আগামী দিনের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই নগর এবং জনবসতি গড়ে তুলতে সারা বাংলাদেশের স্থানিক পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। সম্প্রতি উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত ‘স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ’ এ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে। নগর, গ্রামীণ এলাকা, হাওর-পাহাড়-চরাঞ্চলসহ সব অঞ্চলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা গেলে বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন সহজসাধ্য হবে।
গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) নাগরিক উৎসবে এসব কথা বলেন বক্তারা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের সঞ্চালনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম, জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. মাহমুদ আলী এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, ‘এসডিজি-১১ বাস্তবায়নে তাৎক্ষণিক ও অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা চিহ্নিত করা হয়েছে। আগামী এক বছরে যেসব কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব এবং ২০৩০ সালের মধ্যে যা বাস্তবায়নযোগ্য, তার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা হয়েছে।’ তিনি জানান, এসডিজি-১১-এর সঙ্গে এসডিজি-১ (দারিদ্র্য দূরীকরণ) ও এসডিজি-২ (ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব) ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। তাই সমান্তরালভাবে এ তিনটি লক্ষ্য বাস্তবায়ন জরুরি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের এসডিজি-১১ অর্জনের গতি এখনো ধীর। তবে সঠিক পরিকল্পনা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত ও অংশগ্রহণমূলক বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা ত্বরান্বিত করা সম্ভব। আবাসন উন্নয়ন, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন, নিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বায়ুমান উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সীমিত সম্পদকেও দৃশ্যমান উন্নয়নে রূপান্তর করা যায় যদি পরিকল্পনা হয় অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবায়ন হয় স্বচ্ছ।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এসডিজির মূল লক্ষ্যই দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং সবার জন্য নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন নিশ্চিত করা।’
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) কৃষিজমি ও জলাধার হিসেবে চিহ্নিত এলাকার বড় অংশই দখল-দূষণে হারিয়ে গেছে। ঢাকায় নতুন জনসংখ্যার চাপ কমাতে এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক আবাসন পরিকল্পনা প্রণয়নে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া কোনো উন্নয়ন প্রকল্প সফল হবে না।’
বিআইপি সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘বিগত বছরগুলোতে পরিকল্পনায় জনচাহিদা উপেক্ষিত হয়েছে; অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষায়। ফলাফল : পরিবেশ ধ্বংস, সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতি। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর অবশেষে ‘জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ’ প্রণয়ন হয়েছে এটি যুগান্তকারী। এখন থেকে কোনো মন্ত্রণালয় বা দপ্তর জাতীয় লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক প্রকল্প নিতে পারবে না।’
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, ‘এসডিজি-১১-এর সঙ্গে এসডিজি-১৬ (শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ) অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। গত দুই দশকে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না হলে এসডিজি অর্জন অসম্ভব।’
নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মাহমুদ আলী বলেন, ‘গত এক দশকে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান-২১০০, ১০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্র, জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা-২০২৫ প্রণয়ন করেছে। তবু নগরের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বস্তিতে বাস করে, যেখানে আবাসন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নাজুক। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নেচার-বেজড সলিউশন ও জলাধার সংরক্ষণে কাজ চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এটিই হবে পরিকল্পিত উন্নয়নের মূল ভিত্তি।’
জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা. ফেরদৌসী বেগম বলেন, ‘আগামী প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য শহর গড়তে পরিকল্পনা অপরিহার্য। ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণযোগ্য প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সমন্বয়। সব পেশাজীবী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে এসডিজি-১১ অর্জন সম্ভব।’
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইপি সহসভাপতি পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন, পরিকল্পনাবিদ ড. মো. শফিক-উর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ তামজিদুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান, বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ আবু নাইম সোহাগ, পরিকল্পনাবিদ উসওয়াতুন মাহেরা খুশি, পরিকল্পনাবিদ ফাহিম আবেদিন প্রমুখ।
