পুলিশ কমিশন গঠনের অধ্যাদেশ অনুমোদন

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৩:৪৯ এএম

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। এ কমিশন নাগরিকের অভিযোগ অনুসন্ধান-নিষ্পত্তি, পুলিশ সদস্যদের সংক্ষোভ নিরসন ইত্যাদি বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ করবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলন করে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ুপরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার উপ- প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।

পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের বিষয়বস্তু তুলে ধরে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান করে গঠিত এ কমিশনের সদস্যরা হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ, অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক পদমর্যাদার নিচে নন এমন কোনো অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যিনি কর্মরতও হতে পারেন বা অবসরপ্রাপ্তও হতে পারেন এবং মানবাধিকার ও সুশাসনবিষয়ে অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে, এমন একজন ব্যক্তি।

কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়া কেমন হবে, সে বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, একটি বাছাই কমিটির মাধ্যমে কমিশনের নামগুলো আসবে। তার ভিত্তিতে সরকার নিয়োগ দেবে। বাছাই কমিটিতে থাকবেন প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং জাতীয় সংসদের দুজন প্রতিনিধি।

ভোটের আগে ‘তাড়াহুড়া করে’ অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে যে দুটি আইন করার অভিযোগ ওঠেছিল, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ তার একটি। আপত্তি ওঠা আরেকটি অধ্যাদেশ এনজিওর বৈদেশিক অনুদানসংক্রান্ত, যেটির খসড়া অনুমোদন পায় ২৯ নভেম্বরের বৈঠকে।

সেদিনের বৈঠকে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশের খসড়াও উঠেছিল, কিন্তু অনুমোদন না দিয়ে আরও বিস্তারিতভাবে এবং সংশোধিত আকারে পরের সভায় উত্থাপনের নির্দেশ দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। সেই মোতাবেক গতকালের সভায় অধ্যাদেশটি উঠলে উপদেষ্টা পরিষদ তাতে সায় দেয়।

উপদেষ্টা পরিষদে ওঠার আগেই পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ও এনজিওর বৈদেশিক অনুদানসংক্রান্ত অধ্যাদেশ নিয়ে আপত্তি তোলে বিএনপি। দলটি মনে করে, জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ধরনের আইন করার পেছনে সরকারের ‘ভিন্ন উদ্দেশ্য’ রয়েছে।

২৮ নভেম্বর এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিশ্বস্ত সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি যে, তাড়াহুড়া করে দুটি আইন বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার পাস করাতে চাইছে। একটি সংশোধিত পুলিশ কমিশন আইন, অন্যটি এনজিও-সংক্রান্ত আইন। আমরা মনে করি, নির্বাচনের আগে এ ধরনের আইন পাস করার পেছনে সরকারের ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য কাজ করছে, যা গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথকে বাধাগ্রস্ত করবে।’

পুলিশ কমিশনের উদ্দেশ্য কাজ : কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যের বিষয়ে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পুলিশকে জনবান্ধব ও জনমুখী করা হবে। এ কমিশন সরকারের সঙ্গে মিলে কাজ করবে। পুলিশ যেন প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে, সে ব্যাপারে কী কী করণীয়, সে বিষয়ে কমিশন সরকারকে সুপারিশ করবে। এ ছাড়া পুলিশ যাতে মানবাধিকার সংবেদনশীল হয়, সে বিষয়ে পুলিশের আধুনিকায়ন কোথায় কোথায় দরকার, কী ধরনের প্রশিক্ষণ দরকার, সেগুলোও কমিশন চিহ্নিত করবে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এ কমিশনের আরও দুটি কাজ হচ্ছে পুলিশের বিষয়ে নাগরিকদের যেসব অভিযোগ থাকবে, সেগুলো তদন্ত ও নিষ্পত্তি করা এবং পেশাগত বিষয়ে পুলিশ সদস্যদের যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেগুলোর নিষ্পত্তি করা। পুলিশি কার্যক্রমে দক্ষতা ও উৎকর্ষ আনা, শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠাতায় প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান ইত্যাদি কাজও হবে এ কমিশনের।

সরকার কমিশনের সুপারিশ মানতে বাধ্য কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সুপারিশ-পরামর্শ কেউ কখনো মানতে বাধ্য না। পুলিশের সঙ্গে জনগণের একটি ব্রিজ (সেতু) করে দেওয়ার জন্য এ কমিশন। আর পুলিশের সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে, আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে, মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে, পুলিশের পেশাগত সংক্ষোভ নিরসনের ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সরকারের একটা যোগসূত্র স্থাপন করে দেওয়ার কাজ হচ্ছে এ কমিশনের।

আরপিও সংশোধনী পাস : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল প্রস্তুতির মধ্যে নির্বাচনী আইন ও বিধিতে আরেক দফা সংশোধনী এনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) পাস হয়েছে উপদেষ্টা পরিষদের ওই বৈঠকে।

সংশোধনের বিষয়বস্তু তুলে ধরে রিজওয়ানা হাসান বলেন, একটি হচ্ছে কোন কোন ভোট বিবেচনায় নেওয়া হবে না সেই সংক্রান্ত, আরেকটি হলো পোস্টালে পাঠানো ভোটগুলোর গণনাপদ্ধতি নিয়ে একটি বিধান আনা হয়েছে। যেখানে একটি ভোট পড়ার কথা, সেখানে যদি একাধিক সিল পড়ে, তাহলে গণনা করা হবে না, সিল না দেওয়া ব্যালটও গণনা করা হবে না।

তিনি বলেন, পোস্টাল ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘোষণাপত্রে (ডিক্লারেশন) স্বাক্ষর থাকতে হয়, সেটা না থাকলে গণনা করা হবে না। আর ভোটের দিন নির্বাচন কমিশন যে পর্যন্ত ভোট দিতে সময় নির্ধারণ করে দেবে সেই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যে ব্যালটগুলো (পোস্টাল) রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছাবে, সেগুলো সশরীর ভোট একসঙ্গে গণনা করা হবে।

আরও যা যা অনুমোদন : বৈঠকে ভবন নির্মাণসংক্রান্ত ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটি অধ্যাদেশের খসড়াও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড (ইমারত বিধি) যথাযথভাবে পালন নিশ্চিত করবে। এটি সারা দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে। পেশাজীবী ও সরকারি চাকরিজীবীদের সমন্বয়ে এ কর্তৃপক্ষ হবে।

এ ছাড়া হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ সংশোধন অধ্যাদেশের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেন, রিজওয়ানা হাসান বলেন, এ অধ্যাদেশ সংশোধন করে বলা হয়েছে, যেসব উদ্যোক্তা হাইটেক পার্কের জমি বরাদ্দ নিয়ে ৫ বছরের মধ্যে কোনো কাজ করেননি, তাদের বরাদ্দ বাতিল করা হবে। বাণিজ্যিক আদালতের অধ্যাদেশও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এই আদালত স্থাপনের প্রস্তাব করেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাবিত আইনের বিষয়ে কিছু ক্ষেত্রে সংযোজন ও বিয়োজনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠকে বন ও বৃক্ষসংরক্ষণ অধ্যাদেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা অধ্যাদেশের খসড়াও অনুমোদন করা হয়েছে। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধসংক্রান্ত অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়েছিল। তাতে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি চূড়ান্ত করার জন্য কয়েকজন উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন হয়েছে। কমিটি যত দ্রুত সম্ভব এ আইনটি চূড়ান্ত করে আবার উপদেষ্টা পরিষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার উপ- প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা চাইলে সরকার সেটি করবে।

এ ছাড়া, সরকার বেগম খালেদা জিয়াকে ভিভিআইপি মর্যাদা দিয়েছে। এই মর্যাদায় আইন অনুযায়ী তিনি সব সুবিধাপ্রাপ্ত হবেন।

বেগম খালেদা জিয়া ছাড়া আর কাউকে ভিভিআইপি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে বন ও পবিরেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘আর কাউকে এ ধরনের মর্যাদা দেওয়া হয়নি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত