এক সময়ের শান্ত শহর হিসেবে পরিচিত খুলনা এখন দুর্বৃত্ত ও খুনিদের দখলে। বছর দুই এক ধরে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলেছে। হত্যাকাণ্ড থেকে রক্ষা পাচ্ছে না নারী-শিশুরা ও। খুলনা মহানগরে গত প্রায় দুই বছরে ৫৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। যা নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে সাধারণ মানুষ।
তবে পুলিশ বলছে, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাই ও পারিবারিক কলহের কারণেই এসব খুনের ঘটনা ঘটছে।
খুলনা মেট্রেপলিটন পুলিশ (কেএমপি) জানায়, ২০২৪ সালে কেএমপির আট থানা এলাকায় ১২ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এরমধ্যে গুলিতে একজন, ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও অজ্ঞাত কারণে দুই জন করে, ছিনতাইয় ও পারিবারিক কলহের ঘটনায় তিন জন করে ও গণপিটুনিতে একজন হত্যার শিকার হন। এ সব হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬১ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত কেএমপির আট থানায় ৩১ জন নিহতের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে । এরমধ্যে গুলিতে ৭, ধারালা অস্ত্র আঘাতে ১৩, শ্বাসরোধে তিন, পারিবারিক কারণে ছয়, চড় মেরে ও অজ্ঞাত ঘটনায় একজন করে হত্যার শিকার হন। আর এসব ঘটনার অভিযোগে ৭২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
এদিকে খুলনা মহানগরীতে একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সর্বশেষ গত রবিবার নগরীতে দুই শিশুসহ ট্রিপল হত্যাকাণ্ড ও আরেক যুবককে গুলি ও গলা কেটে হত্যা করা হয়। যা নগরবাসীকে শিহরিত করেছে।
রবিবার রাত ৯টার দিকে পুলিশ নগরীর লবণচরা থানার মুক্তা কমিশনার কালভার্টের পার্শ্ববর্তী একটি বাসার মুরগির ঘর থেকে নানি ও নাতি-নাতনির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন, নানি মহিদুন্নেসা (৫৫) ও তার নাতি মুস্তাকিম (৮), নাতনি ফাতিহা (৬)।
পুলিশের ধারণা পারিবারিক ও জমাজমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে পরিচিত কেউ প্রথমে নানি মহিদুন্নেসাকে হত্যার পর দেখে ফেলায় দুই ভাইবোনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।
একই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে নগরীর করিমনগর এলাকায় আলাউদ্দিন মৃধা নামে এক যুবককে গুলি ও গলায় ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এলাকাবাসী জানায়, সন্ধ্যার দিকে আলাউদ্দিন ও তার স্ত্রী ঘরের বারান্দার সিঁড়ির ওপর বসে কথা বলছিলেন। এসময় ৬/৭ জন দুর্বৃত্ত ওই বাড়িতে ঢুকে আলাউদ্দিনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এরপর দুর্বৃত্তরা ধারালো ছুরি দিয়ে তার গলায় আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
পুলিশ জানায়, খুলনা মহানগরীতে যে সব হত্যাকাণ্ড ঘটছে তার বেশিরভাগই অবৈধ মাদক ব্যবসার বিরোধের জেরেই হয়েছে। এই সব মাদক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে গ্রেনেড বাবু, আশিক, নূর আজিম ও পলাশ বাহিনী। এদের বাইরেও আরও বেশ কয়েকটি মাদক সিন্ডিকেট রয়েছে। নিজ এলাকার বাইরে অন্যের এলাকায় মাদক ব্যবসাসহ অধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন কমিটির খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, গত বছরের ৫ আগস্টের পর শান্তির নগরী খুলনা খুনের নগরীতে পরিণত হয়েছে। মূলত পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও সঠিকভাবে মনিটোরিং না করায় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। এছাড়া মাদকের সঙ্গে জড়িতরা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাচ্ছেন। পরিকল্পিত এ সব হত্যাকাণ্ড পুলিশও ঠেকাতে পারছে না। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আইনশৃঙ্খলা অবস্থা আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সহকারী কমিশনার (মিডিয়া ও সিটি এসবি) ত. ম রোকনুজ্জামান বলেন, ইতোমধ্যে দুই বছরে ৪১টি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব মামলার বেশির ভাগই রহস্যই আমরা উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। এছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত ১৩৩ জন গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জন হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে খুলনা বিভাগীয় মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আহসানুর রহমান বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে মাদকগুলো ঢাকা থেকে পরিবহনে পার্শ্ববর্তী জেলা বাগেরহাটের মোল্লাহাট ও ফকিরহাট এবং নৌপথে পটুয়াখালী থেকে মোংলায় খালাস করা হয়। এই সব মাদক খুলনা থেকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও আমরা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছি।
