শিগগির ডিজিটাল ব্যাংকিং মানুষের নাগালে আসবে

আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০২৫, ১০:৪৭ এএম

দেশ রূপান্তর : যুগের প্রয়োজনে প্রায় সব ব্যাংকই তাদের সেবাগুলোকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করেছে। সত্যিকার অর্থে কতটা ডিজিটাল হলো ব্যাংকিং সেবা?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : এটি আসলে একটি সীমাহীন এবং ক্রমাগত চলমান প্রক্রিয়া। আমরা যদি একটু পেছনের দিকে তাকাই, দেখব ৯০-এর দশকে এটিএম ও কার্ডের মাধ্যমে এদেশে প্রথম অল্টারনেট ডেলিভারি চ্যানেল প্রবর্তিত হয়।

এরপর বিভিন্ন ধাপে সত্যিকার ডিজিটাল ব্যাংকিং শুরু হলো ইন্টারনেট ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে ২০০০ সালের পর। ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা এমন একটি সেবা যার মাধ্যমে যে কোনো পেমেন্টের ক্ষেত্রে, টাকা প্রদানের পরিবর্তে গ্রাহক নিজেই তার হিসাব থেকে বেনিফিশিয়ারি অ্যাকাউন্টে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিট তথা ব্যালেন্স ট্রান্সফারের মাধ্যমে করেন।

এর প্রসারের ফলে আজ একজন সাধারণ গ্রাহক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত প্রায় সব প্রয়োজন শাখায় না গিয়েই সম্পাদন করতে পারেন। সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট হতে বা ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে মোবাইল ওয়ালেটে, কার্ড অথবা ভার্চুয়াল কার্ডে ডিজিটাল মানি ডিপোজিট করে তা হতে, গ্রাহক এখন অগণিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়েতে এক্সেস করছে যা দেশকে ক্যাশলেস ইকোনমিতে রূপান্তরিত করছে। সুতরাং সক্ষমতা অর্জন হয়েছে, ব্যাপ্তিটা বাড়ানো দরকার। এক্ষেত্রে আমরা চায়নাকে ফলো করতে পারি। চীন এখন ডিজিটালাইজেশনের ক্ষেত্রে যেখানে পৌঁছেছে সেটাই আমরা নেক্সট পাঁচ বছরের টার্গেট হিসাবে ধরতে পারি। ক্রসবর্ডার পেমেন্টের জন্য আরও উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এআই ও ব্লকচেইনের ব্যবহার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা বাংলাদেশে আর্থিক লেনদেন সহজ করে দিয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আপনারা কী ধরনের সেবা দিচ্ছেন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : আমরা এক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহক ও করপোরেট গ্রাহকদের জন্য অ্যাপ ভিত্তিক ও ইন্টেরনেট ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছি। একটি অত্যাধুনিক ব্যাংকিং অ্যাপ যে ধরনের সেবা দিয়ে থাকে আমাদের তৈরি শাহ্জালাল টাচপে ও সিপিএম একই ধরনের সেবা দিচ্ছে যেমন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে অ্যাপ ব্যবহার করে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা, অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স চেক, স্টেটমেন্ট ডাউনলোড ও প্রিন্টিং, ফান্ড ট্রান্সফার, ইউটিলিটি বিল পেমেন্ট, যেকোনো ব্যাংকের কার্ড বিল পেমেন্ট, করপোরেট গ্রাহকদের ফান্ড ট্রান্সফারের মাধ্যমে ব্যাচ (স্যালারি) অ্যাকাউন্ট পেমেন্ট ইত্যাদি। এমনকি প্রবাসীদের পাঠানো বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রাপকের ব্যাংক ও ওয়ালেট অ্যাকাউন্টে রিয়েলটাইম (এনপিএসবি) জমা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্যই হচ্ছে ব্যাংকের ট্রেড ফাইন্যান্স, ইনভেস্টমেন্টসহ সব ব্যাংকিং কার্যক্রমকেই অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসা যা ভবিষ্যতে সরকারের ক্যাশলেস সোসাইটি বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে।

দেশ রূপান্তর : অনলাইন ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রায়ই সতর্কতা জারি করা হয়। আপনার ব্যাংকে অনলাইন লেনদেনে গ্রাহকদের নিরাপত্তা কেমন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : অনলাইন লেনদেন যেহেতু অগণিত হ্যাকার সমৃদ্ধ একটি ইন্টারনেট হাইওয়ের মাধ্যমে গ্রাহকের ব্যালেন্স ট্রান্সফার হয়, তাই এটির সুরক্ষায় আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকি। তবে ওটিপি, পিন, সিভিভি নাম্বার শেয়ার না করা অযাচিত বা সন্দেহজনক কলের নির্দেশনা অনুসরণ না করা বা লিংকে ক্লিক না করা এসব বিষয়ে আমরাও নিয়মিত সতর্কতা জারি করি। কারণ আমাদের দেশে এটি দেখা গিয়েছে, অধিকাংশ জালিয়াতি হয় গ্রাহকের অসচেতনতার ফলে।

ফিজিক্যাল মানি সুরক্ষায় যেমন অত্যাধুনিক ভল্ট, ২৪/৭ গানম্যান, সিসিটিভি, সিকিউরিটি গার্ড দরকার তেমনি আমরা গ্রাহকের ডিজিটাল মানি বা ডেটা সুরক্ষায় সব প্রচলিত অত্যাধুনিক স্টেট অব দা আর্ট টেকনোলজি ব্যবহার করি। উদাহরণ স্বরূপ, আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন থ্রি-টায়ার ডেটা সেন্টার, ব্যাকআপ টেকনোলজি, ফায়ারওয়াল, ওয়াফ, লেয়ার-সেভেন সিকিউরিটি, মাল্টি ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, অ্যাপে অটোলক অপশন, এনক্রিপশন টেকনোলজি ইত্যাদি। পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ যেমন আইএসও ২৭০০১, পিসিআইডিএসএস ইত্যাদি। 

দেশ রূপান্তর : ব্যাংকের কত শতাংশ গ্রাহক এখন ডিজিটাল সেবা পাচ্ছেন? বাংলাদেশে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ কেমন?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : বর্তমানে আমাদের ব্যাংকের প্রায় ৬০ শতাংশ গ্রাহক ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত। বাংলাদেশে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত উজ্জ্বল। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের হার দ্রুত বৃদ্ধি, বিভিন্ন সরকারি উদ্যোগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যাশলেস অর্থনীতির নীতিমালা- সবই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করছে। আশা করা যায়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের নাগালে চলে আসবে।

দেশ রূপান্তর : এখন প্রায় সব ব্যাংকেরই ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। আপনাদের ব্যাংকে কার্ডধারীর সংখ্যা কত? ভবিষ্যতে ভার্চুয়াল কার্ড আনার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : বর্তমানে আমাদের ব্যাংকের ডেবিট কার্ডধারীর সংখ্যা প্রায় চার লাখ বিশ হাজার ও ক্রেডিট কার্ডধারীর সংখ্যা প্রায় তেইশ হাজার ।

আমরা অচিরেই গ্রাহকদের সুবিধার্থে ভার্চুয়াল কার্ড সেবা বাজারে আনব। এটা নিয়ে ব্যাংক কাজ করছে। এই সেবা চালু হলে গ্রাহকরা মোবাইল অ্যাপ থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে ভার্চুয়াল কার্ড তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।

দেশ রূপান্তর : কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্যাশলেস বা নগদবিহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে বাংলা কিউআর কোড। কতটা এগিয়েছে এই কার্যক্রম?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : বাংলা কিউআর কোড এখন বাংলাদেশের প্রায় সব বড় শহরে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমাদের ব্যাংকও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলা কিউআর পেমেন্ট সিস্টেম বাস্তবায়ন করেছে। এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্টে সম্পৃক্ত করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে এবং ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ গঠনে একটি মাইলফলক হয়ে উঠেছে।

দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল লেনদেন নিরাপদ রাখতে গ্রাহকদের করণীয় কী?

মোসলেহ্ উদ্দীন আহমেদ : ডিজিটাল লেনদেন নিরাপদ রাখতে গ্রাহকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিছু মৌলিক সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি যেমন গ্রাহকরা: কখনো ওটিপি, পিন, সিভিভি বা পাসওয়ার্ড কারও সঙ্গে শেয়ার করবেন না; সন্দেহজনক লিংক বা ইমেইলে ক্লিক করবেন না; শুধুমাত্র অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করবেন; পাবলিক ওয়াইফাই ব্যবহার করা বা তা ব্যবহার করে লেনদেন করা থেকে বিরত থাকবেন; নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন; ডিভাইসে পাসওয়ার্ড অটোসেভ অপশন ব্যবহার করবেন না; মোবাইল ও কম্পিউটার অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যাংকিং বা অ্যাপস ব্যবহার করতে ব্যবহার্য ডিভাইসসমূহ অবশ্যই স্ক্রিন অটোলক করতে হবে; লগইনের ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক অপশন ব্যবহার করবেন; লেনদেনের ক্ষেত্রে নতুন বেনিফিশিয়ারি অ্যাড করলে ফান্ড ট্রান্সফারের সময় অল্প অ্যামাউন্ট ট্রান্সফারের মাধ্যমে ডেস্টিনেশন অ্যাকাউন্ট চেক করে নিশ্চিত হয়ে নিন; ডিভাইসে অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহারের মাধ্যমে সুরক্ষিত রেখে বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করতে পারেন; সন্দেহজনক লেনদেন দেখলে অবিলম্বে ব্যাংকের হেল্পলাইনে যোগাযোগ করবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত