দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বছর থেকে মোবাইল অপারেটররা গ্রাহকের সিমের সব সøট ‘লক’ করে কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রি করতে পারবে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সাম্প্রতিক কমিশন সভায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে অপারেটররা বলছে, দেশের বহু মানুষ একসঙ্গে অনেক টাকা দিয়ে স্মার্টফোন কিনতে পারেন না, তাদের জন্য সুবিধা হবে। এতে স্মার্টফোনের ব্যবহারও বাড়বে। কেউ যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব টাকা দিতে না পারেন বা বের হয়ে যেতে চান, সে ক্ষেত্রে করণীয় কী হবে, তা সুস্পষ্ট করা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিম লকিং বা নেটওয়ার্ক লকিং হলো, কোনো অপারেটর থেকে কিস্তিতে স্মার্টফোন কেনার পর পুরো কিস্তি পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত সেই অপারেটরের সিম বা নেটওয়ার্ক ছাড়া অন্য সিম বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যাবে না।
সিম বা নেটওয়ার্ক লকিং ও ডিভাইস লকিং উভয় পদ্ধতিতে একসঙ্গে অথবা এককভাবে কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রি করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সিম লকিং বা নেটওয়ার্ক লকিং হলো যে অপারেটর থেকে কিস্তিতে স্মার্টফোন কেনা হবে, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেই অপারেটরের সিম বা নেটওয়ার্ক ছাড়া অন্য সিম বা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যাবে না।
মোবাইল ফোন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে কিস্তিতে স্মার্টফোন কেনা হলে টাকা শোধ না হওয়া পর্যন্ত ডিভাইসটি লক থাকে। সে ক্ষেত্রে ডিভাইসে অন্য সিম ব্যবহার করতে না পারা, বিক্রি করতে না পারাসহ বিভিন্ন শর্ত থাকে। এটা ডিভাইস লকিং হিসেবে পরিচিত।
গত ২৭ অক্টোবর বিটিআরসির ৩০০তম কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ নিয়ম কার্যকর হবে।
মোবাইল অপারেটররা এখন কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রি করছে। তবে সে ক্ষেত্রে স্মার্টফোনের সব সিম লক করতে পারে না তারা। বড় মোবাইল অপারেটররা দীর্ঘদিন ধরে সব সিম লকের বিধান চেয়ে আসছিল।
বিটিআরসি বলছে, স্মার্টফোনের সিমের সব সøট লক করার সুবিধা পাবে সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব বকেয়া পরিশোধসাপেক্ষে গ্রাহকের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো অপারেটরের সিম ব্যবহারের জন্য লক খুলে দিতে হবে।
মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ‘ডিভাইস লকিং’ অ্যাপসের মাধ্যমেও স্মার্টফোন কিস্তিতে বিক্রয় করা যাবে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।
নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি বলেছে, মোবাইল অপারেটররা স্মার্টফোন আমদানি, উৎপাদন ও সংযোজন করতে পারবে না। তবে তারা স্মার্টফোন উৎপাদনকারী বা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে। চুক্তির মাধ্যমে বিটিআরসি অনুমোদিত স্মার্টফোন তারা কিস্তিতে বিক্রি করতে পারবে।
স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ানোসহ তা সবার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে ২০২৩ সালে একটি সিম লক রেখে কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রির সিদ্ধান্ত দিয়েছিল বিটিআরসি। কিন্তু স্মার্টফোনের সব সিমই লক চেয়ে বিটিআরসির কাছে আবেদন করেছিল মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবি। এ দুই অপারেটরের যুক্তি ছিল, একটি সিম উন্মুক্ত রেখে কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রি তাদের জন্য সুবিধাজনক নয়।
তখন বাংলালিংক সব সিম লক করার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল। কারণ হিসেবে বাংলালিংক বলেছিল, স্মার্টফোন বিক্রিতে বড় অপারেটররা ভর্তুকি দেবে। আর এতে ছোট অপারেটররা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
চলতি বছর সেপ্টেম্বরে বাংলালিংক চিঠি দিয়ে বিটিআরসিকে জানায়, সিমের সব সøট লক রেখে কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রি নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। তবে তারা নিজেদের প্রস্তুতির জন্য সময় চায়। আগামী জানুয়ারি মাসে এ বিধান কার্যকরের অনুরোধ জানায় তারা।
বিটিআরসি চলতি বছর এপ্রিলে ডিভাইস লকিংয়ের মাধ্যমে স্মার্টফোন বিক্রির অনুমতি দেয়। স্মার্ট টেকনোলজি বাংলাদেশ লিমিটেড নামের মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নাইজেরিয়াভিত্তিক আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পামপের সঙ্গে যৌথভাবে ডিভাইস লকিংয়ের মাধ্যমে স্মার্টফোন বিক্রি শুরু করে। তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে বিটিআরসি জানায়, ডিভাইস লকিং চালুর পর স্মার্টফোন বিক্রি বেড়েছে ২৮ শতাংশ।
বিটিআরসির ধারণা, ডিভাইস লকিংয়ের পাশাপাশি সব সিম বা নেটওয়ার্ক লকিং সুবিধায় কিস্তিতে স্মার্টফোন বিক্রির অনুমোদন ব্যবহার আরও বাড়বে।
জাপানের মতো উন্নত দেশেও জনসাধারণের কিস্তিতে মোবাইল ফোন কেনার সুবিধা আছে। সে দেশে মোবাইল অপারেটররা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সিম লক রেখে কিস্তিতে ফোন বিক্রি করে। এমনকি ভারতেও এ সুবিধা আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ সুবিধা চালু করার দাবি দীর্ঘদিনের। একবার এ সুবিধা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েও হয়নি। শুধু ক্রেডিট কার্ডধারীরা কিস্তি সুবিধায় নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় মোবাইল ফোন কিনতে পারেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্মার্টফোন ব্যবহারে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। ব্যবহার বাড়াতে সবার জন্য কিস্তিতে মোবাইল ফোন কেনার সুবিধা চালু করা প্রয়োজন।
বছর দুই আগে সিম লক রেখে গ্রাহকের কাছে মোবাইল ফোন বিক্রি করতে পারবে, এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিটিআরসি। এতে শর্ত ছিল, মোবাইল ফোনের মধ্যে দুটি সিমের একটি লক রেখে বিক্রি করতে পারবে অপারেটররা। স্থানীয়ভাবে মোবাইল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে স্মার্টফোন কিনতে হবে। কিস্তির ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্ট হবে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত। কিস্তি হবে ৩ থেকে ১২ মাসমেয়াদি। স্মার্টফোনের দাম পরিশোধের পর লক করা সিমের সøটটি খুলে দিতে হবে। কিন্তু পরবর্তী সময় এ সুবিধা কার্যকর করা যায়নি।
মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক সংগঠন গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েশন (জিএসএমএ) গত বছরের অক্টোবরে ‘দ্য স্টেট অব মোবাইল ইন্টারনেট কানেকটিভিটি ২০২৪’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে শহরের ৪১ শতাংশ এবং গ্রামের ২৬ শতাংশ মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। যেখানে ভারতের শহরে ৫২ শতাংশ ও গ্রামের ৪০ শতাংশ এবং পাকিস্তানের শহরে ৪৬ শতাংশ ও গ্রামের ৩৬ শতাংশ মানুষের স্মার্টফোনের মালিকানা আছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের দাম দ্বিগুণ। শুল্ক-করের কারণে দাম বেড়ে যায়। আমদানি করা একটি স্মার্টফোনের ওপর প্রায় ৫৯ শতাংশ শুল্ক-কর দিতে হয়। আবার দেশে উৎপাদিত ফোনের ওপরও সব মিলিয়ে ৩০ শতাংশের বেশি শুল্ক ও কর দিতে হয়। এসব কারণে দেশে অবৈধ মোবাইল ফোনের বাজার বড় হয়ে গেছে।
