পানি খাবারের হাহাকার তীব্র সংকট শৌচাগারের

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৮:০৮ এএম

কড়াইল বস্তির ভয়াবহ আগুনে সব হারিয়ে হাজার হাজার মানুষ চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ঘরহারা প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ জীবন বাঁচাতে এক কাপড়েই ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। বস্তিতে বসবাসরতদের এখন প্রধান সংকট বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও শৌচাগার। কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছে দোকানে, আবার কেউ কেউ কোনো স্থানেই ঠাঁই না পেয়ে ঠা-ার মধ্যেই মাটিকে বিছানা করে শুয়ে আছেন। সবচেয়ে কষ্টে আছে ওই বস্তিতে বসবাসরত শিশু, অসুস্থ রোগী ও বৃদ্ধরা। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই ভুগছেন ঠা-ায়। অনেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় নতুন করে বিপুল সুদে ঋণ করছেন।

বস্তির বাসিন্দাদের নেই রান্নার ব্যবস্থা, খাওয়া-দাওয়ার ঠিকানা, রাতে ঘুমের স্থান ও শীতে গরম কাপড়। একদিকে শীত ও ক্ষুধার জ¦ালা নিয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে শিশু, বৃদ্ধসহ হাজারো মানুষ। অন্যদিকে শৌচাগার সংকটে ভুগছে তারা। বাসিন্দাদের পাশাপাশি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া পরিবারের শিশুরা বেশি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

তারা বলছেন, অগ্নিকা-ের পর গতকাল সকাল থেকে খাবার এলেও বিশুদ্ধ পানি তেমনভাবে দিচ্ছে না কেউ। বিশুদ্ধ খাবার পানির পাশাপাশি শৌচাগারের জন্য ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার অগ্নিকা-ে পুড়ে যাওয়া বস্তি ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা যায়।

দুপুর সাড়ে ১২টার পর কয়েকটি সেবাদাতা এনজিও প্রতিষ্ঠান ছোট ছোট বোতলজাত পানি নিয়ে আসার পর সবার চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। মুহূর্তেই বোতলজাত পানি শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান এনজিও কর্মীরা। পানির চাহিদা মেটাতে বোতলজাত পানির পাশাপাশি, বড় ট্যাংকিতে করে ওয়াসা থেকে বেশ কয়েকটি খাবার পানি নিয়ে এসেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। এদিকে, বিশুদ্ধ খাবার পানির পাশাপাশি, শৌচাগারের ভোগান্তির কথাও জানান এনজিও কর্মীরা।

স্থানীয় বাসিন্দা নাজমা বেগম বলেন, ‘অগ্নিকা-ের ঘটনার পর খাবার নিয়ে এলেও তেমন খাবার পানি নিয়ে আসছে না কেউ। বিশুদ্ধ খাবার পানি প্রয়োজন। বিশেষ করে আমাদের পরিবারের শিশুদের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির দরকার। এর পাশাপাশি টয়লেটের সমস্যায় বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ছি। স্বেচ্ছাসেবীরা বিশুদ্ধ পানির ছোট ছোট বোতল নিয়ে এলেও অনেকে পাচ্ছে না। আমরা চাই তারা বিশুদ্ধ খাবার পানি নিয়ে আসুক।’

আরেক বাসিন্দা তহুরা বেগম বলেন, ‘খাবারের পাশাপাশি আমাদের টয়লেট সংকট। অগ্নিকা-ের পর সব টয়লেট পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কোথাও আমরা টয়লেটে যেতে পারছি না।’

নাজমা ও তহুরার মতো অগ্নিকা-ে পুড়ে যাওয়া বস্তির ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় কয়েকশ বাসিন্দা এমন তীব্র সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের চাওয়া, অন্তত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে তারা যেন খাবার, বিশুদ্ধ পানি নিয়ে আসে। এর পাশাপাশি তাদের জন্য আপাতত শৌচাগারের ব্যবস্থা দরকার।

জানা যায়, কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকা-ের ঘটনায় কড়াইল বউবাজার মসজিদের সামনে দুটি মেডিকেল বুথ বসেছে। একটি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে, অন্যটি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। তবে, সকাল থেকে এ দুটি বুথে অন্তত ৮০০-এর মতো মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা নিয়েছে। সেবা নেওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ঠা-াজনিত কারণে সেবা নিয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ শিশু, ১০ শতাংশ মধ্যবয়স্ক ও ২০ শতাংশ বৃদ্ধ ঠা-ার সমস্যায় সেবা নিয়েছে। বাকি ২০ শতাংশই মালামাল সরাতে গিয়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত পেয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছে।

বস্তির বাসিন্দা ৬৫ বছর বয়সী হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘রাতে একটা দোকানে মাটিতে বিছানা বিছিয়ে শুয়েছিলাম। ছোট নাতি-নাতনিদের ঠা-া লেগে নাক বন্ধ হয়ে গলাব্যথা করছে। সকালে তাদের জন্য বুথ থেকে মেডিসিন নিয়েছি। আমারও ঠা-ায় শরীরের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেছে। একটু আগে আমার জন্য ঠা-া ও শরীর দুর্বল হওয়ার জন্য কিছু ওষুধ নিয়েছি।’

বস্তি ঘুরে দেখছেন নেতারা, নেই পর্যাপ্ত সহায়তা : অগ্নিকা-ের পর থেকে একে একে দেখতে আসছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। দিয়ে যাচ্ছেন সহযোগিতার আশ্বাস ও কথার ফুলঝুরি। তবে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করছেন বস্তিবাসী।

জানা গেছে, বুধবার সকাল থেকেই কড়াইল বস্তি দেখতে এসেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। গণসংহতির আহ্বায়ক জোনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ জনতা পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফ উদ্দিন জুয়েল, জাতীয় নাগরিক পার্টির যুব উইং ‘জাতীয় যুবশক্তি’র সদস্য সচিব ডা. জাহেদুল ইসলামসহ বিভিন্ন দলের নেতারা কড়াইল বস্তি ঘুরে দেখেছেন। এ ছাড়া অগ্নিকা-ের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পাশাপাশি সহযোগিতা করার আশ্বাসও দিয়েছেন তারা।

তবে বস্তির বাসিন্দারা বলছেন, রাজনৈতিক দল ও সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সহায়তা মেলেনি। সহায়তা বলতে তারা পেয়েছেন শুধু খাবার পানি ও কিছু কাপড়চোপড়। তাদের দাবি, আগের মতো ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ করে দেওয়া হোক এবং তাদের আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হোক।

বস্তির বাসিন্দা শাহিন আলম বলেন, ‘বিভিন্ন সংস্থা ও রাজনৈতিক দলের নেতারা খাবার নিয়ে আসছেন, কিন্তু আর্থিক অনুদান পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের এখন সবচেয়ে প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা। আমার মতো অনেকের সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে কিছু একটা করে দিলে ভালো হতো, না হলে আমরা দিশেহারা হয়ে যাব।’

ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় সুদে ঋণ : ২০১৭ সালে কড়াইল বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ঘর, আসবাবপত্র পুড়ে নিঃস্ব হয়ে যায় জাহাঙ্গীর আলম। ফের ঘুরে দাঁড়াতে ঋণ নিয়ে বস্তির ক-ব্লকে একটি খাবার হোটেল দিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করেন। সেই ঋণ এখনো পরিশোধ হয়নি। এর মধ্যে ফের আবারও অগ্নিকা-ে সবকিছু পুড়ে নিঃস্ব হয়ে যায়।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘২০১৭ সালে আগুন লাগার পর আমার সব পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এরপর কয়েক জায়গা থেকে টিন পেয়েছি। তা দিয়ে কোনো ধরনের ঘর তুলে বসবাস শুরু করি। কয়েক দিন পর বিভিন্ন সমিতি ও এনজিও থেকে কয়েক দফায় প্রায় ১৭ লাখ টাকা সুদে কিস্তি তুলি। সেই টাকা দিয়ে একটা একতলা বিল্ডিং তৈরি করি। তখন ভাবলাম হয়তো বিল্ডিং হলে আগুনে তেমন ক্ষতি হবে না। কিন্তু আগুন আমার আর কিছুই অবশিষ্ট রাখল না। শুধু হোটেলের কর্মীরা দুটি গ্যাসের সিলিন্ডার রক্ষা করল। আর কোনো কিছুই নিয়ে যেতে পারিনি।’

দেখা যায়, প্রতিটি টিনশেড বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে আছে। ঘরের আসবাবপত্র কোনো কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। পাশাপাশি, যেসব আধাপাকা বাড়ি ছিল, সেগুলো ধসে পড়ে গেছে। এ ছাড়া একতলা ভবনের ওপর গড়ে তোলা দোতলা-তিনতলা টিনশেড বাড়িগুলো মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। অগ্নিকা-ের পর কেউ ঘর থেকে কোনো আসবাবপত্র নিয়ে যেতে পারেনি বলে জানান বাসিন্দারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত