শর্ত পূরণ না করেই ‘আবেগী’ সিদ্ধান্ত

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:৪৫ এএম

‘আবেগে’ ঘোষণা দিয়ে বিপাকে পড়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। কোনো প্রস্ততি ছাড়াই কক্সবাজার বিমানবন্দরকে ‘আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ ঘোষণা দিয়েছে তারা। এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে দেশ-বিদেশে। একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে হলে যে ধরনের প্রযুক্তি থাকা দরকার তার ধারে-কাছেই নেই সেখানে। সার্টিফিকেট, রানওয়েতে প্রযুক্তি ব্যবহার, টার্মিনাল ভবন তৈরি, অধিগ্রহণ জমি দখলে নেওয়াসহ অন্তত ১০টি শর্তই পূরণ করতে পারেনি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই সংস্থাটি। এসব সমস্যার মধ্যেই হঠাৎ ‘আন্তর্জাতিক’ ঘোষণা করায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েছে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টরা। ঘোষণার পর মন্ত্রণালয় ও বেবিচক কর্তারা একাধিকবার কক্সকবাজার সরেজমিনে গিয়ে বিরূপ প্রতিবেদন তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর বদল হয়েছে সিদ্ধান্ত।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, প্রস্তুতি ছাড়াই ঘোষণা করায় ক্ষেপেছেন সরকারের হাইকমান্ড। বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারকরা গত বৃহস্পতিবার জরুরি বৈঠক করেছেন। বৈঠকের সারমর্ম হাইকমান্ডকে অবহিত করেছে। পরে তাদের নির্দেশে ওইদিনই রাতে ‘স্থগিত’ ঘোষণা করা হয়। স্থগিত হওয়ার বার্তায় বলা হয়েছে, শর্তপূরণ না হওয়া ও বিদেশি এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চলাচলে সাড়া না দেওয়ায় মূলত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা থেকে সরে আসতে হয়েছে। বেবিচকের কিছু কর্মকর্তার অদক্ষতা ও গাফিলতিকেও দায়ী করা হয়েছে। ঘোষণার আগে বেবিচককে একাধিক শর্ত দিয়েছিল মন্ত্রণালয়। ওই সময় বেবিচক বলেছিল, শর্তগুলো তারা পূরণ করেছে। যেকোনো সময় আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করা সম্ভব হবে। কিন্তু ঘোষণার পর দেখা গেছে, কোনো শর্তই পূরণ হয়নি। উল্টো জটিলতা তৈরি হয়েছে। শর্তগুলো হচ্ছে বিমানবন্দরের সব সুবিধা, যন্ত্রপাতি, সেবা ও প্রক্রিয়া দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিমানবন্দর ম্যানুয়াল এবং প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক মান মেনে চলা বাধ্যতামূলক, বিমানবন্দর ম্যানুয়ালের একটি হালনাগাদ কপি সর্বদা পরিচালকের (এয়ারড্রোম স্ট্যান্ডার্ড) কাছে জমা রাখতে হবে, বিমানবন্দরের ভৌত অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলে তা সঙ্গে সঙ্গে বিমান তথ্য প্রকাশনায় (এআইপি) হালনাগাদ করতে হবে, বিমানবন্দর পরিচালনা অবশ্যই বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা সদস্যের (ফ্লাইট সেফটি অ্যান্ড রেগুলেশন) অনুমোদিত মানক পরিচালন পদ্ধতি অনুযায়ী করতে হবে, ড্রেনেজ ব্যবস্থা কংক্রিট সø্যাব দিয়ে ঢেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকির তথ্য এআইপিতে প্রকাশ করতে হবে, একই সঙ্গে ভারী বৃষ্টি বা পশ্চিম দিক থেকে প্রবল বাতাসের সময় রানওয়েতে অবতরণ ও উড্ডয়ন এড়িয়ে চলতে হবে। টার্মিনাল ভবনের কাজ শেষ করে দ্রুত নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, জমি অধিগ্রহণ করে সেগুলো বুঝে নিয়ে প্রাচীর নির্মাণ করতে বলা হয়েছিল।

বেবিচক সূত্র জানায়, টার্মিনাল ভবনের ছাদ দেওয়া, সীমানা মেরামত, ঝিনুক মার্কেট সরানোসহ আনুষঙ্গিক কাজ বাকি রয়েছে অন্তত ২০ ভাগের বেশি। চলতি বছরের মধ্যে কক্সবাজার বিমানবন্দরের ফ্লাইট চলাচল করা নিয়েও এখন তৈরি হয়েছে সংশয়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ঘাটতি, রানওয়ের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের অভাবও দেখা দিয়েছে। বিশাল বাজেটে নির্মিত টার্মিনাল ভবনটির কাজ অর্ধেকও হয়নি। যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা, লাগেজ ব্যবস্থাপনা, অভ্যর্থনা এবং অন্যান্য জরুরি কার্যক্রম এখনো পুরনো টার্মিনাল ভবনের সীমিত পরিসরেই পরিচালিত হচ্ছে। লাগেজ হ্যান্ডলিং, ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা চেকিং সিস্টেম এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। এখনো পর্যন্ত কোনো দেশি বা বিদেশি এয়ারলাইনস কক্সবাজার থেকে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনায় আগ্রহ দেখায়নি। এর পেছনে রয়েছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও যাত্রীসুবিধার অভাব। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে একাধিকবার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে, কক্সবাজার থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট শিগগিরই চালু হবে, কিন্তু বাস্তবে কোনো এয়ারলাইনসই সেই ঝুঁকি নিতে রাজি হয়নি। একটি এয়ারলাইনসের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার মতো পরিবেশ নেই। নিরাপত্তা দুর্বল, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা অপ্রতুল। বেবিচকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যে পরিমাণ অর্থ এই বিমানবন্দর উন্নয়নে ব্যয় করা হয়েছে, তার তুলনায় বাস্তব অগ্রগতি হতাশাজনক।’ তিনি বলেন, ‘এরোড্রোম সার্টিফিকেট’ পাওয়া মানে বিমানবন্দরকে নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পরিচালন মানে উত্তীর্ণ হতে হয়। কক্সবাজারে সেই মান অর্জনের ন্যূনতম শর্তপূরণ হয়নি।

বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপান্তরিত করতে গত কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা চালিয়ে আসছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তোড়জোড় শুরু করে। গত ১৪ মাস ধরেও কয়েক দফা চেষ্টা চালানো হয়। সরকারের নীতিনির্ধারকরাও চাচ্ছেন দ্রুত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু করতে। এরই মধ্যে মন্ত্রণালয় ও বেবিচকের কর্তা-ব্যক্তিরা দফায় দফায় সরেজমিনে যান কক্সবাজারে। কিন্তু অবকাঠামো জটিলতার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ফ্লাইট চলাচলে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বেবিচক চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত দুই বছর মেয়াদি অনুমতি সনদ (এরোড্রোম সার্টিফিকেট) বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দিলেও ঘাটতি রয়েছে। চলতি মাসেই ফ্লাইট উদ্বোধন করার কথা ছিল, এখন কবে হবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরের অনুকূলে বন্দোবস্তকৃত ভূমি থেকে পুরনো ঝিনুক মার্কেটে ১৪টি দোকান ও বস্তিসহ ৪২ পরিবার অপসারণ করা হয়নি এখনো। ৪.৫৬ একর জমিতে স্থিত গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্থাপনা অপসারণ না হওয়ায় জমিটি অধিগ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকার অভ্যন্তরে সেনাবাহিনী কর্তৃক দাবিকৃত ৬.৫৭ একর জমির মধ্যে ৪.৬৪ একর ভূমিতে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের বাধা প্রধান করায় ফায়ার স্টেশন ভবন, ড্রেনেজ, পেরিফেরিয়াল রোড ও সিকিউরিটি বাউন্ডারি ওয়াল ইত্যাদি নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক ঘোষণা করতে আইকাও’র কিছু গাইডলাইন মানতে হয়। আমরা আবেগ দিয়েই ঘোষণা দিয়ে ফেলেছি। ২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মেয়াদে কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজ শুরু হয়। এরপর ২০১৫ সালে যোগ হয় আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার নতুন ধাপ। ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে কক্সবাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। এজন্য সাগরপাড়ের এই বিমানবন্দরকে পর্যটক ছাড়াও যেকোনো ফ্লাইটের রি-ফুয়েলিংয়ের জন্য টেকনিক্যাল ল্যান্ডিংয়ের লক্ষ্যে আঞ্চলিক হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চাচ্ছে সরকার। বিমানবন্দরের বর্তমান ৯ হাজার ফুট দীর্ঘ রানওয়েকে মহেশখালী চ্যানেলের দিকে আরও ১ হাজার ৭০০ ফিট সম্প্রসারিত করে ১০ হাজার ৭০০ ফিটে উন্নীত করা হয়। সম্প্রসারিত হতে যাওয়া ১ হাজার ৭০০ ফিট রানওয়ের ১ হাজার ৩০০ ফিটই থাকবে সাগরের পানির মধ্যে। দেশে এই প্রথমবারের মতো সমুদ্রের ভেতরে ব্লক তৈরি করে রানওয়ে সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের পর কক্সবাজার হবে চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হোটেল মালিকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর চালু হলে কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে বিপ্লব ঘটত। কিন্তু দেরি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে তা এখন শুধু স্বপ্নই থেকে গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত