রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে দুপক্ষের সংঘর্ষে ককটেল বিস্ফোরণে এক তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। তার নাম মোহাম্মদ জাহিদ (২০)। গত বুধবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে এ ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক ভোর পৌনে ৫টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত জাহিদ জেনেভা ক্যাম্পের মৃত ইরানের ছেলে। পাঁচ বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। পরিবারের দাবি, জাহিদ পেশায় মোবাইল মেকানিক। তবে একটি সূত্র বলছে, জাহিদ অপরাধী চক্রের হোতা বুনিয়া সোহেলের খুব কাছের লোক। এই গ্রুপের প্রভাবশালীদের একজন ছিলেন জাহিদ। সোহেলের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তিনি বিভিন্ন ভাড়াটে সন্ত্রাসী এনে ক্যাম্পের সংঘর্ষে ব্যবহার করতেন। এর ধারাবাহিকতায় ওই রাতেও সংঘর্ষে জড়িয়েছিলেন তিনি।
পুলিশ এবং স্থানীয় সূত্র বলছে, মাদক কারবারের আধিপত্য নিয়ে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের পরিস্থিতি এখন সবচেয়ে খারাপ। কয়েক দিন ধরেই ক্যাম্পে উত্তেজনা চলছিল এবং বুনিয়া সোহেল এবং চুয়া সেলিম গ্রুপের মধ্যে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হচ্ছিল। বুধবার রাতে সংঘর্ষ ব্যাপক আকার ধারণ করলে ককটেলবাজি শুরু হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে ককটেল বিস্ফোরণে আহত হয়ে প্রাণ যায় জাহিদের। তবে সংঘর্ষে তার ভূমিকা কী ছিল এবং কীভাবে তার মৃত্যু হয়, তা নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিহতের ভগ্নিপতি রবিন হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ‘জাহিদ কল্যাণপুর মিজান টাওয়ারে আমার দোকানে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করত। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে আজানের আগে জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে দুপক্ষের মধ্যে মারামারি চলছিল। ওই সময় জাহিদ বাসা থেকে বের হয়ে এগিয়ে গেলে একটি বোমা এসে তার মাথায় পড়ে। এতে সে গুরুতর আহত হয়। পরে সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় ট্রমা সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাখা না হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।’
গতকাল সরেজমিনে জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ক্যাম্পের আশপাশে বসবাস করা লোকজন আতঙ্কিত অবস্থায় রয়েছে। মুখ খুলতেও ভয় পাচ্ছিল। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ‘এখানে গোলাগুলি, বোমাবাজি সাধারণ বিষয় হয়ে গেছে। সমস্যা হয়েছে যারা ক্যাম্পে সাধারণ এবং স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করে তাদের জন্য। সবাই তো মাদক কারবারি নয়। অন্য অনেক পেশার মানুষ এখানে বাস করে। তারা সবসময় আতঙ্কে থাকে।’
সূত্র বলছে, গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর প্রায় প্রতিদিনই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। আধিপত্য নিয়ে দ্বন্দ্বে ওই ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি চুয়া সেলিম, আকরাম ও শাহ আলমের নেতৃত্বে আরেক শীর্ষ মাদক কারবারি সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেলের গ্রুপের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে। এতে থানা থেকে লুট করে নেওয়া অস্ত্র ও দুই মাদক কারবারি গ্রুপের কাছে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের ওপর হামলা করছে।
গতকাল সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুর থানার ওসি কাজী মো. রফিকুল আহমেদ বলেন, ‘জাহিদের নিহত হওয়ার ঘটনায় তার পরিবার এখনো মামলা করতে আসেনি। আমরা প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছি। এখন আমরা নানা ধরনের তথ্য পাচ্ছি, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ক্যাম্পে আমাদের অভিযান চলছে। পরে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।’
গত বুধবার দিনব্যাপী মোহাম্মদপুর থানাধীন বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে থানা-পুলিশ। বিশেষ অভিযানে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে নিয়মিত মামলার আসামি ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত অপরাধী। তারা হলেন নাজমা (২৫), সুমি আক্তার শিল্পী (২২), মোবারক (৪০), হাফিজুল (২৭), টিপু (৩০), আশিক (৩০), শ্রাবণ শাওন (২৫), তৈমুর আরিফ (৩৮), রাসেল (২৪), আবদুল করিম (২২), বিল্লাল (৩২), মনির (৩০) ও হান্নান ইমরান (২০)।
