গোমতী নদীর অববাহিকায় বেলে-দোআঁশ মাটির উর্বর ভূমি কুমিল্লা। চার যুগেরও বেশি সময় ধরে নানা প্রজাতির সবজির চারা উৎপাদন করছেন এখানকার চাষিরা। বুড়িচং উপজেলার সমেষপুর গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, ভোর থেকেই কৃষকের কর্মচাঞ্চল্য। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, কেউ বীজতলায় পানি দিচ্ছেন, কেউবা চারা তুলে আঁটি বাঁধছেন। পাশে দাঁড়িয়ে পাইকাররা গুনে গুনে চারা বুঝে নিচ্ছেন। প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে এমন দৃশ্য।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা জেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে ৭০০-এর বেশি কৃষক চারা উৎপাদনে যুক্ত আছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। শুধু সমেষপুর নয়, ডাকলাপাড়া, কালাকচুয়া, কাবিলা ও নিমসার চান্দিনা, দেবিদ্বার, বরুড়া, চৌদ্দগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলায়ও চারা উৎপাদন ও বিক্রি হয়।
জেলা কৃষি তথ্য অনুযায়ী প্রতি মৌসুমে এসব চারার বাজারমূল্য দাঁড়ায় ২০ থেকে ২২ কোটি টাকার মতো। এখানকার উৎপাদিত টমেটো, মরিচ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজির চারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, হবিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়।
দেবিদ্বার উপজেলার হামলাবাড়ি এলাকার কৃষক তোরাব আলী জানান, গত বছর বন্যায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছিল। এবার আগেভাগেই সবজি চাষ শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। তাই তিনি চারা সংগ্রহ করতে এসেছেন সমেষপুরে। ভালো জাতের চারা এখানে পাওয়া যায়। নার্সারি মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, আমি ৪০ বছর ধরে চারা উৎপাদনের পেশায় আছি। সমেষপুরের ভালো চারার ঐতিহ্য কয়েক যুগের। গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের সব জায়গায় আমাদের চারা বিক্রি হয়। এই এলাকা থেকেই বছরে সাত কোটি টাকার মতো চারা বিক্রি হয়।
আরেক ব্যবসায়ী মদিনা নার্সারির স্বত্বাধিকারী মো. সাইফুল ইসলাম জানান, শ্রাবণ থেকে কার্তিক পর্যন্ত চার মাস থাকে মূল উৎপাদন মৌসুম। গতবছর অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতি হয়। এবার ক্ষতি কাটিয়ে পুরোদমে চারা উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেছি। কৃষকরাও চারা নিচ্ছেন। বুড়িচং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিনা আক্তার বলেন, চারা উৎপাদনে নিয়োজিত
কৃষকদের আমরা নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও সহযোগিতা দিয়ে থাকি। উৎপাদন বৃদ্ধি ও গুণগত মান বজায় রাখতে উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও চলছে। কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, চারা উৎপাদনে কুমিল্লা দেশের শীর্ষস্থানীয় জেলা হিসেবে পরিচিত। আমরা কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বীজ নির্বাচন, পোকামাকড় দমন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে সার্বিক কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি। বর্তমানে জেলার প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে সাত শতাধিক কৃষক চারা উৎপাদনে যুক্ত রয়েছেন। এই খাতে প্রায় ২০ কোটি টাকার বেশি বেচাকেনা হতে পারে বলে আশা করা যাচ্ছে। চারা উৎপাদনের এই সাফল্য ভবিষ্যতে জাতীয় পর্যায়ে সবজি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এ জন্য চারা উৎপাদনকারী চাষিদের আরও দক্ষ ও সক্ষম করে তুলতে উন্নত প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
