ছয় দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন স্বাস্থ্য সহকারীরা। পাঁচ দিন ধরে কর্মবিরতি পালন করে এখন ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন তারা। দশম গ্রেডের দাবিতে আন্দোলন করছেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা। আজ তাদের অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালনের কর্মসূচি রয়েছে। এ ছাড়া চার দাবিতে গত ২ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন। তারাও দশম গ্রেড চায়। নাসিং খাতেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। তারা আট দাবিতে আন্দোলন করছেন। এসব আন্দোলনে দুর্ভোগে পড়ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। স্বাস্থ্য খাতে বিপদের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দশম গ্রেডের দাবিতে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা গতকাল সারা দেশে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কর্মরিবতি পালন করেছেন। গত ৩০ নভেম্বর তারা দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন। তাদের কর্মবিরতির কারণে দুর্ভোগে পড়েন সারা দেশের রোগী ও তাদের স্বজনরা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রক্তের নমুনা সংগ্রহের কক্ষে কথা হয় মুনিরা আক্তার (ছদ্মনাম) নামের এক রোগীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বসে আছি। রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর জন্য এসেছি। শুনলাম আন্দোলন চলছে, ১২টার পর ছাড়া নমুনা দেওয়া যাবে না। জানি না কত সময় বসে থাকতে হবে। খুব কষ্ট হচ্ছে।’
শুধু তিনি নন, আরও অনেকেই অপেক্ষা করছিলেন। ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগের সামনে গিয়ে দেখা গেছে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টরা।
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের দশম গ্রেড বাস্তবায়ন পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা আগে কখনো কর্মবিরতিতে যাইনি। এবার বাধ্য হয়েছি। আমাদের উপায় নেই। রোগী-স্বজনদের সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাস্তায় নামার আগেই সরকারের উচিত খাত ধরে ধরে যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করে দেওয়া। সরকারের বেতন কমিশন গঠন করার উদ্যোগ নেওয়ার দরকার ছিল না। এটা নির্বাচিত সরকার এসে করতে পারত। সরকারের এ ভুলের কারণেই বেতনসংশ্লিষ্ট এত আন্দোলন হচ্ছে। প্রথমে ঢিলেঢালা কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে।
পরে কঠোর কর্মসূচির কারণে জিম্মি হচ্ছে জনগণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, ‘হাসপাতালে সেবা বন্ধ থাকলে মানুষের দুর্ভোগ হবে এটাই স্বাভাবিক। এভাবে দিনের পর দিন আন্দোলন হতে থাকলে তো বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকেই।’
তিনি বলেন, ‘পে-স্কেল গঠন করা হয়েছে। সেটি নিয়ে কাজ চলছে। সেখানে তারা দাবি উপস্থাপন করতে পারে। বেতন কমিশনের মেম্বার যারা আছেন তাদের কাছে দাবি তুলতে পারে। কিন্তু রাস্তায় নেমে আন্দোলন করায় রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের এ মুহূর্তে বেতন কমিশন গঠন করার দরকার ছিল না।’
নিয়োগবিধি সংশোধন, বেতন বৈষম্যের নিরসন ও টেকনিক্যাল পদমর্যাদাসহ ছয় দাবিতে গত ২৯ নভেম্বর থেকে শহীদ মিনারে তিন দিন অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন স্বাস্থ্য সহকারীরা। মঙ্গল ও বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অবস্থান করেন। সে সময় তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং তার পদত্যাগ দাবি করেন।
স্বাস্থ্য সহকারীদের আন্দোলনের কারণে সারা দেশে ১ লাখ ২০ হাজার আউটরিচ ইপিআই টিকাকেন্দ্রে সেবা বন্ধ রয়েছে। দুর্ভোগ পোহাচ্ছে মা ও শিশুরা।
বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় পরিষদের সদস্য সচিব ফজলুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা মাঠ ছাড়ব না।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (ইপিআই) ডা. হাসানুল মাহমুদ বলেন, ‘কেউ যাতে টিকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হন, সেটি নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা আছে। তবে কর্মবিরতির কারণে সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরা সাময়িকভাবে দুর্ভোগে পড়ছেন। স্বাস্থ্য সহকারীরা শুধু টিকা দেন না, তারা আরও অনেক কাজ করেন। সেগুলো বন্ধ রয়েছে।’
জানা গেছে, দেশে এখন সাড়ে ২৬ হাজার স্বাস্থ্য সহকারী রয়েছেন। তাদের একজন জানান, তারা মাসিক ভ্রমণভাতা পান মাত্র ৬০০ টাকা। আর বেতন সর্বসাকল্যে ৯ হাজার ৭০০ টাকা।
তাদের ছয় দাবির মধ্যে রয়েছে, নিয়োগবিধি সংশোধন করে স্নাতক বা সমমানের যোগ্যতা সংযুক্ত করে ১৪তম গ্রেড প্রদান; ইন-সার্ভিস ডিপ্লোমা সম্পন্নকারীদের ১১তম গ্রেডসহ টেকনিক্যাল পদমর্যাদা দেওয়া; পদোন্নতির ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা; সব স্বাস্থ্য সহকারী, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও স্বাস্থ্য পরিদর্শককে প্রশিক্ষণ ছাড়াই স্নাতক স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করা; বেতন স্কেল পুনর্নির্ধারণের সময় প্রাপ্য টাইম স্কেল বা উচ্চতর স্কেল সংযুক্ত করা ও ইন-সার্ভিস ডিপ্লোমা (এসআইটি) কোর্স সম্পন্নকারীদের সমমান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
এসব প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর বলেন, ‘সমাধানের চেষ্টা করছি। আলোচনা চলছে। ডিজি অফিসের যা যা করণীয় ছিল সবই করে দিয়েছি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কিছু কোয়েরি ছিল, সেগুলো করেও স্বাস্থ্য সহকারীর কাছে পাঠিয়েছি। তারপরও তারা যদি অযৌক্তিক আন্দোলন করে তাহলে তো হবে না। গত ২৪ বছরে যা পাননি তা যদি ২৪ দিনে আদায় করতে চান তাহলে আমরা কিছু করতে পারব না। চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া যায় না।’
স্বতন্ত্র নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরকে ভিন্ন অধিদপ্তরের সঙ্গে একীভূত করার চেষ্টা বন্ধ করতে এবং জাতীয় নার্সিং কমিশন গঠনসহ ৮ দাবিতে আন্দোলনে নামেন নার্সরা। দাবিগুলো পূরণে ২ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের বিষয়ে বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের (বিএনএ) মহাসচিব মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান জুয়েল জানান, এক মাসের মধ্যে দাবিগুলোর বিষয়ে জোরালোভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে অনেকগুলো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে বিএনএ ও বিএমএস নেতারা মতবিনিময় সভার রেজল্যুশনপ্রাপ্তির বিষয়ে নিশ্চয়তা চান। এক মাসের মধ্যে দাবি পূরণে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না হলে আরও বড় কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
তিনি বলেন, ‘বৈঠকের পর আমরা জরুরি পর্যালোচনা সভা করি। সভায় যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণে আলোচনা ও গৃহীত সিদ্ধান্তের বাইরে অথবা আংশিক সিদ্ধান্ত পরিলক্ষিত হলে তাৎক্ষণিকভাবে শাটডাউন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।’
জেলায় জেলায় কর্মবিরতি
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করা হয়েছে।
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি জানান, ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পালিত কর্মসূচিতে ডিপ্লোমা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।
রাজবাড়ী প্রতিনিধি জানান, রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের অর্ধদিবস কর্মবিরতি পালন করা হয়েছে।
বাগাতিপাড়া (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, কর্মবিরতিতে বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ল্যাব, এক্স-রে ও বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেবা বন্ধ থাকায় রোগীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ে।