দেশ রূপান্তর : যুগের প্রয়োজনে প্রায় সব ব্যাংকই তাদের সেবাগুলো ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করেছে। সত্যিকার অর্থে কতটা ডিজিটাল হলো ব্যাংকিং সেবা?
মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : ডিজিটাল ব্যাংকিং এখন আর কোনো বিকল্প নয় এটি আধুনিক আর্থিক সেবার মেরুদ-। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ইতিমধ্যেই আমাদের অধিকাংশ মূল কার্যক্রমকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করেছে। গ্রাহক এখন শাখায় না গিয়েই অ্যাকাউন্ট খোলা, অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধ, ঋণ আবেদন এবং স্টেটমেন্ট দেখা সবকিছুই করতে পারেন এক ক্লিকেই। আমরা ‘ব্রিক টু ব্রিক’ ব্যাংকিং মডেলে সফলভাবে রূপান্তরিত হয়েছি, যেখানে প্রযুক্তিই গ্রাহকসেবার মূল চালিকাশক্তি। আমাদের লক্ষ্য ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে গ্রাহকের সময়, নিরাপত্তা ও আস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া।
দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা বাংলাদেশে আর্থিক লেনদেন সহজ করে দিয়েছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আপনারা কী ধরনের সেবা দিচ্ছেন?
মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : আমরা বিসিবিএল ডিজিটাল ব্যাংকিং স্যুট চালু করেছি, যার মাধ্যমে গ্রাহকরা পাচ্ছেন ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল অ্যাপ (বিসিবি ই-ক্যাশ), বাংলা কিউআর লেনদেন, রিয়েল-টাইম ফান্ড ট্রান্সফার (বিইএফটিএন, আরটিজিএস, এনপিএসবি), অনলাইন বিল পেমেন্ট ও ই-স্টেটমেন্ট সুবিধা। সম্প্রতি আমরা ইকেওয়াইসি-ভিত্তিক অনলাইন অ্যাকাউন্ট ওপেনিং চালু করেছি, যা দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।
দেশ রূপান্তর : অনলাইন ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রায়ই সতর্কতা জারি করা হয়। আপনার ব্যাংকে অনলাইন লেনদেনে গ্রাহকদের নিরাপত্তা কেমন?
মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : গ্রাহক নিরাপত্তা আমাদের ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ক্ষেত্র। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সব অনলাইন সেবা মাল্টি-লেয়ার্ড সিকিউরিটি সিস্টেম, টু ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন এবং রিয়েল টাইম ফ্রড মনিটরিং দ্বারা সুরক্ষিত। প্রতিটি ট্রানজেকশন আমাদের সাইবার সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার (সিএসওসি) দ্বারা পর্যবেক্ষিত হয়, যা ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকে। এ ছাড়া গ্রাহকদের ডিজিটাল সুরক্ষা বিষয়ে সচেতন রাখতে নিয়মিতভাবে সিকিউরিটি অ্যালার্টস, অ্যাওয়ারনেস ক্যাম্পেইনস এবং ট্রেইনিং মেসেজ দেওয়া হয়। আমাদের লক্ষ্য একটাই যেন প্রতিটি অনলাইন লেনদেন হয় নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও নিশ্চিন্তা।
দেশ রূপান্তর : ব্যাংকের কত শতাংশ গ্রাহক এখন ডিজিটাল সেবা পাচ্ছেন? বাংলাদেশে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ কেমন?
মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : বর্তমানে আমাদের মোট গ্রাহকের প্রায় ৬৫ শতাংশ সক্রিয়ভাবে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করছেন এবং এই হার প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশে ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ ডিজিটাল।
আগামী দিনে এআই, বিগ ডেটা এবং ব্লকচেইন টেকনোলজির সমন্বয়ে ব্যাংকিং হবে আরও স্মার্ট, দ্রুত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আমাদের ভিশন একটি পেপারলেস, জেস ফ্রিকশনলেস ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি গ্রাহক নিজ হাতে নিজের ব্যাংক হয়ে উঠবেন।
দেশ রূপান্তর : এখন প্রায় সব ব্যাংকেরই ডেবিট কার্ড ও ক্রেডিট কার্ড রয়েছে। আপনাদের ব্যাংকে কার্ডধারীর সংখ্যা কত? ভবিষ্যতে ভার্চুয়াল কার্ড আনার কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না?
মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : বর্তমানে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের সক্রিয় ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডধারীর সংখ্যা দেড় লাখেরও বেশি এবং এই সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য শুধু কার্ড ইস্যু করা নয়, বরং গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ, স্মার্ট ও ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম তৈরি করা। আমরা ইতিমধ্যেই ভার্চুয়াল কার্ড সলিউশন প্রবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, যা গ্রাহকদের অনলাইন ও আন্তর্জাতিক ই-কমার্স লেনদেনে দেবে দ্রুততা, নিরাপত্তা ও সম্পূর্ণ ক্যাশলেস অভিজ্ঞতা। কমার্স ব্যাংকের ভবিষ্যৎ ভিশন হলো ‘ওয়ান কার্ড, ইনফিনিট অ্যাকসেস’, যেখানে প্রতিটি গ্রাহক প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও স্বাধীনভাবে নিজের আর্থিক জীবন পরিচালনা করতে পারবেন।
দেশ রূপান্তর : কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্যাশলেস বা নগদবিহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে বাংলা কিউআর কোড। কতটা এগিয়েছে এই কার্যক্রম?
মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : বাংলা কিউআর এখন দেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমের ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক বাংলা কিউআর মার্চেন্ট এনরোলমেন্ট প্রোগ্রাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা শিগগিরই এই সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করতে পারব আশা করছি, যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় করপোরেট পর্যন্ত সবাই সহজে কিউআরভিত্তিক লেনদেনে যুক্ত হতে পারেন। বাংলা কিউআর হবে আমাদের ক্যাশলেস অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি, যেখানে প্রতিটি মোবাইল ফোনই হয়ে উঠবে গ্রাহকের নিজস্ব ব্যাংক। আমাদের লক্ষ্য, প্রযুক্তির মাধ্যমে নগদবিহীন, দ্রুত ও নিরাপদ লেনদেন সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
দেশ রূপান্তর : ডিজিটাল লেনদেন নিরাপদ রাখতে গ্রাহকদের করণীয় কী?
মোহাম্মদ জিয়াউল করিম : গ্রাহকদের কিছু সহজ নিয়ম মেনে চললেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। যেমন : ওটিপি, পিন বা পাসওয়ার্ড কখনোই অন্যকে জানাবেন না; শুধু অফিশিয়াল অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন এবং সন্দেহজনক কল বা লিংক এলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকের হেল্পলাইনে জানান।
আমরা সবসময় বলি ‘ডিজিটাল সচেতনতা মানেই আর্থিক সুরক্ষা।’ বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে ডিজিটাল ব্যাংকিং মানেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আমরা চাই প্রতিটি গ্রাহক প্রযুক্তির শক্তিকে ব্যবহার করে নিরাপদ, দ্রুত ও স্বচ্ছ আর্থিক যাত্রায় অংশ নিক। বিসিবিএল-স্মার্ট ব্যাংকিং ফর স্মার্ট বাংলাদেশ।
