সরকারি স্কুলে শিক্ষার ধস: তৃতীয় শ্রেণিতে অর্ধেকই অক্ষর চেনে না

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৪:৩২ পিএম

গোপালগঞ্জ, খুলনা ও ফরিদপুরের একাধিক পরিদর্শন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বিষয়ে শতকরা ৩০-৪০ শতাংশ শিশু এবং ইংরেজি বিষয়ের ৪০-৫০% স্বাধীনভাবে বই পড়তে পারে না। এর মধ্যে অধিকাংশ শিশু গণিত স্থানীয়মান, ভগ্নাংশ, জ্যামিতিক চিত্র এবং বৈশিষ্ট্য, বর্ণ, কার চিহ্ন ও ফলাচিহ্ন-যুক্তবর্ণ ভেঙে নতুন শব্দ গঠন করতে পারেনা।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৪৩৫ জন শিক্ষক কর্মরত। শিক্ষার্থী সংখ্যা রয়েছে ১ কোটির বেশি। ২০২৪ সালের শুমারি অনুযায়ী, ঝরে পড়ার হার দাঁড়িয়েছে ১৬.২৫%, ছেলেদের ১৯%। নেত্রকোনায় এটি ৪৪%। এদিকে শিক্ষক শূন্যপদ রয়েছে ৩৪ হাজারের বেশি প্রধান শিক্ষক এবং ২৪,৫০০+ সহকারী শিক্ষক। ফলে একজন শিক্ষককে কোথাও কোথাও ৪০–৫০ শিক্ষার্থীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও পুরো বিদ্যালয়ে ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।

রাজনৈতিক বিবেচনায় গোপালগঞ্জ জেলায় অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। কমপক্ষে ১৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুর ভর্তি ৫০ জনের কম। গোপালগঞ্জের মতো কিশোরগঞ্জ, শরীয়তপুর, মুন্সিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, লালমনিরহাট, দিনাজপুরসহ বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলায় এমন বিদ্যালয় এর সংখ্যা কম নয়। এসব বিদ্যালয়ে দৈনিক শিক্ষার্থী উপস্থিতি ১০ থেকে ১৫ জন। 

পঠন দক্ষতা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা অধিদপ্তর শিশুদের শিখন মান যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। গত এপ্রিলে স্কুল পর্যায়ে তৃতীয় শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে শিখন মান যাচাই করতে দেখা যায়। পরবর্তীকালে কর্মকর্তাদের যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের অভাবে এসব কার্যক্রম সফল হয়নি। আবারো চলতি নভেম্বর মাসে দ্বিতীয় বারের মতো বিভিন্ন শিখন টুলস পাঠানো হয়। সঠিক তদারকির অভাব এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতার ঘাটতির কারণে
শিখন মানের উন্নতি কতটা হবে, তা নিয়ে চিন্তিত অভিভাবকরা। 

রাজবাড়ীর অভিভাবক আব্দুস সোবহান বলেন, সন্তান চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে, কোচিং করাতে হয়, স্কুল সিলেবাস শেষ করতে পারে না, জবাবদিহিতাও নেই, অভিভাবক হিসেবে আমি অসহায়।

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে জেলার বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় গত মার্চ মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন দৃশ্যমান। তবে সে অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ছে না, বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।’ এখন কিন্ডারগার্টেন, মাদরাসা হয়েছে। মানুষ স্বাধীন। তারা কিন্ডারগার্টেন ও মাদরাসায় শিশুদের পড়াচ্ছে। আমরা প্রাথমিকে বিনা বেতনে পড়াচ্ছি, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক দিচ্ছি, উপবৃত্তি দিচ্ছি- তারপরও অভিভাবকরা তাদের শিশুদের পয়সা খরচ করে অন্যখানে কেন পড়াচ্ছেন?’  গত বছরে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএসের) এক গবেষণায় তৃতীয় শ্রেণির ৭৬ শতাংশ ও চতুর্থ শ্রেণির প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ঠিকমতো বাংলা পড়তে পারছে না এমন তথ্য উঠে আসে। 

ফরিদপুরের একাধিক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এ জেলায় তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বিষয়ে শতকরা ৩০ শতাংশ শিশু এবং ইংরেজি বিষয়ের ৪০% স্বাধীনভাবে বই পড়তে পারে না। শিক্ষকরা শিক্ষক সংকট, অধিক শিক্ষার্থীকে সমস্যা হিসেব উল্লেখ করলেও বাস্তবে যে স্কুলের শিক্ষার্থী ৫০ জন, শিক্ষক রয়েছেন ৬-৮ জন সেখানেও রিডিং পড়ার চিত্র একই রকম। রাজবাড়ীর একটি পরিদর্শন খাতার ছবিতে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণিতে উপস্থিত থাকা ২৪ জনের মধ্যে ১৭ জন অক্ষর চেনে না, বাকিরা মোটামুটি।

অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু বলেন, “প্রাথমিক শিক্ষায় মনোযোগ নেই। শিশুরা কোচিং নির্ভর হয়ে পড়ছে, শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার অভাব শিক্ষার মান হ্রাস করছে। বিদ্যালয়ে বই ও উপকরণ থাকলেও মৌলিক অক্ষর, রিডিং ও গণিতের প্রাথমিক জ্ঞান ঠিকমতো শেখানো হচ্ছে না। শিক্ষকরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, প্রশাসনিক দায়িত্ব ও কোচিং ব্যবসায় ব্যস্ত থাকায় শ্রেণিপাঠে ধারাবাহিকতা নেই। দীর্ঘদিন একই বিদ্যালয়ে থাকা শিক্ষক এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষার মান নষ্ট করছে। চলমান কর্মবিরতি শিশুদের শিক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। চাকরিবিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের যথাযথ বদলীর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান জরুরি।” সহকারী শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনের ফলে শিক্ষকদের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, শিশুদের জিম্মি করা হচ্ছে, অভিভাবকরা জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পেতে বেসরকারীমুখী হতে পারে। “দায় তো শেষ পর্যন্ত আমাদেরই,” স্বীকার করেন দেশসেরা প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং দেশ সেরা প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, শিক্ষকতা শুধু চাকরি নয়, এক ধরনের সাধনা ও দায়বদ্ধতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই এখনো সেই অবস্থানে আছি? তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা যদি সাবলীলভাবে বাংলা–ইংরেজি পড়তে না পারে, রিডিংয়ে হোঁচট খায়, অক্ষর জ্ঞানই ঠিক থাকে না তাহলে এ দায় এড়াবেন কারা? সরকারি চাকরিতে শৃঙ্খলা বিধি আছে, যার প্রতি আমাদেরই দায়বদ্ধ থাকা দরকার। শিশুরা আমাদের দেখে শিখে তাই আমাদের থেকেই তারা ধৈর্য, উদারতা আর শুদ্ধতার পাঠ পাওয়ার কথা। 

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিপূর্বে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে দেয়া হয়েছিল। এটার কারনে একটা বড় ধরনের ইফেক্ট পড়েছে। সে সময়ে শিশুরা লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতে পারেনি। শিশুদের স্কুলের জন্য যে আকর্ষনীয় করা সেটা করা হয়নি। যেমন প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক শিশু তারা কিন্তু না খেয়ে আসে, অর্ধবেলা না খেয়ে থাকে, তাদের জন্য একটা স্কুল ফিডিং এর মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম নেওয়া উচিত ছিল আরও আগে সেটা কখনো নেওয়া হয়নি। তাহলে একদিকে যেমন পরীক্ষা পদ্ধতি তুলে নেওয়া হয়েছিল আবার অন্যদিকে স্কুলকে আকর্ষনীয় করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। যারা পাঠদান করাবে শিক্ষক সে শিক্ষকদের চাকরীটাও আকর্ষণীয় করা হয়নি। যেটা সর্বশেষ প্রধান শিক্ষকদের ১০ গ্রেড বাস্তবায়ন হলো, সহকারী শিক্ষকদের ১১তম গ্রেড বাস্তবায়নের পথে।

আমাদের শিক্ষক যারা তারা আসলে পিতৃ এবং মাতৃস্নেহে বাচ্চাদের যে পাঠদান করানোর বিষয়টা এটা থেকে তারা দুরে ছিল। আরেকটি বিষয় হচ্ছে মনিটরিংটা সঠিক হয়নি। প্রধান শিক্ষক বা সহকারী শিক্ষা অফিসার তাদের মনিটরিংটা সঠিক হয়নি। মনিটরিং বা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার যে মান সেটা আসলে কমে গিয়েছে। আমরা বেজলাইন সার্ভের মাধ্যমে শিশুদের চিহ্নিত করেছি। কয়েক মাসে এক্সট্রা কেয়ার নিয়েছি। সবশেষ তথ্য পেলে বুঝতে পারবো উন্নতি কতটা হয়েছে। শিক্ষার মান বাড়াতে একটু সময় দিতে হবে। এতোকিছুর পরেও কেন কেজি বা বেসরকারি মুখি অভিভাবকরা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সময় দিতে হবে। আমরা শিক্ষকদের মানসম্মত সুবিধার আওতায় আনছি, শিশুদের স্কুল ফিডিং এর মতো কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার মান বাড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত