বিএনপি নেতার সংশ্লিষ্টতার কথা বলায় ভাইকে হত্যার হুমকি!

আপডেট : ১০ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:১৯ এএম

চট্টগ্রামে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে গুলিতে নিহত সরোয়ার হোসেন বাবলা হত্যায় জড়িত মূল অস্ত্রধারীদের ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে শুধু বাবলার পরিবার নয়, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন চালিতাতলীর বাসিন্দারাও। ঘটনার পরপরই বাবলা হত্যার পেছনে বিএনপির এক নেতার ইন্ধন রয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানানোর পর তার ছোট ভাই ইমরান খান ওরফে আজিজ প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন। এক সন্তান হারিয়ে আরেক সন্তানের জীবন নিয়ে চরম উৎকণ্ঠায় ভুগছেন বাবা আবদুল কাদের।

গত ৫ নভেম্বর নগরের বায়েজিদ থানাধীন চালিতাতলীর খন্দকারপাড়ায় চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগকালে পেছন থেকে ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সরোয়ার হোসেন বাবলাকে গুলি করে হত্যা করে এক অস্ত্রধারী। এ সময় বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহসহ আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, বাবলাকে সরাসরি গুলি করেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান। ওই হত্যাকাণ্ডে অন্তত ৩০ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী অংশ নেয়। তারা অত্যাধুনিক একে-৪৭ রাইফেল, শটগান ও পিস্তল বহন করেছিল বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে।

বাবলা হত্যার ঘটনায় রায়হান ছাড়াও কারাবন্দি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের অনুসারী মোবারক হোসেন ইমন, বোরহান উদ্দিন, নেজাম উদ্দিন, আলাউদ্দিন, হেলাল ওরফে মাছ হেলাল এবং বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে আরও ১৫ জন অজ্ঞাতনামাসহ ২২ জনকে আসামি করে থানায় মামলা করেছেন নিহত বাবলার বাবা আবদুল কাদের। মামলার পর পুলিশ ও র‌্যাব চারজনকে গ্রেপ্তার করলেও মূল আসামি রায়হান, মোবারক হোসেনসহ বাকিদের গ্রেপ্তার করা যায়নি। সরোয়ারের ঘাড়ে গুলি করা যুবককেও এখনো শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা ছয় দিনেও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না তারা। এদিকে বাবলা হত্যার নেপথ্যে এক বিএনপি নেতার নাম বলার পর থেকে প্রতিনিয়ত হত্যার হুমকি পাচ্ছেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন ছোট ভাই ইমরান খান আজিজ। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই বাবলা হত্যার পেছনে এক বিএনপি নেতার হাত রয়েছে। ওই নেতার দলে যোগ না দেওয়ায় ভাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমার ভাইয়ের খুনিরা বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর সঙ্গেই এসেছিল। তারা ব্যাকআপ টিমও রেখেছিল। বিভিন্ন পয়েন্টে ১২-১৫ জন অস্ত্রধারী অবস্থান করছিল। বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হানই আমার ভাইকে ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে।’

এদিকে বাবলা হত্যাকাণ্ডের কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার সাইফুল ইসলাম শান্তু ‘সন্ত্রাসী’ রায়হানকে গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে শিগগিরই গণমাধ্যমকে ‘ভালো খবর’ দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। চালিতাতলীর এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘পুলিশ সুপার ভালো খবর দেওয়ার মধ্যেই উল্টো দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান ও তার সহযোগীরা পাহাড়ের আস্তানা থেকে নেমে শত শত মানুষের ভিড়ে প্রকাশ্যে বাবলাকে গুলি করে চলে গেল। তাহলে গোয়েন্দা তৎপরতা কি সম্পূর্ণ ব্যর্থ?’

বাবলা হত্যার পর থেকে শুধু সরোয়ারের পরিবার নয়, পুরো চালিতাতলী এলাকার বাসিন্দারা এক ধরনের আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। সন্ধ্যার পর খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না।

গতকাল রবিবার বিকেলে নিহত বাবলার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সবাই শোকে স্তব্ধ। আত্মীয়স্বজনরা সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ছেলে হারানোর শোকে কাতর সত্তরোর্ধ্ব আবদুল কাদের। বাবলার কথা উঠতেই কেঁদে ওঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে বিয়েশাদি করে সংসারী হতে চেয়েছিল। বউয়ের হাতের মেহেদি রঙ এখনো শুকোয়নি। কতবার তাকে মারার চেষ্টা করেছে। বাড়ির কাছে এসে সন্ত্রাসীরা কেড়ে নিল আমার ছেলের প্রাণ। এটা বাবা হিসেবে কীভাবে সহ্য করব?’

কয়েক মাস ধরে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলছে তীব্র অস্থিরতা। রাজনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি ইট-বালুর ব্যবসা নিয়েও সন্ত্রাসীদের মধ্যে গোলাগুলি ও সংঘর্ষ চলছে। গত এক বছরে শুধু চট্টগ্রাম শহরেই দুজন সন্ত্রাসীসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনার পরও পুলিশ কী করছে—প্রশ্ন চালিতাতলীর বাসিন্দাদের।

বাবলার বাবা আবদুল কাদের বলেন, ‘শত শত লোকের মধ্যে আমার ছেলেকে পিস্তল দিয়ে সাতটি গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। অথচ ঘটনায় জড়িত মূলহোতাদের পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এটি অত্যন্ত কষ্টের।’

র‌্যাব-৭ অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, সরোয়ারকে গুলি করে হত্যার পরদিন একই এলাকায় অটোরিকশাচালক ইদ্রিস আলীর পায়ে গুলি করে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ ইসমাইল হোসেন ওরফে বুইশ্যার ছোট ভাই। তবে এ ঘটনায় র‌্যাব বুইশ্যার দুই অনুসারীকে গ্রেপ্তার করেছে।

গত ২৭ অক্টোবর নগরের বাকলিয়া এলাকায় ছাত্রদল কর্মী মো. সাজ্জাদকে (২২) গুলি করে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হন আরও ১০ জন। এই মামলায় ছাত্রদল নেতা সিরাজ উল্লাহর অনুসারী বোরহান উদ্দিন ও তাঁতি লীগ নেতা নজরুল ইসলামকে আসামি করা হলেও পুলিশ তাদের এখনো ধরতে পারেনি।

তবে বাকলিয়া থানা-পুলিশের দাবি, সাজ্জাদ হত্যার ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু নিহত সাজ্জাদের পরিবারের দাবি, ১১ জন গ্রেপ্তার হলেও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। আতঙ্কে রয়েছেন বাকলিয়া এক্সেস রোডের বাসিন্দারাও।

চট্টগ্রাম নগর-পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ বলেন, ‘এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত কিছু আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। অস্ত্রও উদ্ধার হয়েছে। বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশ নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত