সমুদ্রের পানিকে বিদ্যুতে রূপান্তর করছে জাপান

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৩৬ এএম

বর্তমানে পৃথিবীর নানা প্রান্তে নবায়নযোগ্য বা পরিবেশবান্ধব শক্তির নতুন নতুন উৎস খোঁজা হচ্ছে। সে জায়গা থেকে জাপানের উদ্যোগটি একেবারে আলাদা। প্রথমবারের মতো ‘অসমোটিক বিদ্যুৎকেন্দ্র’ চালু করেছে দেশটি। এটি আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এমন এক কেন্দ্র, যেখানে মিঠা ও লবণাক্ত পানি মিলিত হয়ে যে প্রাকৃতিক শক্তি তৈরি করে তা ব্যবহার করেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট সø্যাশগিয়ার এক প্রতিবেদনে লিখেছে, জাপানের এই অসমোটিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কেবল প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য তৈরি কোনো ছোট আকারের পরীক্ষামূলক প্রকল্প নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ও বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা এশিয়ার প্রথম ও বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় অসমোটিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। অন্যটি রয়েছে ডেনমার্কে।

কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা জাপানের বিশাল সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর তুলনায় কম হলেও এ কেন্দ্রটি বছরে প্রায় ৮৮০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে।

এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম কাজ হবে সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার জন্য স্থানীয় লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা, যা ফুকুওকার মানুষদের বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করবে। এরপর বাকি বিদ্যুৎ প্রায় ২২০টি জাপানি পরিবারের এক বছরের বিদ্যুৎচাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট।

এ ধরনের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশেষত্ব হচ্ছে এর নির্ভরযোগ্যতা। বিভিন্ন নদী যেহেতু কখনো সমুদ্রে প্রবাহিত হওয়া বন্ধ হয় না, ফলে অসমোটিক শক্তিব্যবস্থাও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। দিন-রাত অবিরামভাবে চালানো যায় এই ব্যবস্থা।

প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকেই কাজে লাগিয়ে শক্তি উৎপাদনের এটি এক অসাধারণ ও বুদ্ধিদীপ্ত উপায়। তবে একে সত্যিকার অর্থে স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎসে পরিণত করতে এখনো কিছু উন্নয়নের প্রয়োজন।

এ প্রযুক্তির মূল ধারণাটি এসেছে প্রকৃতির সাধারণ এক প্রক্রিয়া ‘অসমোসিস’ থেকে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গাছ শেকড়ের মাধ্যমে মাটি থেকে পানি শোষণ করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কীভাবে কাজ করে তা বোঝার আগে দুটি ভিন্ন ধরনের পানির পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা জরুরি। যখন লবণাক্ত পানি ও মিঠাপানি একসঙ্গে প্রবাহিত হয় তখন লবণাক্ত পানিতে স্বাভাবিকভাবেই লবণের ঘনত্ব বেশি থাকে।

এ লবণমাত্রার পার্থক্যের কারণে এক ধরনের চাপ তৈরি হয়, যা দুদিকের পানিতে লবণের সমতা আনার চেষ্টা করে। আর এটা করতে গিয়ে মিঠাপানির বিভিন্ন অণু লবণাক্ত পানির দিকে প্রবাহিত হয়।

প্রকৌশলীরা যেভাবে জোয়ার-ভাটার পানির গতিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপায় বের করেছেন, একইভাবে এখানেও এক পাশ থেকে অন্য পাশে পানির এই প্রাকৃতিক গতিকে ব্যবহার করে শক্তি সংগ্রহ করছেন তারা।

অসমোটিক প্রক্রিয়াটি বড় পরিসরে প্রয়োগ হয়েছে ফুকুওকার এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে। এখানে এক পাশে রাখা হয় মিঠাপানি বা প্রক্রিয়াজাত বর্জ্যপানি এবং অন্য পাশে থাকে লবণাক্ত সমুদ্রের পানি। মাঝখানে থাকে বিশেষ এক ঝিল্লি, যা কেবল পানিকে এক দিক থেকে অন্য দিকে যেতে সাহায্য করে।

এ দুধরনের পানি যখন কাছাকাছি আসে তখন মিঠাপানি ধীরে ধীরে ঝিল্লি পেরিয়ে লবণাক্ত পাশে চলে যায়। ফলে লবণাক্ত দিকের পানিতে চাপ বেড়ে যায়। এ চাপকে ব্যবহার করে একটি টারবাইন ঘোরানো হয়, যা থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়। আর এ জন্য কোনো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়াতে বা কোনো ক্ষতিকর বর্জ্য তৈরি হয় না।

পুরো ব্যবস্থাটিকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে এতে লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট থেকে উৎপন্ন অতিরিক্ত ঘন লবণাক্ত পানি ব্যবহার করেছেন প্রকৌশলীরা, যাকে বলা হয় ‘কনসেন্ট্রেটেড ব্রাইন’। ফলে লবণমাত্রার পার্থক্য আরও বেশি হওয়ায় সিস্টেমের সক্ষমতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। এতে কেবল উৎপাদন বাড়ে না, বরং পুরো প্রক্রিয়াটিই আরও টেকসই ও চক্রাকার হয়ে ওঠে।

অসমোটিক সিস্টেমটি যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে তা আবার লবণমুক্তকরণ প্ল্যান্ট চালাতে ব্যবহৃত হয়। সেই প্ল্যান্ট থেকেই আসে লবণাক্ত পানি। এভাবে একে অপরকে সহযোগিতা করে এক স্বনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব শক্তি চক্র তৈরি হয়েছে জাপানে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত