গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী খুব শিগগিরই মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে বিপর্যস্ত এই ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বর্তমানে মারাত্মক মানবিক সংকট চলছে। গতকাল শুক্রবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এ খবর জানিয়েছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার রাফাতে সুড়ঙ্গের ভেতর আটকে আছেন সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের প্রায় দেড় শতাধিক যোদ্ধা। গত মাসে দখলদার ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও তথাকথিত ‘হলুদ দাগ’-এর ভেতরে থাকায় এসব যোদ্ধা বের হতে পারেনি। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, হামাসের আটকে পড়া যোদ্ধাদের ছেড়ে দিতে ইসরায়েলকে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এদিকে, ‘হিজবুল্লাহকে’ লক্ষ্য করে লেবাননে আবারও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় শিগগিরই বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। এটিকে গাজার জন্য ট্রাম্পের যুদ্ধ-পরবর্তী শাসন পরিকল্পনার অংশ মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্প বলেন, গাজার পরিস্থিতি খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। অত্যন্ত শক্তিশালী কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে সম্মতি দিয়েছে, হামাসের সঙ্গে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তারা হস্তক্ষেপ করবে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এ সপ্তাহে গাজায় দুই বছরের জন্য একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন ও স্থিতিশীলতা বাহিনীর অনুমোদন নিয়ে আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে। এই বাহিনী মূলত নাগরিক সুরক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশ প্রশিক্ষণের দায়িত্বে থাকবে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেন, গাজায় যেকোনো স্থিতিশীলতা বাহিনীর অবশ্যই পূর্ণ আন্তর্জাতিক বৈধতা থাকতে হবে, যাতে তারা ফিলিস্তিনিদের সহায়তা করতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বৃহস্পতিবার নিরাপত্তা পরিষদের ১০টি নির্বাচিত সদস্য ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি অংশীদার দেশের কাছে প্রস্তাবের খসড়া পাঠিয়েছে। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ হাজার সদস্যের এই বাহিনীকে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হবে। এতে মিসর, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও তুরস্ক অংশ নিয়েছে বলে জানা গেছে।
গাজা উপত্যকার রাফাতে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রায় দেড়শ যোদ্ধা সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছেন। গত মাসে দখলদার ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও এসব যোদ্ধা বের হতে পারেনি। ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণাধীন রাফাতে আটকে থাকা যোদ্ধাদের ছেড়ে দিতে ইসরায়েলকে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মধ্যপ্রাচ্যের এক কূটনীতিক টাইমস অব ইসরায়েলকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এসব যোদ্ধার মাধ্যমে তার পাইলট প্রকল্প চালু করতে যান। যেখানে হামাস যোদ্ধারা তাদের অস্ত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে গাজা ছাড়তে পারবে। অস্ত্র জমা দিলে তাদের কোনো ধরনের ক্ষতি করা হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব অনুযায়ী হামাস যোদ্ধারা তাদের অস্ত্র কিরাত গাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন একটি বেসামরিক-সামরিক সরকারের কো-অর্ডিনেশন সেন্টারে জমা দেবে। অস্ত্র দেওয়ার পর তাদের গাজা ছেড়ে তৃতীয় কোনো দেশে নিরাপদে যেতে দেওয়া হবে। অথবা হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন গাজার অঞ্চলগুলোতে তাদের ঠেলে দেওয়া হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ওই কূটনীতিক জানিয়েছেন, ইসরায়েল এবং তুরস্কের সঙ্গে এ ব্যাপারে গভীরভাবে আলোচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেনি। তবে তারা সব যোদ্ধাকে ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। দখলদাররা বলছে, আটকে পড়া হামাস যোদ্ধাদের কেউ কেউ ইসরায়েলিদের ওপর হামলায় জড়িত। ফলে যদি তারা জীবিত থাকতে চায় তাহলে তাদের ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
এদিকে, দখলদার ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে মধ্য এশিয়ার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ কাজাখস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম দেশ হিসেবে আব্রাহম চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে কাজাখস্তান। সামাজিকমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, তিনি কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসেম-জোমার্ত তোকায়েভ এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী সেতুবন্ধ তৈরিতে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। আজ আমার আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে আরও কয়েকটি দেশ শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে লাইন ধরছে।
অন্যদিকে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। বৃহস্পতিবার ওই হামলার আগে অবশ্য তারা কয়েকটি এলাকা থেকে বেসামরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। হামলার বিষয়ে ইসরায়েলের দাবি, লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। জাতিসংঘের লেবাননবিষয়ক অন্তর্বর্তী বাহিনী (ইউএনআইএফআইএল) জানিয়েছে, ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাবের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা ইসরায়েলকে অবিলম্বে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে এবং লেবাননের পক্ষগুলোকেও সংযত থাকার অনুরোধ করেছে।
