ব্যবসায়ীদের ‘কৌশলী’ আন্দোলন

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ০৭:৪১ এএম

চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত ট্যারিফ ইস্যুতে ব্যবসায়ীরা কৌশলী আন্দোলন করছে। সাত দিনের মধ্যে ট্যারিফ ইস্যুতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করা না হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার আলটিমেটাম দিয়েছিল পোর্ট ইউজার্স ফোরাম। সেই ৭ দিন শেষ হয়ে ১১ দিন পার হলেও নতুন কোনো কর্মসূচি দেয়নি। আজ বুধবার কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। আবার শনিবারে চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন। তাহলে কী চেম্বার নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের আন্দোলন?

এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি ও চিটাগাং চেম্বারের সাবেক প্রেসিডেন্ট আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত শুক্রবার আমাদের আলটিমেটাম শেষ হলেও চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত ট্যারিফ নিয়ে আমরা আগামীকাল (বুধবার) নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেব।’

নতুন কি ঘোষণা আসতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখনই তা বলা যাচ্ছে না। তবে ট্যারিফ ইস্যুতে বন্দর কর্তৃপক্ষ নমনীয়তা দেখিয়েছে আমরা তা পজিটিভ দেখছি। ইতিমধ্যে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, প্রাইমমুভার ও লরি বন্দরে প্রবেশের ক্ষেত্রে বর্ধিত  গেট ফি স্থগিত করেছে। এতে পরিবহন ধর্মঘট উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। অপরদিকে কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনেরও দাবি দাওয়া মেনে নিয়ে আগের মতো করা হবে বন্দরের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়ায় তারা প্রতিদিন চার ঘণ্টা করে কর্মবিরতির যে কর্মসূচি দেওয়া হয়েছিল তাও উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে দ্বিতীয় দিন থেকে।’

আপনাদের দাবি ছিল আপনাদের (ব্যবসায়ীদের) সঙ্গে আলোচনা করে বর্ধিত ট্যারিফ ইস্যুর বিষয়টি সমাধান করতে হবে। আলোচনার কোনো প্রস্তাব পেয়েছেন কি? এই প্রশ্নের জবাবে আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করা যাবে না। কাল (বুধবার) নতুন কর্মসূচির সময় তা জানানো হবে।

এদিকে আগামী ১ নভেম্বর চিটাগাং চেম্বারের নির্বাচন। চট্টগ্রাম বন্দরের বর্ধিত ট্যারিফ ইস্যুতে পোর্ট ইউজার্স ফোরামের পক্ষে যিনি সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন অর্থাৎ ট্যারিফ আন্দোলনকে একটি প্ল্যাটফর্মে এনেছেন তিনি চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক ও সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক। এবারের নির্বাচনে তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকের ধারণা চেম্বার নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনতে আমিরুল হক ট্যারিফ ইস্যু বেছে নিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমিরুল হক বলেন, ট্যারিফ একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা বর্ধিত ট্যারিফের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু আমরা বলতে চেয়েছি, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে তা বাড়ানো হোক। কিছু এখন বাড়ানো হলে বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হোক। আর এই ইস্যুতে ব্যবসায়ীদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনতে আমি কাজ করেছি।

 চেম্বার নির্বাচনকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম কি এটা? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ট্যারিফ ইস্যুতে আমরা একটি সংবাদ সম্মেলন ও অপরটি  একটি প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি। কোথাও কিন্তু চেম্বার নির্বাচনের কথা বলা হয়নি। দেশবাসীর স্বার্থে ট্যারিফ নিয়ে কথা বলেছি। কারণ বর্ধিত এই ট্যারিফ কিন্তু ভোক্তার ওপরে গিয়েই পড়বে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য : বর্ধিত ট্যারিফ নিয়ে গত ১৮ অক্টোবর ৭ দিনের আলটিমেটাম ঘোষণা দিয়েছিল পোর্ট ইউজার্স ফোরাম। সেই ঘোষণায় ১৫ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া বর্ধিত ট্যারিফ স্থগিত ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ৭ দিনের মধ্যে আলোচনা না করা হলে বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে ১৫ অক্টোবর থেকে চলমান পরিবহন ধর্মঘট অব্যাহত থাকবে এবং কাস্টমসের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন রবিবার থেকে প্রতিদিন চার ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করবে। কিন্তু রবিবারে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের সমন্বয় সভায় যানবাহন প্রবেশে বর্ধিত ফি প্রত্যাহারের আশ্বাস পেয়ে পরিবহন ধর্মঘট উঠিয়ে নেওয়া হয়ে এবং একইভাবে সোমবার থেকে কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনও তাদের কর্মবিরতি উঠিয়ে নেয়। এখন পোর্ট ইউজার্স ফোরামের আলটিমেটাম ও নতুন কর্মসূচি বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অবস্থান কী হতে পারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ পার্সোনেল অফিসার মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘৩৯ বছর পর ট্যারিফ বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত এই ট্যারিফ মন্ত্রণালয়ের আদেশে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। তাই এটা স্থগিত বা বন্ধ করার এখতিয়ার মন্ত্রণালয়ের, এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু করার নেই। তারপরও এটা কার্যকর করতে গিয়ে কোথাও যদি কোনো সমস্যা হয়, সেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রস্তাবনা পাঠাবে। এই আলোকে ইতিমধ্যে পরিবহন মালিক শ্রমিকদের এবং কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের দুটি ইস্যু আমলে নিয়ে স্থগিতের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এগুলো ছাড়াও যদি অন্যান্য ক্ষেত্রে মেজর কোনো সমস্যা হয়, তখন তা নিশ্চয় বিবেচনা করা হবে। কিন্তু ঢালাওভাবে পুরো ট্যারিফ স্থগিত করার কোনো সুযোগ নেই।’

যেভাবে অনুমোদন পেয়েছিল বর্ধিত ট্যারিফ

চট্টগ্রাম বন্দরে ট্যারিফ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বন্দরের কনসালট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছে স্পেনের প্রতিষ্ঠান আইডম। সংস্থাটি এশিয়ার ১০টিসহ বিশে^র ১৭টি আন্তর্জাতিক বন্দরের কার্যক্রম এবং ট্যারিফ পর্যালোচনা করেই চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ নির্ধারণ করে। ২০২২ সালের ২৭ এপ্রিল এই ট্যারিফ নিয়ে বন্দর ব্যবহারকারীদের ওয়ার্কশপও হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে কয়েক দফা মিটিংয়ের পর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গত জুনে ট্যারিফ বাড়ানোর প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। প্রস্তাবিত ট্যারিফ নৌ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর গত ২৪ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয় অনুমোদন করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তা গেজেট আকারে প্রকাশের পর কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। একই ধারাবাহিকতায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের আগে বন্দর ব্যবহারকারীদের নিয়ে গত ২৫ আগস্ট নৌ মন্ত্রণালয়ে একটি সভা হয়েছিল। সেই সভার পর গত ১৪ সেপ্টেম্বর গেজেট আকারে ট্যারিফ প্রকাশিত হলো। গেজেটে বলা হয়েছেএই ট্যারিফ ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। পরে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে নৌ উপদেষ্টা তা একমাস পিছিয়ে দেন। সে হিসেবে ১৫ অক্টোবর থেকে তা কার্যকর শুরু হয়।

বর্ধিত ট্যারিফ নিয়ে হাইকোর্টের রুল জারি

চট্টগ্রাম বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধির বৈধতা নিয়ে গত ২২ অক্টোবর রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তির নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে। বাংলাদেশ কনটেইনার শিপিং অ্যাসোসিয়েশনের দায়েরকৃত রিট আমলে নিয়ে বিচারপতি কাজী জিনাত হক এবং বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রুল জারি করেছে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ হ্যান্ডলিং করে। এই বন্দর দিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার কনটেইনার এবং ১৩ কোটি টন কার্গো পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত