জলবায়ুর ক্ষত বহন করছেন বাংলাদেশের উপকূলের নারীরা

আপডেট : ১৯ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২১ এএম

আমাজনের নিঃশ্বাসে ভেজা ব্রাজিলের বেলেমে কপ-৩০-এর সপ্তম দিনে আওয়াজ উঠল, ‘নারীর জলবায়ু-প্রণোদিত স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অভিযোজন পরিকল্পনার কেন্দ্রে না রাখলে বৈশ্বিক অঙ্গীকার অর্ধেকই অপূর্ণ থেকে যাবে।’ এই সতর্কবার্তাই গত সোমবার ব্লুজোন জুড়ে আলোচনার সুর। এক গবেষণাচিত্রে জলবায়ুর অভিঘাতে বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীদের শরীরে যে ক্ষতচিহ্ন ফুটে উঠছে, তা যেন গোটা সম্মেলনকেই নাড়িয়ে দেয়। সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ড (বিএফটিডব্লিউ) এবং হেক্স/ইপিআর-এর যৌথ আয়োজনে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় উঠে আসে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র।

সিপিআরডির গবেষক শেখ নূর আতায়া রাব্বি বলেন, বাংলাদেশের উপকূলের ৪০০ প্রজননক্ষম নারীর ওপর করা সমীক্ষায় দেখা গেছে লবণাক্ততার কারণে তাদের পিআইডি বা পেলভিক ইনফ্লেমেটরি ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২.৩ গুণ বেশি। পাশাপাশি বেড়েছে অনিয়মিত ঋতুচক্রে ভোগা নারীর সংখ্যা। এছাড়াও গর্ভকালীন জটিলতা, যৌন সংক্রমণ, গর্ভপাত, অকাল প্রসব বাড়ছে উপকূলের নারীদের মধ্যে। রাব্বির কণ্ঠে ক্ষোভ, ‘জলবায়ুর প্রভাব যত বাড়ছে, উপকূলের নারীর শরীর তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার পাতায় নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো কথা লেখা নেই। নেই জলবায়ু অর্থায়নের নথিতেও।’

আলোচনায় আরও অংশ নেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এ কে এম সোহেল, গ্লোবাল ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যালায়েন্সের নির্বাহী পরিচালক ড. জেনি মিলার, ইউএন ইউনিভার্সিটির ফেলো ড. বিশ্বজিৎ চিতলে, পরিবেশ অর্থনীতিবিদ ড. শৌর্য দাশগুপ্ত এবং রিজেনারেট আফ্রিকার জেন্ডার-হেলথ লিড নাকুয়া নিয়োনা কাসেকেন্দেসহ আরও অনেকে। আলোচনায় সবার সুরই এক নারীর স্বাস্থ্যকে কেন্দ্রে না রাখলে অভিযোজন ব্যবস্থা ভঙ্গুরই থেকে যাবে। লিঙ্গভিত্তিক স্বাস্থ্য উপাত্ত সংগ্রহ, জলবায়ু-সহনশীল নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে লক্ষ্যনির্ভর পদক্ষেপের ওপর জোর দেন তারা।

গতকাল কপ৩০-এর অন্যান্য আলোচনাতেও স্বাস্থ্যই ছিল মূল আলোচ্য বিষয়। ডব্লিউএইচও’র হেলথ প্যাভিলিয়নে ‘ক্লাইমেট অ্যান্ড হেলথ অ্যাডাপটেশন’ সেশনে বলা হয় বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে অতিমাত্রার তাপপ্রবাহে প্রতি বছর ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার ঝুঁকিও দিন দিন বাড়ছে। তাই বেলেম হেলথ অ্যাকশন প্ল্যানের আলোকে স্বাস্থ্যকে অভিযোজনের মূল ধারায় আনার দাবি জোরদার হচ্ছে।

একই দিনে ইউকে প্যাভিলিয়নে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট পার্টনারশিপ : ডেলিভারিং অ্যাকশন, মোবিলাইজিং ফাইন্যান্স’ সেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা তুলে ধরেন অর্থায়নের ঘাটতির করুণ বাস্তবতা। ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের যে প্রতিশ্রুতি, তা কাগজের অঙ্ক হয়েই রয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোর অর্থ সাহায্য অপ্রতুল, অনিশ্চিত, আর প্রাপ্তির পথও পর্বত ডিঙানোর মতো কঠিন।

বাংলাদেশ দলের জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ শাহ আদনান মাহমুদের ভাষায়, ‘আর্টিকেল ৯.১ এর দায় পূরণ হোক। ক্ষয়ক্ষতির তহবিলে দ্রুত ও ন্যায়সংগত অর্থপ্রবাহ দরকার। না হলে অভিযোজনের কাঠামো ভেঙে পড়বে।’

তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হয়েও বাংলাদেশ এনডিসি, দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনা ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বেলেম রোডম্যাপে ১.৩ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি থাকলেও উন্নত দেশগুলোর অর্থায়ন অপ্রতুল এবং অনিশ্চিত।

গত সোমবার ওয়াইল্ডফায়ার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কার্বন ক্যাপচার নিয়েও পৃথক  বৈঠকে ব্যস্ত ছিল কপ৩০। দিনের শুরুতে এক উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনের উদ্বোধনে ইউনাইটেড নেশনস ক্লাইমেট চিফ সাইমন স্টিল বলেন, বিশ্ব যতই বিভক্ত হোক, জলবায়ু সহযোগিতার সেতু ভাঙলে চলবে না। স্টিল বলেন, জলবায়ু বিপর্যয় লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করছে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়াচ্ছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারকে অস্থির করে তুলছে। এ অবস্থায় আলোচনায় বিলম্ব বা কৌশলগত  দোদুল্যমানতার জায়গা নেই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত