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ.) মৃত্যুবরণ করার পর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির নিযুক্ত হন। শিক্ষা ও নেতৃত্বে তার অসামান্য কৃতিত্বের কারণে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে লন্ডনের ক্রাউন প্লাজায় এক ঐতিহাসিক সম্মেলনে আন্তর্জাতিক অ্যানুয়াল কমিউনিটি লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

মৃত্যু : মুসলিম জনতার হৃদয়ের স্পন্দন প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান (রহ.) ২০১৮ সালের ১৯ অক্টোবর রোজ শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তিনি স্ত্রী, চার ছেলে, তিন মেয়ে, অসংখ্য শিষ্য ও গুণগ্রাহী রেখে যান। ওই দিন বিকেল সাড়ে তিনটায় সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। তার জানাজায় ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনতার ঢল নামে। দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত, অনুসারী ও শিষ্যদেরকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার বাগানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন প্রিন্সিপাল আল্লামা হাবীবুর রহমান (রহ.)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। কীর্তিমান এই রাহবার মৃত্যুর পরও অমর হয়ে আছেন। মহান আল্লাহ তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও কলাম লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত